দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসকে ছাড়িয়ে গেছে কয়লা

আসিফুর রহমান
আসিফুর রহমান

দেশে গ্যাসের উৎপাদন ক্রমাগত কমছে, অন্যদিকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) আমদানিও স্থবির হয়ে আছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশে প্রথমবারের মতো গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকে ছাড়িয়ে গেছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ।

ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হতো প্রাকৃতিক গ্যাস। কিন্তু দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন কমে যাওয়া, এলএনজি আমদানিতে সীমাবদ্ধতা এবং আমদানি করা কয়লার ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি এখন বদলে গেছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় পিক আওয়ারের পর কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ এসেছে। বিকেল ৩টার দিকে কয়লা থেকে ৫ হাজার ১৮৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, যেখানে ওই একই সময়ে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদিত হয় ৪ হাজার ৯১৫ মেগাওয়াট।

ওই সময়ে দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ১৩ হাজার ১০৯ মেগাওয়াট। তবে বৃষ্টির কারণে চাহিদা কমে যাওয়ায় সন্ধ্যার দিকে উৎপাদন কমে আসে।

বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৪৯৪ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ১২ হাজার ১৯৪ মেগাওয়াট (৪৩%) গ্যাসভিত্তিক এবং ৭ হাজার ৬২৯ মেগাওয়াট (২৭%) কয়লাভিত্তিক। তবে পর্যাপ্ত জ্বালানির অভাবে অনেক কেন্দ্রই পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না।

পিডিবির গ্রীষ্মকালীন পরিকল্পনা অনুযায়ী, পিক আওয়ারে গ্যাস থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ১৩০ মেগাওয়াট এবং কয়লা থেকে ৫ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

বর্তমানে রক্ষণাবেক্ষণ ও কয়লাসংকটে থাকা তিনটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র আগামী মে মাসের শুরুর দিকে পুরোদমে উৎপাদনে ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার এই আধিপত্য আরও পাকাপোক্ত হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সম্মানসূচক অধ্যাপক বদরূল ইমাম বলেন, বছরের পর বছর ধরে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও উৎপাদনে মনোযোগ না দেওয়ার কারণেই আজ আমদানি করা এলএনজি এবং কয়লার ওপর নির্ভরতা এতটা বেড়েছে।

তিনি বলেন, ঐতিহাসিকভাবে আমরা নিজেদের গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল ছিলাম, যা দিয়ে কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতো। কিন্তু বিনিয়োগ ও নীতিগত মনোযোগের অভাবে আমরা আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছি। এলএনজি অনেক ব্যয়বহুল, অন্যদিকে কয়লা তুলনামূলক সস্তা হলেও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।

তিনি আরও বলেন, দেশে এখনো হাইড্রোকার্বন অনুসন্ধানের বড় সম্ভাবনা রয়েছে, তবে এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সিদ্ধান্ত, বিনিয়োগ এবং কারিগরি প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

সাশ্রয়ী জ্বালানির খোঁজে

পিডিবির তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা (ইউনিট) বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ছিল গ্যাসে ৭ টাকা ৯ পয়সা, কয়লায় ১৩ টাকা ২০ পয়সা এবং তরল জ্বালানিতে (লিকুইড ফুয়েল) ২৭ টাকা ৩৯ পয়সা।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাসের এই উৎপাদন খরচ মূলত দেশীয় গ্যাসের দামের ভিত্তিতে হিসাব করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে চাহিদার একটি বড় অংশ এলএনজি দিয়ে মেটানো হচ্ছে। তাই এলএনজি আমদানির প্রকৃত খরচ ধরলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ পিডিবির দেখানো হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হবে।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গতকাল তারা মোট ২ হাজার ৬১৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করেছে। এর মধ্যে ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট ছিল আমদানি করা এলএনজি। বিদ্যুৎ খাত পেয়েছে ৯৪২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।

ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) উপাচার্য অধ্যাপক ম তামিম বলেন, স্বল্প মেয়াদে বাংলাদেশের জন্য কয়লা থেকে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন একটি কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা। এর প্রধান কারণ হলো খরচ। এলএনজি ও তরল জ্বালানির তুলনায় কয়লা এখনো অনেক সস্তা।

তিনি বলেন, কয়লাকে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর জ্বালানি বলা হলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা বিকল্প কোনো বড় উৎস তৈরি না হওয়া পর্যন্ত গ্রিডে বেসলোড (সার্বক্ষণিক নিরবচ্ছিন্ন) বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য কয়লাই আমাদের প্রধান ভরসা।

বর্তমানে দেশের বেসলোড বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পায়রা, রামপাল, এসএস পাওয়ারের মতো বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ভারতের আদানি গ্রুপের সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

দেশের বিদ্যুৎ খাতে যখন কয়লার ব্যবহার বাড়ছে, তখন এশিয়া বাদে বিশ্বের অন্যান্য দেশ কয়লার পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে।

লন্ডনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘এমবার’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৩৪ শতাংশই এসেছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে, যা আধুনিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কয়লাকে ছাড়িয়ে গেছে।