নারায়ণগঞ্জে পোশাক শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে আহত ১০

নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ

বকেয়া বেতনের দাবিতে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড প্রায় ৩ ঘণ্টা অবরোধ করে রাখে একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। এতে দুর্ভোগে পড়েন ওই সড়কে চলাচলকারী যাত্রীরা। অবরোধের সময় পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, লাঠিচার্জ, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও গুলির ঘটনায় অন্তত ১০ শ্রমিক ও পুলিশ আহত হয়েছেন।

আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার শিবুমার্কেট এলাকার সড়কটি অবরোধ করার পর এক মাসের বেতনের আশ্বাস পেয়ে অবরোধ তুলে নেন 'রূপসী গার্মেন্টস' নামের পোশাক কারখানার শ্রমিকের। 

প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ ও পোশাক শ্রমিকেরা জানান, ৩ মাসের বেতনের দাবিতে সকাল ৯টায় সদর উপজেলার লামাপাড়ায় রূপসী গার্মেন্টেসের সামনে অপেক্ষা করছিলেন শ্রমিকরা। সকাল ১০টায় কারখানা কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দেয় আজকে বেতন দেওয়া হবে না। এ ঘোষণায় বিক্ষোভ শুরু করে শ্রমিকরা। এক পর্যায়ে তারা কারখানার সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে এসে ট্রাফিক পুলিশের সড়ক বিভাজন পিলার ফেলে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করে। এর ফলে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের উভয় পাশের রাস্তার যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে ফতুল্লা থানা ও শিল্প পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য অতিরিক্ত পুলিশ ও জলকামান রাখা হয়।

narayanganj09.jpg
ছবি: স্টার

জানা গেছে, দুপুর দেড়টায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-৪ নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার জ্যোতির্ময় সাহা মালিক পক্ষের সঙ্গে কথা বলে এক মাসের বেতন পরিশোধের আশ্বাস দিয়ে শ্রমিকদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এতে অধিকাংশ শ্রমিক রাজি হয়ে সড়ক থেকে সরে যেতে চাইলেও কিছু শ্রমিকের সঙ্গে পুলিশের বাকবিতণ্ডা হয়। এ সময় পুলিশ শ্রমিকদের লাঠিচার্জ শুরু করে। এতে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে শুরু করে। তখন শ্রমিক-পুলিশের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ার শেল ও শটগানের ফাঁকাগুলি ছুড়তে শুরু করে। তখনই সড়ক থেকে সরে যায় শ্রমিকেরা। প্রায় আধা ঘণ্টা সংঘর্ষের পর দুপুর ২টায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, শহরের চাষাঢ়া থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের উভয় পাশে সৃষ্টি হয় যানজট। এতে যাত্রীবাহী বাস, ট্রাক, অ্যাম্বুলেন্সসহ সব গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ করে রাখে। যানজটে কারণে যাত্রীরা হেঁটে গন্তব্যে যেতে থাকে।

ঢাকা মিরপুরগামী হিমাচল পরিবহনের বাস চালক মো. শাহীন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, '৩ ঘণ্টা ধরে যানজটে বসে ছিলাম। যাত্রীরা সবাই গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে চলে গেছে।'

আঁখি বেগম নামের এক যাত্রী বলেন, 'আমার ভাই ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি। তাকে দেখতে যাচ্ছি। কিন্তু যানজটের জন্য ২ ঘণ্টা ধরে গাড়িতেই বসে আছি। না পারছি ঢাকায় যেতে, না পারছি বাসায় ফিরে যেতে।'

ফরিদ হোসেন নামের এক যাত্রী বলেন, 'আমার ভাইয়ের বুকে ব্যথা। অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে জেনারেল হাসপাতাল থেকে রওনা দেই। কিন্তু যানজটের জন্য অ্যাম্বুলেন্স থেকে নেমে অটোরিকশা দিয়ে যাচ্ছি।'

সদর উপজেলা পরিষদের নারী ভাইস চেয়ারম্যান ফাতেমা মনির বলেন, 'যানজটের কারণে ২ কিলোমিটার হেঁটে এসেছি। আরও ২ কিলোমিটার হেঁটে উপজেলায় যেতে হবে। স্কুলের বাচ্চারাও গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে যেতে হচ্ছে। এভাবে রাস্তা বন্ধ করে আন্দোলন মানে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ।'

শ্রমিকেরা জানান, তাদের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন বকেয়া। গত ২০ মার্চ দুই মাসের বেতন পরিশোধের আশ্বাস দেয় মালিকপক্ষ। তারপর একাধিকবার সময় দিয়ে সব শেষ আজ বেতন পরিশোধের আশ্বাস দেন। কিন্তু তারা সকালে কারখানায় যাওয়ার পর মালিকপক্ষ জানায় আজকেও বেতন দেবে না। কবে দেবে সেটাও কিছু বলেনি। চলতি মাসও শেষ। ৩ মাসের বেতন বকেয়া তাই শ্রমিকরা আন্দোলন শুরু করে।

শ্রমিকেরা আরও জানান, আমরা সড়ক অবরোধ করে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিলাম। কোনো ভাঙচুর করিনি। কিন্তু পুলিশ আমাদের ওপর লাঠিচার্জ শুরু করে। আমাদের ৭ জন শ্রমিক আহত হয়েছে।

শ্রমিক ফারজানা বলেন, '৩ মাসের বকেয়া বেতনসহ বাৎসরিক ছুটি, ওভারটাইম, নাইট বিল বকেয়া রয়েছে। তাছাড়া বেতন চাইতে গেলেই শ্রমিকদের ছাঁটাই করে দেয়। মালিকপক্ষের সন্ত্রাসীরা রাস্তায় হুমকি ধমকি দেয়, মারধর করে। তাই বাধ্য হয়ে আন্দোলন করছি। আন্দোলন না করলে কেউ আমাদের জন্য এগিয়ে আসে না।'

কারখানার শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম বলেন, 'ঘর ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, মুদির দোকানের বাকিসহ গ্রামের বাড়িতে ২ মাস ধরে টাকা পাঠাতে পারছি না। ২ দিন পর রোজা, এখনো বেতন দেয় না। বাড়িওয়ালা বলেছে এ মাসে বকেয়া টাকা না দিলে ঘরে তালা দিয়ে দেবে। এ অবস্থায় আমরা কোথায় যাব? এটা শুধু আমি না কারখানার ৩ থেকে ৪ হাজার শ্রমিক আছে সবার একই অবস্থা।'

তিনি বলেন, 'কারখানায় প্রচুর কাজ আছে। প্রতিদিন রাত ১২টা পর্যন্ত কাজ করায় শ্রমিকদের। কোনো ছুটি নেই। ২৬ মার্চ সরকারি বন্ধ কিন্তু সেই বন্ধও দেয়নি কাজের জন্য। প্রতি সপ্তাহে রপ্তানির জন্য পণ্য যায়। কিন্তু আমাদের বেতনের সময় তাদের টাকা থাকে না।'

ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-৪ নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার জ্যোতির্ময় সাহা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমরা মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বললে তারা আগামী ৩ এপ্রিল শ্রমিকদের এক মাসের বেতন পরিশোধের আশ্বাস দেয়। আমরা সেটা শ্রমিকদের বলার পর কিছু শ্রমিক অবরোধ তুলে নিতে শুরু করে। কিন্তু কিছু শ্রমিক দাবি জানায়, মালিকপক্ষের লোকজন এসে আশ্বাস দিতে হবে। এ জন্য শ্রমিকদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয়। এক পর্যায়ে শ্রমিকেরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাঁদানে গ্যাস ও শটগানের ফাঁকাগুলি ছোড়ে। কত রাউন্ড এখনই বলা যাচ্ছে না। শ্রমিক আহতের কোনো খবর পায়নি। তবে ইটপাটকেলের আঘাতে আমিসহ ৩ জন পুলিশ সদস্য আহত আছে। তবে কেউ গুরুতর না। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।'

রূপসী গার্মেন্টসের সহকারী উপমহাব্যবস্থাপক নাছির উদ্দিন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'শ্রমিকেরা শুধু ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন পাবে। আর কোনো বকেয়া নেই। আজকে ব্যাংক থেকে টাকা পাচ্ছিলাম না। তাই ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন আগামী ৭ এপ্রিল দেবে বলেছিলাম। কিন্তু শ্রমিকেরা তাতে রাজি হয়নি। এর আগে কখনো এমন হয়নি। আজকে কারও ইন্ধনে শ্রমিকেরা বিক্ষোভ শুরু করে। আগামী শনিবারের মধ্যে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করে দেওয়া হবে।'