মাইলসের পরিবর্তে কনসার্টে চন্দ্রবিন্দু

ভারতের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ১৩ আগস্ট কলকাতায় নজরুল মঞ্চে আজাদী কনসার্ট। সেখানে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যান্ড মাইলস ও কলকাতার ফসিলসের পরিবেশনার কথা ছিল। ভারতবিদ্বেষের কথা বলে প্রথমে মাইলসকে বয়কটের ডাক দেয় ফসিলস। এর পরিপ্রেক্ষিতে মাইলস একটি ভিডিও প্রকাশ করে। এতে কথা বলেন দলটির অন্যতম দুই সদস্য শাফিন আহমেদ ও মানাম আহমেদ।
ভিডিওর শুরুতে শাফিন বলেন, ‘কলকাতার একটি ব্যান্ড আমাদের নামে অপপ্রচার চালাচ্ছে, এটা আমরা জানতে পেরেছি। তারা যে আমাদেরকে বয়কটের ডাক দেবে তা আমরা আশা করিনি। সংগীতকে মানচিত্র দিয়ে ভাবা ঠিক নয়।’

8c06e0762973c83ccb549a4e3c2.jpg

 আজাদী কনসার্টে সংগীত পরিবেশনের কথা ছিল বাংলাদেশের মাইলস ও ভারতের ফসিলস এবং পাপনের। কিন্তু মাইলস ব্যান্ডের হামিন আহমেদ ও শাফিন আহমেদের পুরনো কয়েকটি স্ট্যাটাস নিয়ে নতুন করে আন্দোলন শুরু করে ফসিলসের ভক্তরা। এতে যোগ দেন ফসিলসের সদস্যরাও।
মাইলসের বিরুদ্ধে রীতিমতো মানববন্ধন, প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন নিয়ে রাস্তায় হাজির ফসিলস সদস্যরা। আমার ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে স্ট্যাটাস দিয়েছি। আমি আমার দেশকে নিয়ে কী লিখব না লিখবÑ এটা আমার বিষয়। বিশ্বকাপ ক্রিকেট চলাকালে প্রত্যেকেই তার দেশের পক্ষে কথা বলতে পারে। এছাড়া একজন নাগরিক হিসেবে দেশের ক্ষতি হয়, এমন কাজে আমি কথা বলেছি। এটা ভারত বিদ্বেষ নয়, দেশপ্রেম।
দেশের যে কোনো ব্যাপারে নাগরিক হিসেবে মন্তব্য করার অধিকার আমার আছে। এটাকে টেনে নিয়ে সাংস্কৃতিক আয়োজনের সঙ্গে মেলানোর কোনো প্রয়োজন ছিল বলে আমরা মনে করি না। দেশপ্রেমের কথা বলাটা ভারতবিদ্বেষ নয়। বিদ্বেষ সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার।

2015_06_25_06_41_05_TOkuoyU.jpg

মানাম আহমেদ বলেন, ‘ফসিলস দেশপ্রেম ও বিদ্বেষ গুলিয়ে ফেলেছে। তাই বলে একটি ব্যান্ড হয়ে অপর একটি ব্যান্ডের কনসার্ট বাতিল করার মতো ঘটনা রূপমের কাছে আমরা আশা করিনি। এটা অত্যন্ত নোংরা ও ছোট মানসিকতার কাজ হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা চাই সাংস্কৃতিক বিনিময় আরো বাড়–ক। ভারতীয় শিল্পীরা এলে কিন্তু মাইলসের কেউ সমালোচনা করে না। ফসিলসও চাইলে যখন ইচ্ছে এ দেশে কনসার্ট করে যেতে পারবে। কিন্তু রূপম যেটা করেছে তা নোংরামি। এটা তার কাছ থেকে কাম্য নয়।’
রূপম ইসলাম ফেসবুকে ভিডিওতে বলেন, ‘আমরা চেয়েছি কনসার্ট হোক। তাই প্রথমে আয়োজকদের কাছে লাইনআপ দেখার পরও সাইন করি। ঠিক এরপর আয়োজকরা প্রমোশন চালু করেন। এই প্রমোশন দেখে দর্শক-শ্রোতারা মাইলসের অংশগ্রহণের কথা জানতে পারে। কিন্তু তাদের মধ্যে একটা অস্থিরতা দেখি। মাইলসকে নিয়ে তারা একের পর এক আমাদের প্রশ্ন করতে থাকে। তাদের কথা, দেশবিদ্বেষী এমন একটি দল কীভাবে স্বাধীনতা দিবসের কনসার্ট করতে পারে? আমরা ভেবে পাই না, কী উত্তর দেব? আমাদের কাছে উক্তি (স্ট্যাটাস) তুলে ধরা হয় শাফিন ভাই ও হামিন ভাইয়ের। ভারতকে ‘রেপ ক্যাপিটাল’ বলেছেন, ‘ফাকিং কান্ট্রি’ বলেছেন। এটা দেশপ্রেম না অন্যকিছু, তা বোঝার মতো শিক্ষাগত যোগ্যতা আমার আছে। যারা ওপেন মাইন্ডের তারা বুঝতে পারবেন।’
‘আমরা কিন্তু তাদের পোস্ট ফলো করিনি। এগুলো জানালেন শ্রোতারা। আমরা চিন্তায় পড়লাম, তাদেরকে কী উত্তর দেব? এরপর আমরা এটাও ভেবেছি, পাশাপাশি যদি আমরা পারফর্ম করি, তাদের যদি শ্রোতারা প্রশ্ন করেন বা সংঘর্ষ হয়; তখন কী হবে? সেটা সংগীত আসর হবে না, সংঘর্ষ হয়ে যায়। তাই আমি আমাদের ব্যান্ডের প্রত্যেককেই জিজ্ঞাসা করলাম, আমরা কী করব? তাদের সবার মত, দেশের সঙ্গে যারা এমন কথা বলেন, তাদের সঙ্গে অন্তত আজাদী কনসার্ট করা উচিত না। আমাদের প্রত্যেক সদস্য বলেন, এটাতে গ-গোল হতে পারে। এমন কনসার্ট করা যাবে না। রূপম প্রশ্ন তোলেন শাফিন ও হামিনকে নিয়েও।
‘অন্য দেশ সম্পর্কে নিন্দা করা যায়। কিন্তু ভেবে দেখুন তো, কোন দেশ একেবারে ভালো? আপনি যদি একটি দেশের খারাপ জিনিস তুলে ধরেন। ভালোটা চোখে পড়ে না, তাহলে এটা কী বলবেন? আপনারা বলেছেন, আমরা ‘বয়কট মাইলস’ মুভমেন্ট তৈরি বা হেইট ক্যাম্পেইন করেছি। এগুলো আমরা করিনি, যুক্তির মুখে দাঁড়িয়েছি। এগুলো শুরু হওয়ার পর আমরা জানতে পেরেছি। এভাবে বড় হওয়া যায় না। যারা নিজেদের যোগ্যতায় ধীরে ধীরে বড় হয়, লড়াই করতে করতে হয়েছে; তাদের ছোট করা যায় না। এভাবেই ফসিলস বা রূপম তৈরি হয়েছে, তাদের আয়নার সামনে দাঁড়ানো উচিত। অন্যকে ছোট করে বড় হওয়া যায় না। অন্যরাই ছোট হয়, যারা ছোট হওয়ার উপকরণ বিশ্বে ছড়িয়ে রাখেন।’
রূপম কলকাতায় গিয়ে মাইলস বা বাংলাদেশি শিল্পীদের কনসার্ট করতে আহ্বানও জানান। মাকসুদকে তার গুরু হিসেবে, জেমস, আইয়ুব বাচ্চুকেও সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করেন। কিন্তু নিজের অবস্থান নিয়ে কোনো দ্বিধা নেই।
মাইলসের বদলে ‘চন্দ্রবিন্দু’ পারফর্ম করেছে। কনসার্টে ‘ফসিলস’কে বাদ দেয়ার পর রীতিমতো ঝড় বয়ে গিয়েছিল সোশ্যাল মিডিয়ায়। পরে জানা যায় ফসিলস কনসার্ট করে।

Prombroto-555x525.jpg

ফসিলসের ম্যানেজার রূপসা দাশগুপ্ত ফেসবুকে লেখেন, আয়োজকরা জানিয়েছেন ‘ফসিলস’কে বাদ দেয়ার ঘোষণাটা পরিস্থিতি সামাল দিতে করা হয়েছিল।
পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় ফেসবুকে এ বিষয়ে লেখেন‘...ভারতীয়দের মধ্যে কিছু লোক প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেন, তাদের অকারণে ছোট করে ভাবেন বিরাট দেশপ্রেমিক হওয়া গেল।’ পরমব্রত বলেছেন, ‘এদের বিরোধিতা করেই আমি অনেক কটু কথা শুনেছি। এমনকি, দেশদ্রোহী তকমাতেও ভূষিত হয়েছি।’ বলেছেন, অন্য সুরে কথা না বলে পারছেন না তিনি। তবে সেটা ‘নিরপেক্ষভাবে’। ...প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কেউ যদি আমার দেশ ভারতের নামে অকারণে খারাপ কথা বলে, তাহলে সেটারও সমালোচনা হওয়া দরকার... আমি যদি তার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের সঙ্গে এক মঞ্চে পারফর্ম করতে অস্বীকার করি, আমার ব্যক্তিগত জায়গা থেকে, তাহলে সেটা নিয়ে অত হইচইয়ের কী আছে? রক শ্রোতাদের মধ্যে আলোচনা, তাহলে কি ‘ফসিলস’-এর সরে আসাটা ‘হইচই’ মনে হলো অভিনেতার? পরমব্রত এ-ও বলেছেন, ‘আমি ‘মাইলস’-এর ভক্ত নই, ‘ফসিলস’-এরও নই... তোমার যেমন মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে, তেমনই আমারও আমার সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার আছে মনে হয়।’
‘দু’বাংলাতেই যারা ঘৃণা ছড়িয়েছেন বা ছড়াচ্ছেন, তাদের আরো একবার বলি, ইতিহাস জানুন। বাঙালির বিবর্তন জানুন।