সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের পাশাপাশি সাম্প্রদায়িকতার মূলোৎপাটন দাবি
শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ওয়েবিনারে বক্তারা বলেছেন, এই উপমহাদেশে ১৮৬৭ সালে উত্তর ভারতের হিন্দি-উর্দু বিরোধ জন্ম দিয়েছিল সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বের। ১৯৪৮-এর বাংলা-উর্দু বিরোধের নিষ্পত্তি ঘটেছে এই সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বের সমাধি রচনার মাধ্যমে।
'আমাদের ভাষা আন্দোলন সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বের মৃত্যুবার্তা' শীর্ষক এই ওয়েবিনারে সভাপতিত্ব করেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির।
এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে নির্মূল কমিটি জানায়, ওয়েবিনারে বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য মানবাধিকার নেত্রী আরমা দত্ত, নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শিক্ষাবিদ শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শিক্ষাবিদ, কলাম লেখক মমতাজ লতিফ, নির্মূল কমিটির রাজশাহী মহানগরের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক সুজিত সরকার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আলা উদ্দিন, প্রজন্ম '৭১-এর সভাপতি শহীদসন্তান আসিফ মুনীর তন্ময়, শহীদ সুরকার আলতাফ মাহমুদের কন্যা শহীদসন্তান শাওন মাহমুদ, সুইডেনে অবস্থানকারী নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা ও জাগরণ-এর যুগ্ম সম্পাদক লেখক সাংবাদিক সাব্বির খান এবং নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক মানবাধিকার নেতা কাজী মুকুল।
শাহরিয়ার কবির বলেন, 'এই উপমহাদেশে ১৮৬৭ সালে উত্তর ভারতের হিন্দি-উর্দু বিরোধ জন্ম দিয়েছিল সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বের। ১৯৪৮-এর বাংলা-উর্দু বিরোধের নিষ্পত্তি ঘটেছে এই সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বের সমাধি রচনার মাধ্যমে। পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির অভিব্যক্তি ছিল রাজনৈতিক ইসলাম। পাকিস্তানের ২৪ বছরের উপনিবেশসুলভ শাসনামলে দেখেছি- ইসলামের নামে জাতিগত নিপীড়ন, শোষণ, হত্যা ও সন্ত্রাস সহ যাবতীয় মানবতাবিরোধী অপরাধ এমনকি গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধকেও কীভাবে জায়েজ করা হয়েছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে পরাজয় ঘটলেও স্বাধীন বাংলাদেশে পরাজিত রাজনৈতিক ইসলাম আবার ব্রাম স্টোকারের পিশাচ কাহিনী ড্রাকুলার মতো কবর থেকে উঠে এসেছে। রক্তপানের জন্য বেছে নিয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক মানবতার বোধকে। বাঙালিত্বের যে অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ১৯৪৮-এ ভয় পেয়েছিলেন জিন্নাহ ও লিয়াকত আলী, ১৯৭১-এ ভয় পেয়েছেন, ইয়াহিয়া ও গোলাম আযমরা সেই চেতনার আলোই বধ করবে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারকারী সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে।'
সংসদ সদস্য আরমা দত্ত বলেন, '৭১-এ ভাষার উপর ভিত্তি করে যে জাতিরাষ্ট্র গঠিত হয়েছে তা পৃথিবীতে অনন্য। শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলা ভাষার জন্য তৎকালীন পাকিস্তানের সংসদের দাঁড়িয়ে একা যে অসামান্য লড়াই চালিয়েছিলেন তা তিনি শুধুমাত্র মাতৃভাষা ও বাঙালি জাতির আত্মমর্যাদা ও আত্মপরিচয়ের চিহ্নকে রক্ষা করার জন্য, তা খ্যাতির জন্য নয়। আমরা যেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের সেই স্বপ্ন ও প্রত্যাশাকে জাগরুক রাখতে পারি।'
আরমা দত্ত মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ভাষা আন্দোলনের পুরোগামী নেতা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতিচারণ করে তরুণ প্রজন্মকে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হৃদয়ে ধারণ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'আজকের দিনে শুধুমাত্র ফুল দিয়ে ছবি তুলে ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা জানানোর যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে সেখান থেকে তরুণদের নিবৃত হতে হবে।'
নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শিক্ষাবিদ শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেন, 'ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের আত্মদানের কারণে শুধু ভাষার অধিকার ফিরে পেয়েছি তাই নয়, প্রকৃতপক্ষে আমার ফিরে পেয়েছি একটি জাতি রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার গৌরব এবং মর্যাদা। তাদের ঋণ শোধ হওয়ার নয়। দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবক্তা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তান আন্দোলনের সময় বলেছিলেন, হিন্দু ও মুসলমান সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ধর্ম, দর্শন, সামাজিক সংস্কার ও সাহিত্য থেকে উদ্ভূত। এমনকি হিন্দু ও মুসলমানগণ সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ইতিহাসের ধারা থেকে তাদের অনুপ্রেরণা লাভ করে থাকেন। প্রতিক্রিয়াশীল নেতা খাজা নাজিমুদ্দিন ঘোষণা করেছিলেন, আমাদের সংগ্রাম ভারত সরকারের বিরুদ্ধে নয়, হিন্দুদের বিরুদ্ধে। তাদের এই ভাবাদর্শের পরিণাম দেশবাসী দেখেছে। দেশভাগের ফলে পাকিস্তান ও ভারতে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা চরম রূপ ধারণ করেছিল। জীবন বাঁচাতে পৃথিবীর বৃহত্তম দেশান্তর তখন সংঘটিত হয়। ব্রিটিশদের বিভাজন ও শাসন নীতির ফলে সৃষ্টি এই ভয়াবহতায় প্রায় দেড় কোটি লোক বাস্তুচ্যুত হন।
'ভাষা আন্দোলনে সকল ধর্ম, পেশা ও শ্রেণির বাঙালির একাত্মতা একটি পৃথক চেতনার জন্ম দেয়। যা পরবর্তীতে অসাম্প্রদায়িক চেতনারূপে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালিকে মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর ছায়াতলে এসে দাঁড়াতে সাহায্য করে। সেই আন্দোলন ক্রমে ক্রমে বায়ান্ন, চৌষট্টি, উনসত্তর এবং অবশেষে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। কাজী নজরুল ইসলাম এদেশের মানুষের অন্তরের আকুতি লিখে গেছেন—'গাহি সাম্যের গান। যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান, যেখানে মিশেছে হিন্দু বৌদ্ধ মুসলিম খ্রীষ্টান।'
মমতাজ লতিফ বলেন, 'বাংলা ভাষা আন্দোলন সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বের মৃত্যুবার্তা বা মৃত্যু ঘটালেও সাম্প্রদায়িক অপশক্তি এখনো স্বাধীন বাংলাদেশে বিরাজমান। এই সাম্প্রদায়িক অপশক্তির সুযোগ পেলেই সংখ্যালঘুদের উপর আঘাত করে। আমি চাই বঙ্গবন্ধুর প্রতিষ্ঠিত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে দ্রুত 'সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন' অবিলম্বে করতে হবে যেন সন্ত্রাসীরা এমন বিভৎস হামলার সাহস না পায়।'