বুয়েটের শিক্ষার্থীরা কেন ইউকসু নির্বাচন চান না?
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েটে) নিষিদ্ধ আছে ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি। ২০ বছর ধরে অকার্যকর কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ইউকসু)। এই সময়ে শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে ছাত্র সংসদ চালুর প্রয়োজন রয়েছে, এমন দাবি কারো কারো থাকলেও বুয়েটের শিক্ষার্থীদের অনেকেই নির্বাচন চান না।
সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টার বুয়েটের বিভিন্ন বিভাগের অন্তত ১০ জন ক্লাস প্রতিনিধির (সিআর) সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের সবাই জানান, তাদের ক্লাসের শিক্ষার্থীরা এ মুহূর্তে নির্বাচন চান না। আবরার হত্যার বিচারের দাবিতে আন্দোলনে সামনের সারিতে থাকা বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। তারাও নির্বাচনের বিপক্ষে মত দেন।
বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, 'শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবশ্যই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা অবশ্যই প্রয়োজন। কারণ শিক্ষার্থীরাই তো আগামীতে দেশ পরিচালনায় নেতৃত্ব দিবে। তাদের মধ্যে যাতে পরমতসহিষ্ণুতা, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ দেখানোর মূল্যবোধ তৈরি হয়, সেই সুযোগ থাকা জরুরি।'
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, 'ছাত্র সংসদ নির্বাচন হলে আবার ছাত্র রাজনীতি চালু হতে পারে। এ আশঙ্কা থেকে এ মুহূর্তে ইউকসু আবার চালু হোক, এটা আমরা চাইব না। আবরার হত্যার পর কোনো ক্ষমতা কাঠামো চালু হোক এমন কিছুই চাই না।'
দুই বছর আগে, বুয়েটের শেরে বাংলা হলে ছাত্রলীগের একদল সন্ত্রাসী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করে। হত্যার পর আন্দোলনের মুখে ক্যাম্পাসে সব সংগঠনের ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
ইউকসুতে প্রতি বছর শিক্ষার্থীদের সরাসরি ভোটের মাধ্যমে একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং একজন সাধারণ সম্পাদকসহ একটি নির্বাচিত প্রতিনিধি প্যানেল থাকার কথা। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চার সুযোগ তৈরি হয়।
রাজনীতি আর ইউকসু ছাড়া কিভাবে চলছে বুয়েট?
ইউকসু নির্বাচনের বিপক্ষে থাকা শিক্ষার্থীরা বলছেন, কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে তাদের অধিকারের নিয়ে কথা বলার প্রয়োজন নেই। নিজেদের অধিকার নিয়ে সংগঠন ছাড়াই তারা এখন ঐক্যবদ্ধ। অধিকার নিজেরাই আদায় করে নিবেন। এ ঐক্য যেকোনো অন্যায় প্রতিহত করবে বলে আশাবাদী শিক্ষার্থীরা।
তাদের ভাষ্য, ছাত্র সংগঠনের সন্ত্রাসীদের হাতে তারা আর কোনো সনি এবং আবরারকে হারাতে চান না তারা। এখন কোনো সমস্যা দেখা দিলে, নিজেদের অধিকার নিয়ে নিজেরাই প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন এবং ভবিষ্যতেও এ পথে হাঁটবেন বলে জানান শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা যায়, যেকোনো সমস্যা দেখা দিলে তারা এখন প্রথমে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন। এরপর সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এক্ষেত্রে প্রত্যেক বিভাগের ক্লাস প্রতিনিধিরা আলোচনা করে নেন। আর হলগুলোতে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
আবরার হত্যাকাণ্ডের পর শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে দেখা গেছে। আবরার হত্যার বিচারে দাবিতে হওয়া আন্দোলনের মাধ্যমে এই ঐক্য তৈরি হয়েছে বলে জানান তারা।
ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকায় বুয়েটে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের জন্য এটাই উপযুক্ত কি-না? জানতে চাইলে ছাত্র কল্যাণ দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এ সময়ে শিক্ষার্থীরা যদি সে দাবি করে, আমরা ভেবে দেখব।'
তিনি আরও বলেন, 'ছাত্র সংসদ চালু করতে গেলে আবার ছাত্র রাজনীতি চালু হওয়ার শঙ্কা থাকে। কারণ আমাদের দেশের ট্রেন্ড হলো কেউ এককভাবে প্রার্থী হতে চায় না। বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের প্যানেলে প্রার্থী বেশি হয়।'
অন্যদিকে, কিছু শিক্ষার্থী ইউকসু নির্বাচনের গুরুত্বের কথা তুরে ধরে বলছেন, প্রশাসনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে যোগাযোগের জন্য হলেও এ মুহূর্তে একটি মাধ্যম প্রয়োজন। সিনিয়র ছাত্রদের প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলার পদ্ধতির মাধ্যমে গণতান্ত্রিক চর্চা সম্ভব নয়। ইউকসু চালু হলে সেখানে শিক্ষার্থীরা সরাসরি ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ পাবেন। নির্বাচিত নেতৃত্ব শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কথা বলবেন। ইউকসু নির্বাচন হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে কথা বলার একটি স্বীকৃত মাধ্যম তৈরি হবে। অন্যথায়, বুয়েটে এ অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে শিক্ষকদের স্বেচ্ছাচারিতা বাড়বে না, এমন নিশ্চয়তা নেই। শিক্ষকরা নিজেদের স্বার্থে যেকোনো অন্যায় সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের উপর চাপিয়ে দিতে পারেন।
রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনগুলোকে বাদ দিয়ে নির্বাচন চান কিনা—ইউকসু নির্বচনের পক্ষে মত দেওয়া শিক্ষার্থীরা এই প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ইউকসু নির্বাচন দেওয়ার ক্ষমতা আছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। তারা নির্বাচনী তফসিলে, যদি সে সুযোগ না রাখে তাহলে রাজনৈতিক সংগঠন থেকে কেউ প্রার্থী হতে পারবে না। প্রার্থিতা বাতিল করার ক্ষমতা তো কর্তৃপক্ষের থাকবে। তাহলে আবার রাজনীতি চালু হওয়ার সুযোগ থাকবে না।
তবে এই শিক্ষার্থীদের কেউই নিজেদের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।
বুয়েটে ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ বলেন, 'আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, ছাত্রদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশের জন্য ছাত্র সংসদ নির্বাচন হওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের মধ্যে যাতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার মনোভাব তৈরি হয়।'