দিল্লির শিক্ষার্থী আন্দোলনে সংহতি যে বলিউড তারকাদের

স্টার অনলাইন ডেস্ক

দিল্লির যন্তর-মন্তরে হাজারো শিক্ষার্থীর কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে ‘শিক্ষায় দুর্নীতি চলবে না’। এই স্লোগানে ধীরে ধীরে যোগ হচ্ছে ভারতের চলচ্চিত্র, নাটক ও সংস্কৃতি অঙ্গনের পরিচিত মুখগুলোর কণ্ঠও।

কেউ ভিডিওবার্তায়, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, কেউ প্রকাশ্য বিবৃতিতে, কেউ আবার স্বয়ং মাঠে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে গণতন্ত্র, সংবিধান, শিক্ষার অধিকার ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের প্রসঙ্গ।

ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) নামে তরুণদের নেতৃত্বাধীন এই আন্দোলনের সূচনা হয় নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদ থেকে। তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং পরীক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার।

তারকাদের দৃষ্টিতে এ আন্দোলন এখন দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জবাবদিহিতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবির প্রতীক। আর সেই কারণেই বলিউড থেকে টলিউড—বিভিন্ন অঙ্গনের এই তারকারা নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করছেন।

আমি শিক্ষার্থীদের স্যালুট জানাই: অঞ্জন দত্ত

কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে নয়, বরং একজন নাগরিক হিসেবে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত নির্মাতা, অভিনেতা ও সংগীতশিল্পী অঞ্জন দত্ত। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার ভিডিওবার্তায় তিনি বলেন, ‘দিল্লিতে যা হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরা যে দাবিতে আন্দোলন করছে, আমি মনে করি তা সম্পূর্ণ ন্যায্য। আমি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলাম না। ছাত্রজীবন থেকেই দলীয় রাজনীতি থেকে দূরে থেকেছি। কিন্তু যখন দেখি লাখো শিক্ষার্থী শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক, সাংবিধানিক ও অহিংস উপায়ে ন্যায়বিচারের দাবি তুলছে, তখন তাদের স্যালুট না জানিয়ে পারি না।’

‘ওরা আমাকে ভারতীয় হিসেবে গর্ব অনুভব করার সুযোগ দিয়েছে,’ যোগ করেন অঞ্জন।

 

প্রশ্ন তোলার অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না: নাসিরুদ্দিন শাহ

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে গত বুধবার ইনস্টাগ্রামে একটি ভিডিওবার্তা দেন ভারতের প্রবীণ অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের বলপ্রয়োগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘যখন তরুণরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন তাদের কথা শোনা উচিত, দমন নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা দেশের শত্রু নয়। তারা ভবিষ্যতের নাগরিক। তাদের সঙ্গে সংলাপ হওয়া উচিত।’

তরুণদের কণ্ঠ রুদ্ধ করা বিপজ্জনক: শাবানা আজমি

২০ জুলাই সিজেপির ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচিতে উপস্থিত হয়ে আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানান প্রবীণ অভিনেত্রী ও সমাজকর্মী শাবানা আজমি।

 

তিনি বলেন, ‘যুবসমাজ যখন কোনো বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাদের কথা শোনা। তাদের কণ্ঠস্বরকে দমন করার চেষ্টা নয়, বরং কেন তারা ক্ষুব্ধ, সেটি বোঝার চেষ্টা করা উচিত।’

ওইদিন তারকাদের মধ্যে আরও উপস্থিত হন প্রকাশ রাজ, কুনাল কামরা ও স্বরা ভাস্কর।

আমি তাদের হাত ধরে থাকব: প্রকাশ রাজ

আন্দোলনের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের পক্ষে সক্রিয় প্রকাশ রাজ। গত ২১ জুলাই এক্সে তিনি লেখেন, ‘আমার দেশের তরুণরা তাদের ভবিষ্যতের জন্য লড়ছে। আবারও স্বাধীনতা সংগ্রামের মতো একটি আন্দোলনের আবহ তৈরি হচ্ছে। আমি এই জাগরণকে শক্তি জোগাতে থাকব। আমি তাদের হাত ধরে থাকব, তাদের শক্তি হয়ে পাশে দাঁড়াব তাদের ভবিষ্যতের জন্য।’

 

শিক্ষার্থীদের প্রতি দ্রুত মনোযোগ দিন: পীযূষ মিশ্র

অভিনেতা, গীতিকার ও নাট্যব্যক্তিত্ব পীযূষ মিশ্রও শিক্ষার্থীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে গতকাল ইনস্টাগ্রামে লেখেন, ‘শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করছে, তারা দেশের ভবিষ্যত। তাদের প্রশ্নকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। দ্রুত তাদের প্রতি মনোযোগ দেন।’

এ আন্দোলন রাজনৈতিকভাবে হাইজ্যাক হওয়া উচিত না: সালমান খান

বলিউড তারকা সালমান খানও শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানান। গতকাল ইনস্টাগ্রাম পোস্টে শিক্ষার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘শিক্ষাই ভবিষ্যতের ট্রেন্ড হওয়া উচিত। এই প্রজন্ম ভারতের জন্য গর্ব বয়ে আনবে।’

 

আজ তিনি আরেকটি পোস্টে বলেন, ‘শিক্ষার্থীরাই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার—শিক্ষার ক্ষেত্রেও, নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও। তাই তাদের কিংবা তাদের অভিভাবকদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে ইতোমধ্যে টুইট করেছেন এবং আমি নিশ্চিত, প্রশ্নফাঁসের জন্য দায়ী প্রত্যেকের বিরুদ্ধে তিনি কঠোর ব্যবস্থা নেবেন। তাই শিক্ষার্থীদের প্রতি আমার অনুরোধ, দয়া করে আপনারা নিজেদের বাড়িতে, আপনাদের বাবা-মায়ের কাছে ফিরে যান।’

ইনস্টাগ্রামে অভিনেত্রী আলিয়া ভাট লেখেন, ‘এই আন্দোলন প্রশ্ন জাগিয়েছে, আমরা কি আসলেই তাদের কথা শুনছি, যারা ভবিষ্যতে ভারতের দায়িত্ব নেবে।’

বলিউডের পাওয়ার কাপলখ্যাত রিতেশ দেশমুখ ও জেনেলিয়া দেশমুখ গত ২০ জুলাই এক্সে লেখেন, ‘তরুণরাই আমাদের গণতন্ত্রের হৃৎস্পন্দন এবং আমাদের জাতির ভবিষ্যতের প্রকৃত নির্মাতা। আসুন, আমরা তাদের কথা শুনি, তাদের পাশে দাঁড়াই এবং তাদের ক্ষমতায়িত করি। আমাদের তরুণদের শক্তি, সাহস ও স্বপ্নই গড়ে তুলবে সেই ভারত, যা আমরা নির্মাণ করতে চাই।’

 

এ তালিকায় আরও আছেন, অতুল কুলকার্নি, সোনু সুদ, দিলজিত দোসাঞ্জ, জিনাত আমান, অভয় দেওল, রত্না পাঠক শাহ, ওম বৈদ্য, সোনাক্ষী সিনহা, হুমা কুরেশি, নন্দিতা দাস, ভূমি পেডনেকর, রিচা চাড্ডা, সোনি রাজদান, অনুরাগ কাশ্যপ, রাজকুমার রাও, ইমরান খান, আর মাধবন, দুলকার সালমান, প্রীতি জিনতা, অনুপম খের, অরিজিৎ সিং-সহ আরও অনেকে।

ভারতে ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি অঙ্গনের অনেকেই রাজনৈতিক ইস্যুতে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনীহা দেখিয়েছেন। সেই প্রেক্ষাপটে একের পর এক পরিচিত শিল্পীর মুখ খোলা আন্দোলনটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

দিল্লির রাজপথে আন্দোলন কত দিন চলবে, সরকারের অবস্থান কী হবে—এর উত্তর সময়ের হাতে থাকলেও তারকাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে দেয়, এটি আর কেবল শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমিত নেই।