নিষেধাজ্ঞা কাটাতে রাশিয়ার ১০ পরিকল্পনা

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও তাদের মিত্র দেশগুলো। এরই মধ্যে রাশিয়ার বেশ কয়েকটি ব্যাংককে আন্তর্জাতিক লেনদেনের মেসেজিং ব্যবস্থা সুইফট থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এর বাইরে রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়কে নিষেধাজ্ঞায় লক্ষবস্তু করা হয়েছে। এর প্রভাবে দেশটির মুদ্রা রুবলের দাম পড়ে গেছে।

তবে নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতেও বেশ কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে ভ্লাদিমির পুতিনের সরকার। এরকম ১০টি নতুন উদ্যোগের বিষয়ে জানিয়েছে দেশটির গণমাধ্যম রাশিয়া টুডে।

১. সুইফটের জায়গায় 'মির'

রাশিয়ার প্রধান ব্যাংকগুলোকে গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল মেসেজিং সিস্টেম সুইফট থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলায় বৈশ্বিক লেনদেনে সমস্যায় পড়েছে দেশটি। সুইফটের বদলে এখন নিজস্ব ফিন্যান্সিয়াল মেসেজিং সিস্টেম 'মির' ব্যবহার করছে রাশিয়ার ব্যাংকগুলো। সেই সঙ্গে ভিসা ও মাস্টার কার্ডের বিকল্প সেবাও দিচ্ছে 'মির'।

২. রুবলে আমদানি-রপ্তানি

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে রাশিয়াকে বিচ্ছিন্ন করতে মার্কিন ডলার ও ইউরোতে রাশিয়ার সঙ্গে লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এর সমাধান হিসেবে রাশিয়া তার নিজস্ব মুদ্রা রুবলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। চীনের সঙ্গে ইতোমধ্যে ইউয়ান ও রুবল ব্যবহার করে আমদানি-রপ্তানি শুরু হয়েছে।

চলতি মাসের শুরুর দিকে তুরস্ক রুবলে লেনদেনের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। রাশিয়া থেকে তেল আমদানিতে ভারত রুবল ও রুপিতে দাম পরিশোধ করবে। ভারতের আমদানি করা তেলের ৩ শতাংশ আসে রাশিয়া থেকে। সার্বিয়ার মতো ভারতও রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বাড়াতে চায়।

পাশ্চাত্যের দেশগুলো রাশিয়াকে একঘরে করার চেষ্টা করলেও সেটা সহসাই অর্জিত হবে না, এটা তারই ইঙ্গিত দেয়।

৩. রুশ কোম্পানিগুলোকে ডলার ছেড়ে রুবলে আসার নির্দেশ

রুবলকে শক্তিশালী করতে বিদেশে বিনিয়োগ করা রুশ প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে থাকা বৈদেশিক মুদ্রার ৮০ ভাগ বিক্রি করে রুবলে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে রুবলের মান স্থিতিশীল হবে ও রাশিয়ায় বিনিয়োগ বাড়বে বলে আশা করছে ক্রেমলিন।

৪. খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শস্য রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা

গত সপ্তাহে ইউরেশিয়ান ইকোনমিক ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে সাময়িকভাবে শস্য রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে রাশিয়া। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর স্বাধীনতা পাওয়া বেশ কয়েকটি দেশের মধ্যে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের জন্য এই জোট তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যে আছে আর্মেনিয়া, বেলারুশ, কাজাখস্তান ও কিরগিজিস্তান। অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য স্থিতিশীল ও খাদ্য মজুদ শক্তিশালী করতে এই ব্যবস্থা নিয়েছে মস্কো।

৫. সুদের হার বৃদ্ধি

জাতীয় মুদ্রাকে শক্তিশালী করতে সুদের হার বাড়িয়েছে রাশিয়া। রুবলের দরপতন ঠেকাতে গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার সাড়ে ৯ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করেছে। স্থানীয় মুদ্রার দরপতনের মুখে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল ও জনগণের সঞ্চয়কে সুরক্ষা দিতে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঋণ গ্রহণকারীদের সুরক্ষার জন্যও এ রকম বেশ কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এসব ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে গত ৬ দিন ধরে ইউরো ও ডলারের বিপরীতে রুবলের দাম বেড়েছে।

৬. রুবলে ঋণ পরিশোধ

গত বুধবার রাশিয়া তার বন্ডের গ্রাহকদের মোট ১১৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধ করেছে। বিদেশে জব্দ করা ব্যাংক হিসাব থেকে এই অর্থ এসেছে। এই অর্থ পরিশোধে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র দেশগুলো বাধা দিলে রাশিয়া সরকার নিজস্ব মুদ্রায় এই অর্থ পরিশোধ করবে। রাশিয়া যে মুদ্রায় ঋণ নিয়েছিল সেই মুদ্রাতেই পরিশোধের বাধ্যবাধকতা আছে।

গত এক শতাব্দীতে রাশিয়া কখনো ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়নি। এখন সেই ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় মস্কো বলছে, পাশ্চাত্য বিশ্ব কৃত্রিমভাবে রাশিয়াকে ঋণ খেলাপি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে, যেখানে রাশিয়া ঋণ পরিশোধে সম্পূর্ণভাবে সক্ষম।

৭. নাগরিকদের জন্য সুরক্ষা

অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে যেসব নাগরিক সমস্যায় পড়েছে তাদের সুরক্ষার জন্য গত বুধবার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নতুন কিছু আদেশ জারি করেছেন। যেসব পরিবারে বৃদ্ধ ও শিশু আছে তারা সরকারি সুরক্ষার আওতায় আসবেন।

পুতিন বলেছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ন্যূনতম মজুরি, সামাজিক সুবিধা ও সরকারি চাকরিতে বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

৮. উদ্যোক্তাদের জন্য আর্থিক সহায়তা

ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দিতে খসড়া পরিকল্পনা অনুমোদন দিয়েছে রাশিয়া সরকার। ব্যক্তি পর্যায়ে উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ভর্তুকি ও ঋণ দিতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে সরকার।

৯. রপ্তানিকারকদের অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্য সরবরাহের পরামর্শ

নিষেধাজ্ঞার মুখে রপ্তানিকারকদের উৎপাদন না কমিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন পুতিন। এর ফলে তেল, ধাতুসহ অন্যান্য রপ্তানি পণ্যের দাম দেশের বাজারে স্থিতিশীল থাকবে।

১০. বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাশিয়া না ছাড়ার পরামর্শ

নিষেধাজ্ঞার কারণে বেশ কয়েকটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান চলতি মাসে রাশিয়া থেকে তাদের কার্যক্রম সাময়িকভাবে গুটিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে আছে—আইকিয়া, মাইক্রোসফট, ফক্সওয়াগন, অ্যাপল, শেল, ম্যাকডোনাল্ডস ও এইচএন্ডএম।

এরই মধ্যে এই প্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয়করণের কথা উঠলেও বুধবার প্রেসিডেন্ট পুতিন তার ভাষণে বলেছেন, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত মালিকানার অধিকারকে রাশিয়া সম্মান করবে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিচালনায় বাইরে থেকে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার কথাও বলেছিলেন তিনি। এ ব্যাপারে দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় কাজ করছে।