আবেগের নাম যখন ক্রিকেটীয় স্মারক সংগ্রহ
কখনো কল্পনা করেছেন—আপনার প্রিয় খেলোয়াড়ের সঙ্গে দেখা হবে এবং তার সই করা একটি জার্সি আপনি সংগ্রহ করতে পারবেন? অসংখ্য মানুষ শুধু এমন স্বপ্নই দেখেন, কিন্তু কিছু মানুষ আছেন যারা এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপান্তর করার সাহস দেখাতে পারেন।
জুনায়েদ পাইকারের গল্প শুনলে আপনি বিশ্বাস করতে বাধ্য হবেন যে, একাগ্র চিত্তে চাইলে যেকোনো কিছু অর্জন করতে পারে।
স্মারক সংগ্রহের যাত্রার স্মৃতিচারণ করে জুনায়েদ বলেন, 'এগুলো শুরু হয়েছিল যখন আমি খুবই ছোট। এর জন্য আমি আমার বাবাকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। ১৯৯৮ সালে তিনি আমাকে উইলস আন্তর্জাতিক কাপের বল বয় হওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। সেখান থেকেই আমি খেলোয়াড়দের কাছাকাছি যাওয়ার, তাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাই। তখন থেকেই আমি অটোগ্রাফের সংগ্রহ শুরু করি।'
কথাগুলো বলার সময় তার হাতে ছিল সাকিব আল হাসানের এক জোড়া গ্লাভস। এই গ্লাভস পরেই সাকিব ২০১৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে শতক হাঁকিয়েছিলেন। এই স্মারকটি জুনায়েদের খুবই প্রিয়। আর প্রিয় হবে না কেন? জুনায়েদের সংগ্রহে সম্প্রতি যোগ হওয়া এই গ্লাভসে রয়েছে সাকিবের অটোগ্রাফ।
তার বিচিত্র সংগ্রহের মধ্যে আছে টুপি, গ্লাভস, ক্রিকেট বল, মুদ্রা, জার্সি, কোট পিন, চাবির রিং, বই, টাই, অটোগ্রাফ, সই করা ছবি, রেপ্লিকা ট্রফি, সই করা ব্যাট। ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট যা কিছু আমাদের মনে আসতে পারে, তার সবই সম্ভবত তার সংগ্রহে আছে।
পছন্দের দলকে সমর্থন জানানোর সেরা উপায় হচ্ছে স্টেডিয়ামে উপস্থিত হওয়া। কিন্তু জুনায়েদ কেবল মাঠেই যান না, তিনি ম্যাচের টিকেটও রেখে দেন। তার সংগ্রহে রয়েছে অসংখ্য টিকেট, যার মধ্যে আছে ঘরোয়া লিগের পানসে ম্যাচ থেকে শুরু করে বিশ্বকাপের চরম উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচ। তার এই আবেগ শুধুমাত্র তার সংগ্রহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বিশ্বজুড়েও তিনি পরিচিত এক নাম।
বাংলাদেশ ক্রিকেট সাপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএসএ) সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক হিসেবে তিনি মনে করেন, তরুণ-তরুণীদের কোনো একটি শখ থাকা খুবই জরুরি। কারণ, এতে তারা তাদের অবসর সময়টুকু উপভোগ্য কোনো একটি বিষয় নিয়ে কাটাতে পারেন এবং নতুন জ্ঞান অর্জনেরও সুযোগ তৈরি হয়।
তিনি একের পর এক স্মারক হাতে নিয়ে সেগুলোর গল্প বলে যাচ্ছিলেন।
তিনি বলেন, 'আমার সবচেয়ে মধুর স্মৃতিগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে মোহাম্মদ আশরাফুলের সঙ্গে দেখা হওয়া। অটোগ্রাফ চাইলে তিনি আমাকে তার হোটেল রুমে আমন্ত্রণ জানান। সেখানে তিনি পুরো দলের অটোগ্রাফ নেওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। এটা ২০১১ সালের বিশ্বকাপের কিছুদিন আগের ঘটনা। খেলোয়াড়রা সবাই খুব ব্যস্ত ছিলেন, কিন্তু তবুও তিনি এই ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।'
এমন আরও শত শত স্মৃতি রয়েছে জুনায়েদের।
এম মোখলেসুর রহমান ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তৈরি করেছেন নিজের সংগ্রহশালা। তিনি স্ট্যাম্প, বই, ম্যাগাজিন, মুদ্রা এবং অন্যান্য স্মারক সংগ্রহ করেন। তবে তিনি বই ও ডাকটিকেটের প্রতি বেশি আগ্রহী। সংগ্রাহক হিসেবে তিনি এতটাই নিবেদিতপ্রাণ যে, তিনি ক্রিকেট ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর সারা বিশ্বে প্রকাশিত প্রতিটি ডাকটিকেট সংগ্রহ করেছেন। এখানেই শেষ নয়, তিনি এসব ডাকটিকেটের সব ধরণের সংস্করণও সংগ্রহ করেছেন। তিনি বলেন, 'আমার কাছে ক্রিকেটের ১০০ শতাংশ নয়, ২০০ শতাংশ ডাকটিকেট আছে।'
১৯৬৯ সালে ম্যাগাজিন সংগ্রহের মাধ্যমে তার এই শখের যাত্রা শুরু। তখন তিনি রেডিওতে ক্রিকেটের ধারাভাষ্য শুনতেন এবং সেখান থেকে এই খেলার প্রতি অনুরক্ত হন।
তার সবচেয়ে মূল্যবান সংগ্রহ হচ্ছে উইজডেন থেকে সংগ্রহ করা স্মারকগুলো। উইজডেন ক্রিকেটার্স অ্যালমানাক বা উইজডেনকে বলা হয় ক্রিকেটের বাইবেল, যার রয়েছে ১৫৮ বছরের ইতিহাস। মোখলেসুর রহমানের কাছে ১২২ বছরের সংগ্রহ রয়েছে। কিন্তু তার লক্ষ্য হচ্ছে পুরো সংগ্রহটাই নিজের করে নেওয়া। এ ছাড়াও তিনি যত বেশি সম্ভব ক্রিকেট সংক্রান্ত বই সংগ্রহ করেছেন। তার চিত্তাকর্ষক সংগ্রহের মধ্যে আছে উইজডেনের মূল সংস্করণ, ডন ব্র্যডম্যানের নিজের হাতে সই করা নিজস্ব একটি বইসহ আরও অনেক বই।
তার স্মারক সংগ্রহের মধ্যে আরও আছে সই করা ব্যাট, বল ও গ্লাভস। তার সংগ্রহের মধ্যে যে জিনিসটি বিশেষভাবে নজর কাড়ে সেটি হলো, একটি মানুষের সমান উঁচু ক্রিকেট ব্যাট। এতে ২০০৯ সালে বাংলাদেশ বনাম শ্রীলংকা সিরিজে অংশগ্রহণকারী সব খেলোয়াড়ের সই রয়েছে। এমন ব্যাট ২টি আছে। একটি শ্রীলংকা দল নিয়ে গেছে এবং অপরটি এই একাগ্রচিত্ত ভক্তের সংগ্রহকে সমৃদ্ধ করেছে।
নব্য সংগ্রাহকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, 'কোনো একটি সংগ্রহের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়া উচিৎ না। ভালো করে আগে চিন্তা করুন। এ ধরনের সংগ্রহ গড়ে তুলতে অনেক গবেষণা, আত্মোৎসর্গ ও আবেগ প্রয়োজন। তাই আগে ভাল করে বুঝুন আপনার সবচেয়ে বেশি আগ্রহের বিষয় কোনটি। এটা না বুঝতে পারলে আপনি অল্পদিনেই আগ্রহ হারাবেন। নিজের শখের জায়গাটা আবিষ্কার করুন এবং সে বিষয়ে গবেষণা করা শুরু করুন।'
জুনায়েদ এবং মোখলেসুর স্বীকার করেন যে, বাংলাদেশে এ ধরণের শখ বজায় রাখা খুবই কঠিন। তবে তারা ২ জনই আশাবাদী যে, শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম নির্মাণের কাজ শেষ হলে এবং ক্রিকেট যাদুঘরের উদ্বোধন হলে পরিস্থিতি আরও ইতিবাচক হবে।
বাংলাদেশে এ ধরণের যাদুঘর চালু হলে এম মোখলেসুর রহমান তার পুরো সংগ্রহ সেখানে দান করতে আগ্রহী, যাতে সেগুলো সুরক্ষিত থাকে এবং সবাই এই অমূল্য সংগ্রহ নিজের চোখে দেখতে পান।
অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ ইশতিয়াক খান