অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, কাউন্সিলরের জবাবে ক্ষুব্ধ কমিউনিটি
অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী লেখক ও সাংবাদিকদের বৃহত্তর সংগঠন 'অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের' সভাপতি মোহাম্মাদ আব্দুল মতিন দেশটিতে থাকা বাংলাদেশ হাইকমিশনের বিরুদ্ধে কয়েকটি অনিয়মের অভিযোগ তুলে ফেসবুক পোস্ট দিলে তা নিয়ে কমিউনিটিতে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। ভুক্তভোগী অনেকেই ওই পোস্টের মন্তব্যে তাদের অভিযোগও যোগ করতে থাকেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিকভাবে ক্যানবেরায় অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে সাংবাদিক, রাজনীতিক ও কমিউনিটির বিশিষ্ট জনদের কাছে একটি ইমেইল পাঠানো হয়। হাইকমিশনের কাউন্সিলর তাহলীল দিলাওয়ার মুনের পাঠানো ওই বিবৃতিতে সাংবাদিক নেতা আব্দুল মতিনের অভিযোগের জবাব এবং হাইকমিশনের অবস্থান ব্যাখ্যা করা হয়।
আব্দুল মতিন তার পোস্টে লিখেছিলেন, 'হয়রানির অপর নাম বাংলাদেশ হাইকমিশন ক্যানবেরা। বিশেষ করে বর্তমান হাইকমিশনার যোগদানের পর স্বজনপ্রীতি ও হয়রানির আখরায় পরিণত হয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটি। অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে যাওয়ার পরও আজ নিজেই অবলোকন করেছি হয়রানির নমুনা।'
এর জবাবে হাইকমিশন থেকে পাঠানো মেইলে বলা হয়েছে, 'লেখক জনাব মোহাম্মদ আবদুল মতিন পরিস্থিতি সম্পর্কে তার ভুল বোঝার ভিত্তিতে কিছু নির্দয় মন্তব্য এবং ভিত্তিহীন অভিযোগ করেছেন। জনাব মতিন সাংবাদিকদের একটি সংগঠনে একটি দায়িত্বশীল পদে অধিষ্ঠিত, তাই তিনি ব্যক্তিগতভাবে এবং প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান নেওয়া বা কোনো ঘোষণা দেওয়ার আগে তার অনেক বেশি দায়িত্ব রয়েছে। এটা স্পষ্ট যে জনাব মতিন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ২ জনের সঙ্গে ছিলেন এবং তাদের পক্ষ নিয়ে তর্ক করেছেন।'
ওই ইমেইলে আরও বলা হয়, 'পাসপোর্ট প্রার্থী ২ জনই অস্ট্রেলিয়ায় আছেন এবং দৃশ্যত এখানে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় চেয়েছিলেন (বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে বাংলাদেশে তার জীবন নিরাপত্তাহীন বলে প্রমাণ না হলে এখন আশ্রয় চাওয়া যাবে না)। আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে তাদের অবশ্যই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আশ্রয়ের মামলার জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে বাংলাদেশকে হেয় করার সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে। এইভাবে, তারা বাংলাদেশের জন্য একটি ভুল ভাবমূর্তি তৈরির অংশ হিসেবে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে কাজ করছে।'
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, জাহাঙ্গীর আলম নামের একজন বাংলাদেশি প্রায় ১২ বছর সস্ত্রীক অস্ট্রেলিয়ায় বাস করছেন। তিনি একজন শরণার্থী। অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসের জন্য তার ও তার স্ত্রীর 'ব্রিজিং ভিসা' আছে। কোনো শরণার্থীর মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই ভিসা নিয়ে তিনি বৈধভাবে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করতে পারেন। জাহাঙ্গীর আলমের বাংলাদেশি পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তা বাড়ানোর জন্য তিনি হাইকমিশনে ইমেইল করেন। হাইকমিশন থেকে ফিরতি ইমেইল দিয়ে তাকে প্রয়োজনীয় নথি নিয়ে উপস্থিত হতে বলা হয়।
নির্দিষ্ট দিনে তিনি সাংবাদিক নেতা আব্দুল মতিনকে সঙ্গে নিয়ে হাইকমিশনে যান। একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমকে জিজ্ঞেস করেন, 'আপনি শরণার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগ সরকার এবং দেশের বিরুদ্ধে এই দেশের ইমিগ্রেশনে কী অভিযোগ করেছেন?' আব্দুল মতিন ওই কর্মকর্তাকে বলেন, 'এটি আপনি জিজ্ঞেস করতে পারেন না। কারণ এটি তার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। তাছাড়া অস্ট্রেলিয়ার আইনেও কারো ব্যক্তিগত বিষয় জানতে চাওয়া অপরাধ।'
এরপর ওই কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম এবং তার স্ত্রীর পাসপোর্ট রেখে দিয়ে বলেন, 'আগে দেশে আপনাদের সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া হবে, তারপর সিদ্ধান্ত নিয়ে আপনাদের জানানো হবে।'
হাইকমিশনের পাঠানো ইমেইল এবং সেবা সম্পর্কে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, অস্ট্রেলিয়ার সভাপতি বিশিষ্ট আইনজীবী ডক্টর মোহাম্মাদ সিরাজুল হক বলেন, 'যেসব বাংলাদেশের নাগরিক অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছেন এবং যাদের বাংলাদেশের আইডেনটিটি অর্থাৎ পাসপোর্ট রয়েছে তাদের সেবার ব্যাপারে বাংলাদেশ হাইকমিশন, ক্যানবেরার আরও যত্নশীল হওয়া উচিত। মাঝে মধ্যেই আমরা প্রবাসীদের কাছে নানা হয়রানির কথা শুনতে পাই, যা কাম্য নয়।'
কমিউনিটির প্রবীণ নেতা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, অস্ট্রেলিয়ার প্রতিষ্ঠাতা উপদেষ্টা গামা আবদুল কাদির ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'ইমেইলটি আমি পড়েছি। আমি প্রায় ৩৮ বছর অস্ট্রেলিয়াতে আছি, কিন্তু হাইকমিশনের এ জাতীয় অসৌজন্যমূলক ইমেইল কখনো দেখিনি।' তিনি আরও বলেন, 'অতীতে যারা হাইকমিশনার ছিলেন তাদের সঙ্গে বাংলাদেশি কমিউনিটির সুসম্পর্ক ছিল। কিন্তু বর্তমান হাইকমিশনার যোগদানের পর তিনি নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছেন।'
বগুড়া সমিতি অস্ট্রেলিয়ার সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা এনায়েতুর রহিম বেলাল বলেন, 'অনেকের কাছেই হাইকমিশনের সেবার মান নিয়ে অভিযোগ ও আন্তরিকতা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ-অনুযোগ শুনে আসছি। সম্প্রতি কমিউনিটির বিশিষ্ট জনদের কাছে পাঠানো ইমেইলটি খুবই আপত্তিকর।'
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব নিউ সাউথ ওয়েলসের সাবেক সভাপতি ফজলুল হক শফিক বলেন, 'এই ইমেইলের নিন্দা জানানোর ভাষাও আমার জানা নেই। হাইকমিশন তো কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠন নয়। এটি গোটা জাতির প্রতিনিধিত্ব করছে। সব প্রবাসীর সহযোগিতা করাই তো হাইকমিশনের দায়িত্ব। বিশেষ করে অসহায় প্রবাসীদের পাশে দাঁড়ানো তাদের প্রধান কাজ। কে কোনো দল করেন সেটা বিবেচ্য নয়, তিনি বাংলাদেশি কিনা সেটাই দেখা উচিত।'
বিজয় কণ্ঠের সম্পাদক এএইচ এম মাসুম বিল্লাহ বলেন, 'ফোন করলে হাইকমিশন রিসিভ করে না। দূর প্রবাসে অবস্থানকারী বাংলাদেশিদের সঠিক সেবা পরামর্শ না দিয়ে অভিযোগ খণ্ডন আমরা শুনতে চাই না। আমি মনে করি সেবার ব্যাপারে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের আরও যত্নশীল হতে হবে।'
হাইকমিশন থেকে পাঠানো ইমেইলের শেষ অংশে বলা হয়েছে, 'অন্যায়কারীদের পাশে দাঁড়ানো এবং অযৌক্তিক পরিষেবা চাওয়া অনুচিত এবং অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের সম্মানিত সদস্যদের কাছ থেকে এটি প্রত্যাশিত নয়। এই ধরনের সংগঠন এবং সমর্থন অপরাধকে টিকিয়ে রাখার সঙ্গেও যুক্ত করতে পারে।'
এ বিষয়ে সাংবাদিক নেতা আব্দুল মতিন বলেন, 'অস্ট্রেলিয়াতে এখন প্রায় ২ হাজার বাংলাদেশি শরণার্থী রয়েছেন। তারা সবাই অপরাধী? কি ভয়ঙ্কর কথা! আর তাদের পাশে দাঁড়ানো মানে অপরাধকে সমর্থন করা? এই প্রবাসে প্রতিটি সংগঠন এবং প্রবাসী সব সময় শরণার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের নানাভাবে সহযোগিতা করে। অনেক বাংলাদেশি মাইগ্রেশন এজেন্ট তাদের মামলা পরিচালনা করেন বিনামূল্যে। অথচ হাইকমিশন এসবকে বলছে অপরাধের সমর্থন করা। খুবই দুঃখজনক।'
ভুক্তভোগী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, 'আমি বাংলাদেশের নাগরিক। আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক নই। এ দেশে রাজনীতির বাইরেও অনেক কারণে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় প্রার্থনা করা যায়। সেটা হাইকমিশনের অজানা থাকার কথা নয়। তাদের ধারনা, শরণার্থী মানেই আওয়ামী লীগ বিরোধী। তাদের এই মিথ্যা ধারনার কারণেই আমি হয়রানির শিকার।'
হাইকমিশনের পাঠানো ইমেইল পেয়ে কমিউনিটির বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
এ বিষয়ে হাইকমিশনের বক্তব্য জানতে হাইকমিশনার সুফিউর রহমানের ফোনে কয়েকবার কল দিয়েও বন্ধ পাওয়া যায়। সিডনি কনস্যুলেট অফিসেও কল করে কারো সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। এমনকি ইমেইল করেও জবাব পাওয়া যায়নি।
সর্বশেষ গত ২৪ ডিসেম্বর অস্ট্রেলিয়া সময় সন্ধ্যা ৬টা ৩১ মিনিটে হাইকমিশনারের হোয়াটসঅ্যাপে ম্যাসেজ পাঠালে তিনি সঙ্গে সঙ্গেই তা দেখেন। কিন্তু আজ রোববার পর্যন্তও তার কাছ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
আকিদুল ইসলাম: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক