ইরান যুদ্ধে ট্রাম্প কী পেলেন, কী হারালেন
যুদ্ধের প্রভাবে যখন বিশ্ব অর্থনীতিতে নেমে এসেছে কালরাত, ব্যাপক সামরিক ধ্বংসযজ্ঞে মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্টি হয়েছে মানবিক সংকট। তখনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ বা ইরান যুদ্ধ সম্প্রতি একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে থেমে দাঁড়িয়েছে।
এই যুদ্ধে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই নিজেদেরকে বিজয়ী ঘোষণা করেছে। কিন্তু দীর্ঘ প্রায় ছয় সপ্তাহের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত শেষে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—ট্রাম্প এই যুদ্ধ থেকে আসলে কী চেয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত কী পেলেন?
যুদ্ধের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য
ইরানে হামলার ক্ষেত্রে ট্রাম্প মূলত ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন বলে জানায় নিউইয়র্ক টাইমস। হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে এক বৈঠকে নেতানিয়াহু একটি চার স্তরের পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন, যেখানে সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করা, সামরিক শক্তি পঙ্গু করা, গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করা এবং সবশেষে শাসনব্যবস্থার পতন ঘটিয়ে রেজা পাহলভির মতো কোনো ধর্মনিরপেক্ষ নেতাকে ক্ষমতায় বসানো ছিল।
ট্রাম্পের লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা চিরতরে শেষ করা এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচি ধ্বংস করা। মার্কিন গোয়েন্দা প্রধান এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের এই ধারণাকে অবাস্তব বলে সতর্ক করলেও, ট্রাম্প দ্রুত ও চূড়ান্ত বিজয়ের আশায় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প ও তার প্রশাসন সামরিক দিক থেকে অভাবনীয় সাফল্য এবং যুদ্ধের জয়লাভের দাবি করছেন শুরু থেকেই।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, এই অপারেশনের মাধ্যমে টানা পাঁচ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ১৩ হাজারেরও বেশি মিসাইল ও বোমা নিক্ষেপ করে ইরানের সামরিক অবকাঠামোতে ব্যাপক আঘাত হানা হয়।
হামলায় প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেন, এই হামলায় ইরানের নৌবাহিনী এখন সমুদ্রের তলদেশে এবং বিমান বাহিনী সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিও কয়েক বছর পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে বলে দাবি করেছে হোয়াইট হাউস।
পারমাণবিক ঝুঁকি বৃদ্ধি
ট্রাম্প আশা করেছিলেন এই যুদ্ধের ফলে ইরানের ভেতরে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠবে এবং বর্তমান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটবে। কিন্তু বাস্তবে তেমন কিছুই ঘটেনি। উল্টো নিহত আয়াতুল্লাহ খামেনির জায়গায় তার ছেলে মোজতবা খামেনি ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন।
মিডল ইস্ট ইন্সটিটিউটের ফেলো ড্যানিয়েল বেনাইম মার্কিন গণমাধ্যম এনপিআরকে বলেন, মোজতবা খামেনি তার বাবার চেয়েও অনেক বেশি কট্টরপন্থী এবং আদর্শিক। ফলে ইরানের কট্টরপন্থী সরকার সম্পূর্ণ অক্ষত রয়েছে।
তিনি বলেন, পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে আয়াতুল্লাহ খামেনির একটি ধর্মীয় নির্দেশ বা ‘ফতোয়া’ ছিল। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এটি বড় বাধা হিসেবেও কাজ করত। তার মৃত্যুর পর সেই ফতোয়াও বাতিল হয়ে গেছে বলে ধরা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, উত্তর কোরিয়ার মতো নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে ইরান এখন আরও মরিয়া হয়ে দ্রুত পারমাণবিক বোমা তৈরির দিকে এগোতে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের জয়
আটলান্টিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই যুদ্ধে ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় কৌশলগত ব্যর্থতা এবং ইরানের সবচেয়ে জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে।
সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের অন্যতম প্রধান এই তেল সরবরাহ পথটি ইরান বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছে যায় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে।
যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে প্রণালিটি খুলে দেওয়ার কথা থাকলেও এর নিয়ন্ত্রণ কার্যত ইরানের হাতেই থেকে যাচ্ছে। ইরান এখন এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজের কাছ থেকে টোল আদায়ের পরিকল্পনাও করেছে বলে জানায় দ্য আটলান্টিক।
প্রতি জাহাজের জন্য ২ মিলিয়ন ডলার বা প্রতি ব্যারেল তেলে ১ ডলার টোল আদায় করা হলে, ইরান বছরে প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারে। এই অর্থ বাংলাদেশের দেড় বছরের বাজেটের সমান। তাই এই বিপুল পরিমাণ অর্থ তাদের অর্থনীতিকে যুদ্ধ-পূর্ববর্তী অবস্থার চেয়েও বেশি শক্তিশালী করবে।
আমেরিকার বৈশ্বিক প্রভাব হারানো
এই যুদ্ধ আমেরিকার বৈশ্বিক প্রভাব ও মিত্রদের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষত ন্যাটোভুক্ত পশ্চিমা মিত্রদের তিনি পাশে পাননি।
আবার যুদ্ধ শুরু করার আগে ট্রাম্প সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতের মতো উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোকে কোনো ধরনের পূর্ব সতর্কবার্তাও দেননি বলে দাবি করেছে এনপিআর। এর ফলে যুদ্ধের শুরুতে এসব দেশের তেল স্থাপনায় ইরান হামলা চালাতে সক্ষম হয়, যা মিত্রদের সাথে আমেরিকার আস্থার সম্পর্ককে প্রভাবিত করেছে।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্ট এই অস্থিতিশীলতার কারণে এশিয়ার দেশগুলো যখন বিকল্প জ্বালানি খুঁজছে, তখন চীন নিজেকে একটি স্থিতিশীল বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছে। নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, কোনো গুলি না ছুঁড়েই ওই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব ও বিনিয়োগ বহুগুণ বাড়িয়ে নিয়েছে চীন।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্প একটি চূড়ান্ত বিজয়ের আশা নিয়ে এই যুদ্ধে জড়ালেও তাকে শেষ পর্যন্ত একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে বাধ্য হতে হয়েছে। দীর্ঘ ধ্বংসযজ্ঞের পর ইরানের সরকার শুধু টিকেই নেই, বরং হরমুজ প্রণালীর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখে অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে আগের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠার এক অভূতপূর্ব সুযোগ পেয়েছে।