নারায়ণগঞ্জ থেকে লঞ্চ চলাচল বন্ধ, যাত্রীদের দুর্ভোগ
প্রখর রোদে ২ হাতে দুটি ভারি ব্যাগ নিয়ে টার্মিনালে এসেছেন রহমান মিয়া, সঙ্গে তার স্ত্রী। পকেট থেকে টাকা বের করে টিকেট কিনতে টার্মিনালের কাউন্টারে গিয়ে জানতে পারেন লঞ্চ বন্ধ। কবে থেকে চলবে সেটাও বলতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে মুখ মলিন হয়ে যায় স্বামী-স্ত্রীর। লঞ্চ বন্ধে বিপাকে পড়েছেন তারা।
মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে নারায়ণগঞ্জ শহরের লঞ্চ টার্মিনালে গিয়ে দেখা গেছে এ দৃশ্য।
রহমান মিয়ার মতো আরও ২০-৩০ জনকে লঞ্চের জন্য এসে বিপাকে পড়তে দেখা গেছে। অনেকে ফিরে গেছেন বা বিকল্প পথে গেছেন।
রহমান মিয়া দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'শনির আখড়ায় মেয়ের বাড়ি থেকে চাঁদপুর শাটকি গ্রামে বাড়িতে যাব। এ জন্যই নারায়ণগঞ্জ লঞ্চ টার্মিনালে এসেছি। এখানে এসে জানলাম লঞ্চ বন্ধ। এক সপ্তাহ আগেও নারায়ণগঞ্জ হয়েই মেয়ের বাড়িতে গিয়েছি।'
তিনি বলেন, 'লঞ্চ ডুবে গেছে, তাই লঞ্চ বন্ধ করে দিতে হবে এটা কেমন কথা? মাথা ব্যথা তাই মাথা কেটে ফেলতে হবে? নাকি ব্যথা সারাতে ওষুধ খাবে। কার্গো লঞ্চ ডুবিয়ে দিলো তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে, অপরাধী যে তাকে শাস্তি দেবে, কী কী সমস্যা আছে সেটা সমাধান করবে। তা না করে লঞ্চ বন্ধ করে দেওয়া কেমন হলো? আমাদের যাত্রীদের ভোগান্তি ছাড়া কিছু না।'
গত রোববার দুপুর সোয়া ২টায় সদর উপজেলার কয়লাঘাট এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীতে সিটি গ্রুপের 'এমভি রূপসী-৯' নামে কার্গো জাহাজের ধাক্কায় মুন্সিগঞ্জগামী 'এমএল আফসার উদ্দিন' নামে যাত্রীবাহী লঞ্চ ডুবে যায়। মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা। পরিবারের দাবি অনুযায়ী এখনো দুজন নিখোঁজ রয়েছেন। এ ঘটনায় বিআইডব্লিউটিএ সোমবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য নারায়ণগঞ্জ থেকে মুন্সিগঞ্জ, চাঁদপুর, রামচন্দ্রপুর, শরিয়তপুরগামীসহ সব লঞ্চ চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে। এরপর থেকে গত দুদিন ধরে বন্ধ রয়েছে লঞ্চ চলাচল।
ঢাকার বারিধারা ডিওএইচএস এরিয়ার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন শফিকুল ইসলাম। তিনি চাঁদপুর মুদাপুর গ্রামের বাড়িতে যাবেন। এজন্য নারায়ণগঞ্জে লঞ্চ টার্মিনালে এসেছিলেন।
তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'নারায়ণগঞ্জ হয়ে লঞ্চে বাড়ি যেতে ভাড়া লাগে ১৭০ টাকা। কিন্তু এখন গাড়িতে যেতে হলে সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা লাগবে। শুধু যে টাকা লাগছে এটা বড় বিষয় না। গাড়িতে যেতে বিভিন্ন জায়গা থেমে গাড়ি পরিবর্তন করতে হবে। এই ভোগান্তি সহ্য করার মতো না।'
হোসিয়ারি শ্রমিক মো. জিহাদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'গ্রামের বাড়িতে বিয়ে তাই ৩ বন্ধু ছুটি নিয়ে বাড়ি যাচ্ছি। সাইনবোর্ড থেকে টার্মিনালে এসেছি। এখন উল্টো যেতে হবে। জন প্রতি ৮০ টাকার লঞ্চ ভাড়া। গাড়িতে গেলে একজনেরই খরচ হবে ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা।'
তিনি বলেন, 'ঘোষণা ছাড়া এভাবে হঠাৎ করে সব লঞ্চ বন্ধ ঘোষণা আমাদের মতো নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ভোগান্তি ছাড়া কিছুই না। লঞ্চ বন্ধ করে দিয়ে কি সমাধান হয়ে যাবে। যারা বন্ধ করেছে তারা তো শিক্ষিত মানুষ। তাদের এটা বোঝা উচিত ছিল।'
বাঁধন বাসের হেলপার মোহাম্মদ মঞ্জুর হোসেন বলেন, 'আমাদের বাস সোনারগাঁও পর্যন্ত যায়। লঞ্চ বন্ধ থাকায় অনেক যাত্রী অপেক্ষা করছেন। বিশেষ করে নারীরা। এজন্য দুপুর থেকে বাস চালু করেছি মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া পর্যন্ত। দুপুর ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত দুটি বাস মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া পর্যন্ত গিয়েছে ৮০ জন যাত্রী নিয়ে। ভাড়া ১০০ টাকা। আবার লঞ্চ চালু হলে বন্ধ হয়ে যাবে।'
বিআইডব্লিউটিএর সূত্রে জানা গেছে, 'নারায়ণগঞ্জ থেকে মুন্সিগঞ্জ রুটে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা ৬-৭টা পর্যন্ত ২০ মিনিট পর পর লঞ্চ ছেড়ে যায়। এই রুটে ২৫টি লঞ্চ চলাচল করে। নারায়ণগঞ্জ থেকে চাঁদপুর রুটে ১৫টি, মতলব-মাছুয়াখালী রুটে ১৯টি, হোমনা-রামচন্দ্রপুর একটি, ওয়াপদা, সুরেশ্বর-নরিয়া (শরিয়তপুর) কয়েকটি লঞ্চ চলাচল করে থাকে। তবে এসকল রুটের মধ্যে সন্ধ্যার পরে ২টি রুটে লঞ্চ চলাচল করে থাকে।'
বিআইডব্লিউটিএর লঞ্চ টার্মিনালের শুল্ক আদায়কারী ইউসুফ আলী শেখ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'স্বাভাবিক সময়ে এই নৌ পথে ৪ থেকে ৫ হাজার যাত্রী যাওয়া-আসা করে। কিন্তু বন্ধ ঘোষণার পর গত সোমবার ও মঙ্গলবার ২ দিনে ৫০০-এর বেশি যাত্রী এসে ফিরে গেছে। ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশে লঞ্চ বন্ধ। আমাদের কি করার আছে। কবে চালু হবে সেটাও বলতে পারছি না।'
বাংলাদেশ লঞ্চ মালিক সমিতি নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি বদিউজ্জামান বাদল দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'লঞ্চ ডুবির জন্য লঞ্চ দায়ী না। আমাদের লঞ্চগুলোর শতভাগ ফিটনেস ও মাস্টার ড্রাইভারের সনদ আছে। ভিডিওতে দেখেছে কার্গো ধাক্কা দিয়ে ডুবিয়ে দিয়েছে। কার্গো জাহাজটি স্পিড কম করতো, তাহলে ওই লঞ্চটি ডুবতো না। কিন্তু আমাদের কোনো ধরনের নির্দেশনা না দিয়ে হঠাৎ করে বলপূর্বক সব ধরনের লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা চাই নদীতে পণ্যবাহী জাহাজ, কোস্টার, বাল্কহেড ও যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচলের জন্য রিভার ট্র্যাক করা হোক।'
তিনি বলেন, 'নারায়ণগঞ্জ থেকে ৭টি রুটে ৭০টি লঞ্চ চলাচল করে। যার মধ্যে ২টি রুট নাব্যতা সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে। বাকি ৫টি রুট সচল। এসব লঞ্চের প্রতিটিতে ৮ জন শ্রমিক করে ৫ শতাধিক শ্রমিক কর্মরত রয়েছে। লঞ্চ চলাচলের অনুমতি না দিলে এসব শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়বে। এ জন্য আমরা অতিদ্রুত লঞ্চ চলাচলের অনুমতি দাবি করছি।'
এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ'র নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরের যুগ্ম পরিচালক মাসুদ কামাল দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমরা বিকল্প চিন্তা করছি। তবে বিকল্প ব্যবস্থা কী হতে পারে সেটা বলার জন্য আমি যোগ্য ব্যক্তি না। কিন্তু এটি বন্ধ করা হয়েছে জনগণের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই। জনগণের ভোগান্তি লাঘবের জন্য আমাদের ব্যবস্থাপনা বিভাগ অবগত আছে। তারা বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করছে। আশা করি খুব তাড়াতাড়ি এটা সমাধানের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এ ছাড়া বিষয়টি দ্রুত সমাধানের জন্য আমরাও ঊর্ধ্বতনদের জানাব।'