‘গত ১০ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নারীর প্রতি সহিংসতা ঘটেছে বেশি’

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

দেশের অন্যান্য জেলার তুলনায় গত ১০ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে সবচেয়ে বেশি।

আজ মঙ্গলবার মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, 'বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক' ও কাপেং ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে রাজধানীর দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারের আজিমুর রহমান কনফারেন্স হলে 'বাংলাদেশে আদিবাসী নারীর প্রতি সহিংসতা: কারণ, ফলাফল ও আইনি সহায়তা' শীর্ষক একটি গবেষণার ফলাফল নিয়ে আলোচনা সভায় এ তথ্য জানানো হয়।

আলাচনা সভায় মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, 'মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন দীর্ঘদিন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের নিয়ে কাজ করছে। কাপেং ফাউন্ডেশন ও 'আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের' সঙ্গে এই গবেষণাটিও সেই কাজেরই অংশ। এই গবেষণার ফলাফল যাই হোক না কেন, এটা আমাদের মনে রাখতে হবে এটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয় বরং রাষ্ট্রকে সহযোগিতার জন্য সবার সঙ্গে তথ্য বিনিময় হচ্ছে।'

তিনি আরও বলেন, 'কেউ-ই নিরাপদ নয়, সেখানে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীরা আরও বেশি সহিংসতার শিকার হচ্ছে। মূলত ন্যায় বিচার পাওয়ার আইনি প্রক্রিয়াটাই নারীবান্ধব নয়। ফলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা প্রান্তিক নারী আরও বৈষম্যের শিকার হয়।'

আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কাপেং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পল্লব চাকমা।

গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য উপস্থাপন করতে গিয়ে তিনি বলেন, 'অন্যান্য জেলার তুলনায় গত ১০ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩ জেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে সবচেয়ে বেশি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, সাঁওতাল ও গারো নারীরা সহিংসতার শিকার হয়েছেন বেশি।'

তিনি প্রতিবেদনের তথ্য দিয়ে বলেন, 'বিচারহীনতার কারণে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় অপরাধীরা একই ঘটনা বারবার ঘটানোর সাহস পায়। এ ছাড়া, সচেতনতার অভাব, ভাষাগত সমস্যা, অর্থনৈতিক সমস্যা, নিরাপত্তাহীনতা, রাজনৈতিক চাপ প্রভৃতি কারণে ঘটনার শিকার নারী বা কন্যাশিশু ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হয়।'

প্রতিবেদনে ৩টি সুপারিশের কথা বলা হয়েছে। এগুলো হল- ভিকটিমকে সাপোর্ট করা, যা পরামর্শ থেকে পূর্নবাসনের ব্যবস্থা পর্যন্ত হতে হবে; আইনি সহায়তা প্রদান করা এবং সবশেষে প্রতিরোধ হিসেবে প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে প্রান্তিক পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি করা।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, 'এ ধরনের গবেষণা ভবিষ্যতে আইন প্রণেতা ও শিক্ষাবিদদের কাজে লাগবে। এই প্রতিবেদনটি বলছে বিচারহীনতা সংস্কৃতির কারণে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নারীরা কী নাজুক অবস্থায় আছে।'

তিনি বলেন, 'আমাদের কণ্ঠস্বর যেন প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, সেজন্যে আমাদের আরও কাজ করা দরকার। সেই সঙ্গে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের প্রতি, তাদের জীবনধারার প্রতি আমাদের যে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সেটিও আমাদের পরিবর্তন করতে হবে।'

তিনি কোয়ালিশনের মাধ্যমে সবার সঙ্গে সেতুবন্ধন তৈরির কথা বলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম বলেন, 'মনস্তাত্বিকভাবে ভিকটিম ব্লেমিং বা ঘটনার শিকার নারীকে দোষারোপ করা আমাদের খুব সহজাত বৈশিষ্ট্য। এ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নারীরা নারী হওয়ার কারণে ও প্রান্তিকতার কারণে বৈষম্যর শিকার হয়।'

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের উপ-পরিচালক গাজী সালাহউদ্দিন জানান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ন্যাশনাল ইনকোয়ারি খসড়া প্রতিবেদন তৈরি করেছে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করে সরকারের কাছে জমা দেওয়া হবে।

'বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের' সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, 'ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নারীদের প্রতি দিন দিন নির্যাতন বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশে অনেক ভালো ভালো আইন আছে কিন্তু বাস্তবে এগুলো প্রয়োগের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নারীর ওপর সহিংসতার মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেড়ে চলেছে।'

প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হাসান বলেন, 'রাষ্ট্র নারীবান্ধব নয়। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নারীর প্রতি যে সহিংসতা সেটা মূলত সম্পদ দখল করার জন্য শেষ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।'

আলোচনা সভাটি সঞ্চালনা করেন জাহেদ হাসান এবং এতে সভাপতিত্ব করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম।

এছাড়া মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন- অজয় এ মৃ, চঞ্চনা চাকমা, নমিতা চাকমা, সাবিত্রী হেমব্রম, নিও প্রু মারমা, লালসা চাকমা, বিচিত্রা তির্কী, হরেন্দ্র নাথ সিং, পলাশ পাহান ও নিশি ত্রিপুরা।