ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে যেসব অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গত ২৪ ফেব্রুয়ারি একটি ইউরোপীয় রাষ্ট্র অপর একটি রাষ্ট্রের ওপর স্থল, সমুদ্র এবং আকাশ থেকে সবচেয়ে বড় সামরিক হামলার মাধ্যমে ইউক্রেনে আগ্রাসন চালায় রাশিয়া।
রয়টার্স জানায়, আগ্রাসনের প্রথম সপ্তাহে রাশিয়া ইউক্রেনের সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। পরে স্থল আক্রমণ বাড়িয়ে দেয়। বর্তমানে তারা রকেট আর্টিলারি, ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে কখনও কখনও বেসামরিক স্থাপনা এবং আবাসিক ভবনে বোমাবর্ষণসহ ইউক্রেনের বড় বড় শহরগুলোকে অবরুদ্ধ করে রাখার কৌশল নিয়েছে।
যদিও বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়টি অস্বীকার করে রাশিয়া বলছে, তারা প্রতিবেশী ইউক্রেনকে নিরস্ত্র করতে এবং সেদেশের জাতীয়তাবাদী নেতাদের অপসারণে 'বিশেষ সামরিক অভিযান' পরিচালনা করছে।
অগ্রাসনের তৃতীয় সপ্তাহে পূর্ব ইউক্রেনের প্রধান বন্দর মারিউপোলে কয়েক লাখ লোক অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন এবং সেখানে মুহুর্মুহু ভারী বোমাবর্ষণ করা হচ্ছে। শহরটির কর্মকর্তারা জানান, সেখানে পানি ও বিদ্যুৎ নেই। আহতদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ারও কোনো উপায় নেই। খারকিভ ও কিয়েভের আবাসিক ভবনে আঘাত হেনেছে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র। কয়েক লাখ ইউক্রেনীয় ইতোমধ্যে উদ্বাস্তু হয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন।
ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
আগ্রাসনের প্রথম দিকে ব্যাপকহারে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা হয় এবং প্রথমবারের মতো একটি যুদ্ধে একাধিক নির্ভুল লক্ষ্যবস্তুতে স্বল্প-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (এসআরবিএম) নিক্ষেপ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অনুমান, রুশ আক্রমণের প্রথমভাগে স্থল এবং সমুদ্র থেকে ১০০টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) গবেষণা বিশ্লেষক টিমোথি রাইট বলেছেন, 'রাশিয়া সম্ভবত এই প্রথম তার একমাত্র এসআরবিএম ইস্কান্দার-এম ব্যবহার করেছে।'
ইউক্রেনে অনেক পুরনো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ওটিআর-২১ তচকা এর সীমিত সরবরাহ রয়েছে। মিডিয়া রিপোর্ট বলছে, যুদ্ধের প্রথমদিকে রাশিয়ার একটি বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে অন্তত একটি ওটিআর-২১ তচকা নিক্ষেপ করেছিল ইউক্রেন।
আইআইএসএস'র মতে, ইস্কান্দার-এম'র পাল্লা তচকার চেয়ে বেশি এবং এর লঞ্চার একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারে।
গত শুক্রবার ইউক্রেনের সামরিক কমান্ড জানায়, সুমি, পোলতাভা এবং মারিউপোল শহরের কাছের এলাকাগুলোতে কৃষ্ণ সাগর থেকে ৩এম১৪ ক্যালিবার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে রুশ বাহিনী।
৩এম১৪ ক্যালিবার একটি স্থলে আক্রমণযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র (এলএসিএম), যার আনুমানিক পাল্লা ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার।
টিমোথি রাইট বলেন, 'ইউক্রেনের কাছে শীতল যুদ্ধকালীন সময়ের রাশিয়ার তৈরি এস-৩০০ভি বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র আছে, যেটিতে অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতাও রয়েছে। তবে এস-৩০০ভি ক্ষেপণাস্ত্রবাহী কয়েকটি গাড়ি ধ্বংসের তথ্য পাওয়া গেছে, কিন্তু এগুলো রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিধ্বস্ত হয়েছে কিনা নিশ্চিত নয়।'
স্থল যুদ্ধ
পূর্ব এবং উত্তরের দুটি প্রধান ফ্রন্টে রাশিয়ার অগ্রগতি এখন পর্যন্ত খুব বেশি দেখা যায়নি। তবে ইউক্রেনের দুটি বৃহত্তম শহর কিয়েভ এবং খারকিভে রুশ বাহিনীর বোমা হামলা ক্রমশ বাড়ছে।
সিভিল ডিফেন্স ইউনিট ও দেশজুড়ে গঠিত স্বাধীন মিলিশিয়ার মাধ্যমে ইউক্রেনের বেসামরিক নাগরিকরা সেনাদের সঙ্গে মিলে রুশ বাহিনীকে প্রতিহত করার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে।
ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় দেশগুলো ইউক্রেনকে বিভিন্ন ধরনের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। যার মধ্যে উন্নত অস্ত্র রয়েছে, যা সাঁজোয়া যান ধ্বংস করতে পারে।
এই অস্ত্রগুলোর মধ্যে আছে, যুক্তরাজ্য ও সুইডেনের যৌথভাবে তৈরি পরবর্তী প্রজন্মের ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এনএলএডব্লিউ এবং যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি হালকা বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এফজিএম-১৪৮ জ্যাভেলিন, যা কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে ট্যাংক ধ্বংস করতে পারে।
যুদ্ধে ইউক্রেন বাহিনীর জন্য আরেকটি অস্ত্র বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, যা হলো বেরেক্টার টিবি২। এটি তুরস্কের তৈরি ড্রোন, যা ছোট-বড় যুদ্ধযান বিধ্বংসী অস্ত্র বহন করতে পারে। তুরস্ক কিয়েভের কাছে এ ধরনের বেশ কিছু ড্রোন বিক্রি করেছে, যেগুলো পূর্ব ইউক্রেনে রুশ-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে মোতায়েন করা হয়েছিল।
অপরদিকে, বিএম-২১ রুশ সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত মাল্টিপল লঞ্চ রকেট সিস্টেমের (এমএলআরএস) একটি। ১৮ লঞ্চারের একটি ব্যাটালিয়ন একসঙ্গে ৭২০টি রুকেট ছুড়তে পারে।
গত বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বেন ওয়ালেস বলেছেন, 'রাশিয়ান বাহিনী ইউক্রেনে থার্মোবারিক বা ভ্যাকুয়াম অস্ত্র ব্যবস্থাও মোতায়েন করেছে।'