কর হারের পরিবর্তনে স্বস্তি পাবেন যারা, যাদের জন্য চাপ
আজ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের নতুন বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। বাজেটে তামাকজাত পণ্য, প্রচলিত জ্বালানিচালিত গাড়ি ও নির্দিষ্ট কিছু আমদানি পণ্যে কর বাড়ানো হচ্ছে। প্রণোদনা থাকছে পরিবেশবান্ধব শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিপণ্য নির্মাতাদের জন্য।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও চিকিৎসাসামগ্রীর ওপর শুল্ক-কর কমানো হতে পারে। একই সঙ্গে ব্যক্তিশ্রেণিতে করমুক্ত আয়সীমাও বাড়ানো হবে।
অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আজ সংসদে তার প্রথম বাজেট পেশ করবেন। আগামী অর্থবছরের (২০২৬-২৭) জন্য রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এই লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা।
বাজেটে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য করের নিয়মনীতিতে আরও কড়াকড়ি করা হতে পারে। করজালের আওতা বাড়াতে ব্যবসায় শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) এবং করদাতা শনাক্তকরণ নম্বরের (টিআইএন) ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ থাকছে।
করজালের আওতা বাড়াতে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহের ওপর শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ আগাম কর বসানোর প্রস্তাব আসতে পারে। এর পরিমাণ খুব বেশি নয়; প্রতি ১ হাজার টাকার পণ্য সরবরাহে দিতে হবে মাত্র ২ টাকা।
স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি হিসেবে সরকার এবারও শুল্ক যৌক্তিকীকরণের ধারা অব্যাহত রাখতে চায়। এর অংশ হিসেবে ৬৯টি শ্রেণির পণ্যে আমদানি শুল্ক কমানো, ১১৩টি পণ্যে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার এবং ৯টি পণ্যে সম্পূরক শুল্ক কমানো বা তুলে নেওয়া হতে পারে।
এর আগে ২০টি আমদানি পণ্যে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট বসানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
সুবিধা পাবে সৌরবিদ্যুৎ ও বৈদ্যুতিক গাড়ি
নতুন বাজেটে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেতে যাচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রপাতি। সোলার ইনভার্টার, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি, ব্যাটারি প্যাক হাউজিং, সোলার প্যানেল এবং লোহা ও অ্যালুমিনিয়ামের মাউন্টিং কাঠামোর ওপর আমদানি শুল্কসহ অন্যান্য কর কমানো বা মওকুফ করা হতে পারে।
২০৩৫ সাল পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করমুক্ত রাখা এবং সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের ৫ শতাংশ কর রেয়াত দেওয়ার পরিকল্পনা প্রস্তাবে থাকছে। একই ধরনের সুবিধা পেতে পারে বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) খাতও।
বৈদ্যুতিক গাড়ি ও এর ব্যাটারি উৎপাদন, চার্জিং অবকাঠামো এবং বৈদ্যুতিক বাস ও ট্রাকের ক্ষেত্রে করছাড়ের প্রস্তাব করা হচ্ছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধনে অগ্রিম আয়করও উল্লেখযোগ্য হারে কমানো হতে পারে।
২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত দামের আমদানি করা বৈদ্যুতিক গাড়ির মোট কর ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৪ শতাংশ করা হতে পারে। এ ছাড়া ইভি চার্জার ও চার্জিং স্টেশনের আমদানি শুল্ক ৩৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য হবে।
পরিবেশবান্ধব গাড়ির ব্যবহারে ক্রেতাদের উৎসাহিত করতে ১ হাজার ২০০ সিসি থেকে ১ হাজার ৬০০ সিসি ইঞ্জিনের পেট্রল ও ডিজেলচালিত গাড়ির কর ১৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ করা হতে পারে।
সেমিকন্ডাক্টর, ব্যাটারি, কম্পিউটার, ইলেকট্রনিক পণ্য, ইভির যন্ত্রাংশ ও বৈদ্যুতিক বাসের মতো পরিবেশবান্ধব ও উৎপাদনমুখী খাতগুলোর জন্য প্রস্তাবিত প্রায় সব বড় শুল্ক অব্যাহতি ২০৩০ বা ২০৩১ সাল পর্যন্ত বহাল থাকবে। বিনিয়োগকারীরা যাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারেন, সে জন্যই এই পদক্ষেপ।
ফ্রিল্যান্সার, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও স্টার্টআপ
এবারের বাজেটের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো ফ্রিল্যান্সারদের জন্য করসুবিধা সম্প্রসারণ। এত দিন এ প্রণোদনা মূলত তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এবার সরকার সব ধরনের ফ্রিল্যান্সিং আয়ের ওপর এ সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করতে পারে।
বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব বিবেচনা করে তাদেরও সম্পূর্ণ আয়কর অব্যাহতি দেওয়া হতে পারে।
স্টার্টআপ উদ্যোগ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসাগুলোর ক্ষেত্রে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত টার্নওভার কর শূন্য এবং স্থানীয় লেনদেন, সেবা আমদানি ও জায়গা ভাড়ার ওপর সম্পূর্ণ ভ্যাট মওকুফ করা হতে পারে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাও করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির সুবিধা পাবেন। সাধারণ উদ্যোক্তাদের জন্য টার্নওভার সীমা বাড়িয়ে ৫০ লাখ টাকা এবং নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের জন্য তা ৭০ লাখ টাকা করা হতে পারে।
প্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টরে জোর
প্রযুক্তিপণ্য নির্মাতারাও এবার বাজেটে লাভবান হবেন। মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ইলেকট্রনিকস পণ্য ও ডিজিটাল যন্ত্রাংশ উৎপাদনের ওপর বিদ্যমান সুবিধাগুলো ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে।
বৈশ্বিক প্রযুক্তির সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশকে উচ্চমূল্যের বাজারে পরিণত করার লক্ষ্যে সেমিকন্ডাক্টর নকশা, পরীক্ষা ও প্যাকেজিংয়ের জন্য নতুন সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করতে পারে সরকার।
প্রতিটি মোবাইল সিম সংযোগের ওপর থাকা ৩০০ টাকার কর পুরোপুরি বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, এটা করা হলে বছরে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার রাজস্ব কমবে। তবে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি ও মোবাইলের ব্যবহার বাড়ার মাধ্যমে এই ক্ষতি পুষিয়ে যাবে বলে তারা আশা করছেন।
সংসার খরচ ও চিকিৎসায় স্বস্তি
বাজেটের তাৎক্ষণিক প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের পকেটে গিয়ে পড়ে।
চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ভোজ্যতেল, মাছসহ ডজনখানেক নিত্যপণ্যের উৎসে কর সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা হতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এটি সরকারের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ হতে চলেছে।
চিকিৎসা খাতেও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রয়েছে। আমদানি করা হার্টের রিংয়ের (স্টেন্ট) ওপর থেকে ভ্যাট ও আগাম কর তুলে নেওয়ায় প্রতিটি রিংয়ের দাম সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে।
ডায়ালাইসিস ফিল্টারের শুল্ক প্রত্যাহারের ফলে কিডনি ডায়ালাইসিসের খরচ সেশনপ্রতি ৮০০ টাকা কমতে পারে। আর চোখের অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের দাম কমতে পারে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।
উৎপাদন খরচ কমানো ও স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ওষুধশিল্পে আরও কিছু শুল্ক কমানোর সুবিধা দেওয়া হতে পারে।
ক্ষুদ্র আমানতকারীদের কিছুটা স্বস্তি দিতে ব্যাংক হিসাবের স্থিতির ওপর আবগারি শুল্ক অব্যাহতির সীমা তিন লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে চার লাখ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা
দেশীয় শিল্পের সঙ্গে পাল্লা দেয়, এমন আমদানি পণ্যে উচ্চ শুল্ক ও অন্যান্য পদক্ষেপের মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পকে আরও সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা থাকতে পারে নতুন বাজেটে।
এর মধ্যে একটি প্রধান প্রস্তাব হলো দেশীয় চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ উৎসাহিত করতে কাঁচা ও প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদাম আমদানিতে শুল্ক বর্তমানের যথাক্রমে ১ ও ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা।
এ ছাড়া সিরামিক টাইলস, স্যানিটারি সামগ্রী, বেসিন, সুতি ও রেয়ন কাপড়, পিভিসি কোটেড টেক্সটাইল পণ্য, পর্দার কাপড়, প্রসাধনসামগ্রী, ফোমজাতীয় পণ্য, মধু ও সুপারি আমদানিতে শুল্ক বাড়ানোর কথা রয়েছে।
তামাকপণ্য ব্যবহারকারীদের করের বোঝাও বাড়তে পারে। সিগারেট ও অন্যান্য তামাকজাত পণ্যের ওপর শুল্ক-কর বাড়ায় এর খুচরা দাম বাড়বে। তামাকের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব বাড়াতে আমদানি করা সিগারেট ও নিকোটিনযুক্ত পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক বসানো হতে পারে।
প্রচলিত তেলচালিত গাড়ি আমদানিকারকেরাও চাপে থাকবেন। বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি ও চার্জিং অবকাঠামোতে প্রণোদনা দেওয়া হলেও সাধারণ পেট্রল ও ডিজেলচালিত গাড়ি এ সুবিধা পাবে না। এটি মূলত দেশকে পরিবেশবান্ধব যাতায়াতব্যবস্থার দিকে যাওয়ার সংকেত।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, সরকারের রাজস্ব আদায়ে যখন বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তখন রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং আর্থিক বরাদ্দের প্রয়োজন এমন বেশ কয়েকটি অগ্রাধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, পরিচালন ব্যয়ের চাপ থাকায় সরকারের নমনীয় হওয়ার সুযোগ সীমিত। এর মধ্যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের তাগিদ সরকারের ইচ্ছামতো ব্যয় করার পথকে আরও সংকুচিত করে দিয়েছে।
তার মতে, এই বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং ভোক্তাদের কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার একটা চেষ্টা রয়েছে। তবে সরকারের রাজস্ব নীতির অন্তর্নিহিত টানাপোড়েনও সামনে আসছে।
তৌফিকুল ইসলাম খান আরও বলেন, বাজেটের আসল পরীক্ষা প্রস্তাবিত পদক্ষেপে নয়; বরং সরকারের কর প্রশাসনে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সরকারি ব্যয়ে দক্ষতা বাড়ানো এবং সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সংস্কারগুলো এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতার ওপরই এটি নির্ভর করবে।



