বিনা পয়সায় গ্রাম পাহারায় দিনমজুর, ‘বাধ্য করছে পুলিশ ও আ. লীগ নেতারা’
মেহেরপুর সদর উপজেলার রাজনগর ও দরবেশপুর গ্রামের সাধারণ মানুষকে কোনো ধরনের পারিশ্রমিক ছাড়া রাত জেগে গ্রাম পাহারা দিতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় পুলিশ ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে।
সাধারণ মানুষের অভিযোগ, দিনভর পরিশ্রম করে সারারাত গ্রাম পাহারা দেন তারা। অথচ, এ কাজে যারা বাধ্য করছেন তারা কেউই এতে অংশ নিচ্ছেন না। এমনকি পাহারার কাজে প্রয়োজনীয় সকল জিনিসপত্রও কিনতে হচ্ছে নিম্নআয়ের এই মানুষদের।
আজ মঙ্গলবার গ্রাম ২টির বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে এমনই জানা যায়।
রাজনগর গ্রামের লাল মোহাম্মদ পেশায় দিনমজুর। তিনি জানান, ১২ দিন ধরে রাতে পাহারা দিচ্ছেন। তার পাহারা শুরু হয় রাত ১২টায় এবং শেষ হয় ভোরে। এরপর তিনি দিনমজুরের কাজে যান।
একই কথা জানান দিনমজুর জামিরুল ইসলাম। দৈনিক ৪০০ টাকা মজুরি পাওয়া জামিরুলকে নিজের টাকায় টর্চলাইটও কিনতে হয়েছে।
পাহারা দিতে রাজি না হলে বা অভিযোগ তুললে তারা নানান সমস্যায় পরতে পারেন, এমনকি গ্রাম ছাড়াও হতে পারেন। এমন আতংকে কোনো প্রতিবাদ না করে সবাই আসেন রাত জেগে পাহারা দিতে।
একই অভিযোগ গ্রামের আরও অনেকের। দরবেশপুর গ্রামের ষাটোর্ধ বলকান শেখ, ফিরোজ মিয়া, ভ্যানচালক প্রবীণ শেখসহ আরও কয়েকজন জানান, স্থানীয় ক্যাম্পের পুলিশ ও স্থানীয় কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা গ্রামে সভা করে এই ব্যবস্থা করেছেন।
তাদের প্রশ্ন, এই কাজ তাদের মতো মতো খেটে খাওয়া মানুষদেরই কেন করতে হবে?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেন, গ্রাম পাহারার কাজে অপারগতা প্রকাশ করায় স্থানীয় বারাদী পুলিশ ক্যাম্প ইনচার্জ তাদেরকে শাসিয়েছেন। গ্রামে কোনো চুরি হলে তাদেরকে ঠাণ্ডা পানিতে চুবিয়ে শাস্তি দেওয়ার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছেন।
স্থানীয়রা জানান, বারাদী পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ দেবাশীষ অধিকারী, গ্রাম আওয়ামী লীগের সভাপতি ওলিল হোসেন, সহ-সভাপতি আব্দুস সালাম, গ্রাম পুলিশিং কমিটির সভাপতি জুগিন্দা গ্রামের আইনাল হকসহ দরবেশপুর গ্রামের কয়েকজন নেতা দরবেশপুর গ্রামে বসে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
গ্রাম আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আব্দুস সালামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ২ মাস আগে মাঠের কয়েকটি স্যালো মেশিনের মোটর চুরি ও পাশের গ্রামের একজনের ৩টি গরু চুরি হয়। এসব ছোটখাটো চুরি বন্ধ করতেই রাজনগর গ্রামের শেখপাড়া, বেইলিরমাঠপাড়া ও মল্লিকপাড়ায় প্রতিদিন ৩টি গ্রুপে ৩০ জনকে রাতে পাহারা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, এটা গ্রামবাসীর ভালোর জন্যই করা হয়েছে।
তিনি বা তার পরিবারের কেউ পাহারায় অংশ নেন কি না জানতে চাইলে তিনি প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যান। উল্টো তিনি জানতে চান, সাংবাদিকদের কাছে কারা এসব তথ্য দিয়েছে।
বারাদী পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ উপ-পরিদর্শক (এসআই) দেবাশীষ অধিকারী তার বিরুদ্ধে স্থানীয়দের অভিযোগের কথা অস্বীকার করে বলেন, তিনি ওসি সাহেবের হুকুম তামিল করেছেন মাত্র। 'আপনারা আমার ওসি স্যারের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন।'
এলাকার মানুষ তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নিজেরাই পাহারার ব্যবস্থা করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
সম্প্রতি চুরির সঙ্গে জড়িত কাউকে আটক করা গেছে কি না, মামলা হয়েছে কি না এবং চুরির মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'এ নিয়ে কেউ থানায় মামলা করেনি।'
মেহেরপুর সদর থানার ওসি শাহ দারা খান বলেন, 'রাত জেগে গ্রামবাসীদের পাহারা দেওয়ার কোনো আইনগত বিধান নেই। চুরির আশংকা থেকে গ্রামবাসীই নিজ উদ্যোগে পাহারা দেবে বলে জানালে এবং সভা আহ্বান করলে সেখানে পুলিশ উপস্থিত ছিল। তবে কাউকে বাধ্য করা হচ্ছে বলে আমার জানা নেই।'