‘৩ জনের বেশি একত্রিত হয়ে শলা পরামর্শ রাষ্ট্রীয় আচরণবিধি বহির্ভূত’
লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩ জন বা তার বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী একত্রিত হতে পারবেন না বলে একটি নোটিশ জারি করেছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবু তাহের। গতকাল সোমবার তিনি এ নোটিশে সই করার পর সেটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে গেছে এবং বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নজরেও এসেছে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আবু তাহেরের সই করা ওই অফিস আদেশে বলা হয়, 'ইদানিং লক্ষ্য করা যাইতেছে যে কোন কোন কর্মকর্তা-কর্মচারী ৩ বা তার বেশী সংখ্যক একত্রিত হয়ে শলা পরামর্শ করে থাকেন। যা রাষ্ট্রীয়, সামাজিক কিংবা পারিবারিক, সরকারী চাকুরীর আচরণ বিধির বহির্ভূত। যদিও কোন কাজ করার প্রয়োজন মনে করিলে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে যৌক্তিকতার মাধ্যমে উপস্থাপন করার জন্য সকলকে নির্দেশ প্রদান করা গেল। ইহার ব্যত্যয় হলে তাহার ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য লিখিত ভাবে জানানো হবে।'
জানতে চাইলে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আবু তাহের দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. রাজিব এখানে দীর্ঘ ৮ বছর ধরে কর্মরত আছেন। তিনি লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা। তিনি নিজেকে হেলথ ক্যাডারের নেতা দাবি করে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আইনের প্রতি তোয়াক্কা না করে নিজের ইচ্ছামতো হাসপাতালে আসা-যাওয়া করেন। নিয়ম অনুযায়ী কমপক্ষে ৬ ঘণ্টা করে হাসপাতালে ডিউটি করার কথা থাকলেও, তিনি তা না করে নিজের খেয়াল খুশি মতো হাসপাতালে প্রবেশ করেন এবং বের হন।'
'এ ছাড়াও তিনি হাসপাতালের একটি কক্ষে তার কার্যালয় বানিয়ে সেখানে ডাক্তার ও কর্মচারীদের নিয়ে গ্রুপিং করেন। নবাগত চিকিৎসকদেরকে তিনি হাসপাতালে রোগী না দেখার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে হাসপাতালে আগত রোগীদেরকে উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট) দিয়ে রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে উদ্বুদ্ধ করেন। এ গ্রুপিংয়ের কারণে রোগীরা প্রকৃত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে,' বলেন তিনি।
ডা. তাহের জানান, তিনি হাসপাতালের রোগীদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার জন্য ব্যবস্থা নিয়েছেন। এতে ডা. রাজিব ক্ষিপ্ত হয়ে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন। অফিস চলাকালে কাজ ফেলে রেখে কর্মচারীরা দলবদ্ধ হয়ে ডা. রাজিবের অফিস কক্ষে জমায়েত হন।
এগুলো ঠেকাতে তিনি সোমবার ওই অফিস আদেশ জারির ব্যবস্থা নেন বলে জানান।
এই ধরনের নোটিশ তিনি জারি করতে পারেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. আবু তাহের বলেন, 'জ্বী পারি। জনস্বার্থে আমি এই অফিস আদেশ জারি করেছি।'
নোটিশটির স্মারক নম্বর দেওয়া হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'আগেই কে বা কাহারা অফিস আদেশটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেড়ে দিয়েছে। পরে আদেশটি আমি বাতিল করেছি।'
তবে এ আদেশের বিষয়টি জানাজানি হলে তা নিয়ে কমলনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত চিকিৎসক ও কর্মচারীদের মধ্যে উত্তেজনা শুরু হয়। এ ধরনের আদেশ জারির কারণ জানতে ওই স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক কার্যালয় থেকে তলব করা হয়েছে।
মেডিকেল অফিসার ডা. রেজাউল করিম রাজিব তার বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমি দীর্ঘ ৮ বছর ধরে এই হাসপাতালে কর্মরত আছি। আমার বিরুদ্ধে যদি চাকরি আচরণবিধি লঙ্ঘন কিংবা অন্য কোনো অভিযোগ থাকত, তাহলে উপজেলা স্বাস্থ্য ও কর্মকর্তা ডা. আবু তাহের কেন আমার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেন নি। তিনি একটি অবৈধ আদেশ দিয়ে বিতর্কিত হয়ে গেছেন।'
তিনি বলেন, 'একজনের সঙ্গে আরেকজনের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ কিংবা মতপার্থক্য থাকতেই পারে। সে জন্য তো দাপ্তরিকভাবে এমন অফিস আদেশ তিনি জারি করতে পারেন না। এই নোটিশ অবৈধ ও ভিত্তিহীন বলে আমি নোটিশে সই করিনি।'
এদিকে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এ ধরনের নোটিশ জারি করতে পারেন না বলে জানিয়েছেন লক্ষ্মীপুরের জেলা সিভিল সার্জন ডা. আহমেদ কবির।
তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এই ধরনের চিঠিতে আমরা বিব্রত। তবে কমলনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. তাহের এবং মেডিকেল অফিসার ডা. রাজিবের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব আছে দীর্ঘদিন ধরে। বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি।'
'ডা. আবু তাহের এই ধরনের অফিস আদেশ দিতে পারেন না। তার সই করা অফিস আদেশটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক ডা. আবু তাহেরকে ডেকেছেন,' যোগ করেন তিনি।
একজন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এ ধরনের নোটিশ জারি করতে পারেন কি না, তা জানতে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'অফিসে অনেক সময় কর্মচারীদের কাজ না করে গল্পগুজব করতে দেখা যায়। এগুলো বন্ধ করতে তিনি যদি এ নোটিশ দেন তবে আমি পজেটিভ বলব। কিন্তু, কাউকে উদ্দেশ্য করে বা দলাদলিকে কেন্দ্র করে তিনি যদি এ নোটিশ দেন তাহলে আমি বলব এটা দলাদলি আরও বাড়াবে।'
'কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী যদি শৃঙ্খলাবহির্ভূত কোনো কাজ করে থাকেন, তবে তার বিরুদ্ধে অনেক ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার আছে। তিনি এ ধরনের নোটিশ না দিয়ে, ইউএনও বা আরও সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারতেন,' বলেন তিনি।