প্রাণ জেগেছে ছেঁউড়িয়ায়, ৩ দিনের লালন উৎসব শুরু আজ

আমানুর আমান, কুষ্টিয়া

করোনা নিষেধাজ্ঞায় ২০২০ সালের পর থেকে টানা ২ বছর কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ্ এর আখড়াবাড়িটি ছিল নিষ্প্রাণ। তালাবদ্ধ ছিল এর মূল ফটক। বারবার প্রাণের টানে আখড়াতে এসেও ফিরে গেছেন লালনের অনুসারী, ভক্ত, বাউলেরা।

করোনার সেই সংকট কাটিয়ে আবারও কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় দোলপূর্ণিমা উপলক্ষে ৩ দিনের লালন স্মরণোৎসব শুরু হচ্ছে আজ মঙ্গলবার থেকে। অনুষ্ঠানটিকে ঘিরে আবার প্রাণ ফিরেছে হাজারো বাউল সংস্কৃতির জনপদের এ তীর্থ ভূমিতে।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ৩ দিনের লালন স্মরণোৎসবের আয়োজন করেছে লালন একাডেমি। আজ বিকাল ৫টা থেকে মেলা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সকাল থেকেই বাউলদের আনাগোনায় উৎসব মুখর হয়ে উঠেছে মেলা প্রাঙ্গণ।

এ উৎসব চলবে ১৭ মার্চ পর্যন্ত।

ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা গেছে বাউল ফকিরদের মাঝে। স্বস্তি দেখা দিয়েছে বাউল আখড়াকে ঘিরে গড়ে উঠা শত বছরের ব্যবসা-বাণিজ্যসহ এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবকিছুতেই।

লালন শাহ তার জীবদ্দশাতেই নিজের আখড়াবাড়িতে প্রতি বছর চৈত্রের পূর্ণিমা রাতে বাউলদের নিয়ে সাধুসঙ্গ উৎসব করতেন। এটিই দোল উৎসব। ১২৯৭ বঙ্গাব্দের পহেলা কার্তিক তার মৃত্যুর পরও এ উৎসব চলে আসছে।

ইতোমধ্যে এ উৎসবকে ঘিরে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার কালী নদীর তীরে লালন আখড়াবাড়িতে চলছে উৎসব ও গ্রামীণ মেলার প্রস্তুতি। ৩ দিনের এ আয়োজনে সাধুদের আনুষ্ঠানিকতার বাইরে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন রয়েছে।

এবারের উৎসবে প্রতিদিন আলোচনা সভা শেষে দেশবরেণ্য লালন গানের শিল্পী, লালন একাডেমির শিল্পীসহ গুণী সংগীত শিল্পীরা গান পরিবেশন করবেন।

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, '৩ দিনের মেলার জন্য ইতোমধ্যে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।'

lalon-kushtia2-wb.jpg
ছবি: স্টার

পেছন ফেরা

গান থেকে সৃষ্ট দর্শনের ইতিহাসে লালন অনন্য। শুধু গানকে উপজীব্য করে একটি সমগ্র দর্শন-ভিত্তি নির্মাণের কৃতিত্ব লালনেরই সবচেয়ে বেশি। লালন ছিলেন ব্যতিক্রম। কেননা, তিনি তার গানের দর্শনে কয়েকটি ভিত্তি রচনা করেছিল। তার মধ্যে মানবতাবাদ, অসাম্প্রদায়িক মনোভাব, জাত-ধর্ম ভেদাভেদহীন কুসংস্কার মুক্ত সমাজচিন্তা অন্যতম।

লালন শুধু অন্যের জন্য এসব কথা বলেননি। ব্যক্তিজীবনেও তিনি এর চর্চা করতেন। বাংলার ভাবের জমিনে দাঁড়িয়ে যিনি কর্তারূপে মানুষ অন্বেষণের ইশারা করেছিলেন, সেটাকে নিছকই ভাবগত একটা ব্যাপার ভাবলে তাকে বোঝা হবে না।

বাউলধর্মে পরমার্থ এসে দেহের সীমায় মিশেছে বলেই বাউলদের সাধন-ভজনের মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছে মানুষ।

তাদের কাছে মানবের তুল্য কিছুই নেই। বাউলদের এই মানুষ ভাবনা শাস্ত্রাচারী সমাজপতি ও ধর্মাধিপতিদের বিরুদ্ধে গভীর মর্মজাত এক প্রতিরোধ।

লালনের অসংখ্য গানে মনের মানুষের প্রসঙ্গ উল্লিখিত হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, মনের মানুষ এর কোনো ধর্ম, জাত, বর্ণ, লিঙ্গ, কূল নেই। সকল মানুষের মনে বাস করেন ঈশ্বর। সমাজের সকল নিপীড়ন, মানুষের প্রতিবাদহীনতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার, লোভ, সামাজিক বিভেদ, আত্মকেন্দ্রিকতাকে তিনি তার গানের মধ্যে তুলে এনে করেছেন প্রশ্নবিদ্ধ।

লালনের আয়ুষ্কাল ছিল ১১৬ বছর। তার জীবনকালে সমাজে এসব ঘটনাবলীর দৌর্দণ্ড প্রতাপ বিরাজ করত। প্রখ্যাত গবেষক আবুল আহসান চৌধুরী তার 'বাঙলার বাউল বিরোধী আন্দোলন: প্রেক্ষিত লালন শাহ' প্রবন্ধে বলেছেন, 'বাউলধর্ম বাঙলার জনপ্রিয় লোকধর্ম। বাউল সম্প্রদায়ের মানুষকে সমাজে বিভিন্নভাবে অনাদৃত ও নিগৃহীত হতে হয়েছে। বাউলরা শরিয়তপন্থী মুসলমান ও হিন্দু ধর্মচারীদের দ্বারা যুগপৎ উৎপীড়িত ছিলেন।'

আবুল আহসানের মতে লালনের জীবদ্দশাতেই লালন বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। তিনি হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের কাছেই তাচ্ছিল্য, ঘৃণা, নিন্দা ও শত্রুতা কুড়িয়েছেন। তার প্রেম ও আধ্যাত্মা ধর্ম শাস্ত্রবাদী ধর্মগুরু ও সমাজপতিদের দ্বারা বারবার লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়েছে। কিন্তু লালন ধীর স্থির লক্ষ্যগামী। কোনো অন্তরায়, প্রতিবন্ধকতাই তাকে নিরুৎসাহিত করতে পারেনি। তার এসব দুঃখ, আঘাত, বেদনার ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ তার গানে প্রতিফলিত হয়নি।

কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রফেসর মনসুর উদ্দীনের প্রথম খণ্ড 'হারামণি'র ভূমিকা লিখেছিলেন। এর একটি জায়গায় তিনি লিখেছেন, 'এই ভারতের এক জাতীয়তা রেখেছে শুধু ফকিরেরাই।'

মনে করা হয়ে থাকে, সাধারণ কথ্য ভাষায় গানের মধ্য দিয়ে লক্ষ্যভেদী চিন্তা চেতনার যে সম্মিলন এটিই যুগে যুগে লালন বিষয়ে একটি সামগ্রিক আগ্রহ তৈরি করেছে। লালনকে এককালীন প্রাসঙ্গিকতা থেকে সমকালীন প্রাসঙ্গিকতায় উত্তরণ ঘটিয়েছে। এটি লালন দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।

লালনকে বলা হয় বাউল গানের অগ্রদূতদের অন্যতম, 'বাউল সম্রাট'। তার রচিত গানের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার। লালনের গানের মধ্য দিয়েই উনিশ শতকে বাউল গান জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ২০০৫ সালে ইউনেস্কো বাউল গানকে বিশ্বের মৌখিক এবং দৃশ্যমান ঐতিহ্যগুলোর মাঝে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করে।

আখড়াবাড়িই ছিল বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ্ এর প্রধান অবস্থান এবং এখানেই তিনি জীবনের শেষ প্রয়াণ নেন। বর্তমানে সেখানে অবকাঠামোগত উন্নয়নের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে লালন একাডেমি। এখানে লালন সমাধিস্থলকে স্মরণীয় করতে ১৯৬২ সালে একটি সমাধি সৌধ নির্মিত হয়েছে।