বিনা খরচে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ, আশা ও আশঙ্কা
প্রবাসী কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার সম্প্রতি ঘোষিত ‘বিনা খরচে নিয়োগ’ নীতি বা জিরো কস্ট রিক্রুটমেন্ট পলিসিকে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি থাকায় এই উদ্যোগের বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে।
গত ৮ এপ্রিল ঢাকা ও কুয়ালালামপুরের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, ‘নতুন এই ব্যবস্থায় কর্মীর অভিবাসন ব্যয় শূন্যে নেমে আসবে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) নির্দেশিত “নিয়োগকর্তা খরচ দেবে” নীতি অনুযায়ী পুরো খরচ বহন করবেন মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তা।’
মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় বাংলাদেশের শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী শ্রী রামানান রামাকৃষ্ণানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর এই বিবৃতি দেওয়া হয়।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে তারা প্রশ্নও তুলেছেন।
তাদের এই উদ্বেগের কারণ হলো সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মালয়েশিয়ায় চাকরি পেতে একেকজন বাংলাদেশি কর্মীকে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়েছে। অথচ সরকারিভাবে নির্ধারিত খরচ ছিল মাত্র ৭৯ হাজার টাকা। ওই সময়ে কর্মী পাঠানোর জন্য ১০১টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সিকে দায়িত্ব দিয়েছিল মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ।
২০২৪ সালের ৩১ মে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ার আগে প্রায় সাড়ে চার লাখ বাংলাদেশি দেশটিতে গিয়েছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) সাবেক নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সি আর আবরার বলেন, আইএলও নির্দেশিকা অনুযায়ী ‘নিয়োগকর্তা খরচ দেবেন’ নীতি অভিবাসী কর্মীদের অন্যতম প্রধান দাবি। কিন্তু এটি কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি। উল্টো দালালেরা বিভিন্ন ধাপে এই খরচ বাড়িয়ে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মালয়েশিয়া ‘ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফডব্লিউসিএমএস)’ নামের একটি আইটিভিত্তিক নিয়োগ পদ্ধতি ব্যবহার করেছিল। এরপরও অতিরিক্ত খরচ এবং কর্মীদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায়ের মতো বিষয়গুলো থেকেই গেছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘তাহলে এবারও সেই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়?’
অনিয়ম ও শ্রমিক নির্যাতনের অভিযোগে ১৯৯৭ সালে প্রথম মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়। এরপর থেকে একটি ধারা তৈরি হয়েছে—কয়েক বছরের জন্য বাজার খোলে, তারপর আবার বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৯২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এই বাজার পাঁচবার খোলা ও বন্ধ হয়েছে। এটা নিয়ে দেশ-বিদেশে গণমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনাও হয়েছে। এমনকি শ্রমিক নির্যাতনের অভিযোগে অনেক আন্তর্জাতিক ক্রেতা মালয়েশিয়ার কিছু কোম্পানি থেকে পণ্য কেনা বন্ধ করে দিয়েছিল।
গত বছর মালয়েশিয়া নিয়ে মানবপাচার ও অর্থ পাচারের অভিযোগে বাংলাদেশি এজেন্টদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। এর জেরে গত ২৩ এপ্রিল মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন মহাসচিব আজমান মোহাম্মদ ইউসুফ বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দেন। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, এসব অভিযোগ মালয়েশিয়ার সুনাম ক্ষুণ্ন করেছে।
অধ্যাপক আবরার মনে করেন, মালয়েশিয়া যদি সত্যিই একটি স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চায়, তবে তাদের এসব মামলা নিয়ে এত বেশি উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত নয়। তিনি বলেন, ‘মালয়েশিয়ার সুনাম তখনই ফিরবে, যখন দায়ীদের শাস্তি দেওয়া হবে।’
মালয়েশিয়ায় শ্রম অভিবাসনবিষয়ক গবেষক মোহাম্মদ হারুন-অর-রশিদ জানান, কুয়ালালামপুর ২০১৬-১৮ সালে ১০টি এবং ২০২২-২৪ সালে ১০১টি এজেন্সিকে ‘যোগ্য’ হিসেবে বেছে নিয়েছিল। কিন্তু এই যোগ্যতার মাপকাঠি কী ছিল, তা কখনোই পরিষ্কার করা হয়নি। গত বছর তারা রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর জন্য নতুন কিছু শর্ত দিয়েছে, যা বেশ প্রশ্নবিদ্ধ।
গত বছরের ২৭ অক্টোবর কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনে পাঠানো এক চিঠিতে মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর জন্য বেশ কিছু শর্তের কথা জানায়। এর মধ্যে রয়েছে—ন্যূনতম পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা, গত তিন বছরে অন্তত ৩ হাজার কর্মী পাঠানোর রেকর্ড এবং কমপক্ষে তিনটি দেশে কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা।
এ ছাড়া এজেন্সিগুলোর অন্তত ১০ হাজার বর্গফুটের নিজস্ব কার্যালয়, বৈধ লাইসেন্স ও ভালো আচরণের সনদ (ক্লিয়ারেন্স), বিদেশি নিয়োগকর্তাদের পাঁচটি রেফারেন্স এবং নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও আবাসিক ব্যবস্থা থাকতে হবে।
গবেষক হারুনের মতে, এসব শর্তের কারণে অভিবাসন ব্যয় আরও বেড়ে যাবে। তিনি বলেন, ‘যার বৈধ লাইসেন্স আছে এবং নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করার সক্ষমতা আছে, তাকেই যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। দুর্নীতি করলে তার শাস্তি হওয়া দরকার। কিন্তু মালয়েশিয়া একদিকে খরচ কমানোর কথা বলছে, অন্যদিকে এমন শর্ত দিচ্ছে যা মূলত খরচ বাড়িয়ে দেবে।’
বিদেশি কর্মী নিয়োগে প্রস্তাবিত নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থা নিয়েও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গত ১৬ এপ্রিল সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ জানায়, মালয়েশিয়া ‘বেস্টিনেট এসডিএন বিএইচডি’ নামের একটি কোম্পানির তৈরি নতুন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে যাচ্ছে। এই কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মালয়েশীয় ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম, যিনি ‘দাতো আমিন’ নামেও পরিচিত।
‘ইউনিভার্সাল রিক্রুটমেন্ট অ্যাডভান্সড প্ল্যাটফর্ম (টুরাপ)’ নামের এই ব্যবস্থা সম্পর্কে বলা হচ্ছে, এর মাধ্যমে কোম্পানিগুলো কোনো দালাল ছাড়াই সরাসরি কর্মী নিয়োগ করতে পারবে।
তবে হারুন-অর-রশিদ বলেন, ‘শুনতে খুব ভালো লাগছে, কিন্তু আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা কী বলে? এই বেস্টিনেটই এর আগে এফডব্লিউসিএমএস পদ্ধতি তৈরি করেছিল। যার মাধ্যমে ২০২২ থেকে ২০২৪ সালে মাত্রাতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয়েছে। দুই দেশের রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের একটি সিন্ডিকেট এটা নিয়ন্ত্রণ করত।’
তিনি আরও বলেন, আইএলওর নীতি অনুযায়ী, ভিসা, চিকিৎসা পরীক্ষা ও যাতায়াতসহ অভিবাসনসংক্রান্ত সব খরচ নিয়োগকর্তাকে বহন করতে হবে। কর্মীর খরচ হবে শুধু পাসপোর্ট তৈরি করা।
হারুনের মতে, ‘দুই দেশের সরকারকেই অতীতের এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তা না হলে এই খাতে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে না।’