লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় নিহত বেড়ে ২৫৪

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লেবাননে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এই হামলায় নিহত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫৪ জনে।

লেবাননের সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, গতকাল বুধবারের এই হামলায় অন্তত ২৫৪ জন নিহত এবং এক হাজার ১৬৫ জন আহত হয়েছেন। আল জাজিরার খবরে এমনটি বলা হয়েছে।

দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী রাকান নাসেরুদ্দিন বলেছেন, ইসরায়েল ‘শতাধিক বিমান হামলা’ চালানোর ফলে লেবানন এখন ‘বিপজ্জনক পরিস্থিতির’ মুখোমুখি হয়েছে।

আল জাজিরাকে নাসেরুদ্দিন বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্স এখনো হতাহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে লেবাননের স্বাস্থ্য খাতে জরুরি সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, গত ২ মার্চ দেশটিতে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকে লেবাননে এটিই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় সমন্বিত হামলা। বৈরুত, বেকা উপত্যকা ও দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকা লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ দাবি করেছেন, মূলত হিজবুল্লাহর বিভিন্ন অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।

এক ভিডিও বিবৃতিতে কাৎজ বলেন, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী লেবাননজুড়ে হিজবুল্লাহর কমান্ড সেন্টারগুলোতে অবস্থানরত শত শত যোদ্ধার ওপর আকস্মিক হামলা চালিয়েছে। ২০২৪ সালে পেজার বোমা হামলার মাধ্যমে পরিচালিত ‘অপারেশন বিপার্সে’র পর এটিই হিজবুল্লাহর ওপর চালানো সবচেয়ে বড় আঘাত।

ইসরায়েলি বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেসব অবকাঠামোতে হামলা চালানো হয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগই সাধারণ জনবসতির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ছিল। তবে তাদের দাবি, সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষতি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

হামলার পর বৈরুত এবং এর আশপাশের শহরতলি এলাকার আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়তে দেখা যায় এবং আতঙ্কিত মানুষজন ঘরবাড়ি ছেড়ে প্রাণভয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন।

লেবানিজ রেড ক্রস জানিয়েছে, তাদের ১০০টি অ্যাম্বুলেন্স এই হামলার পর উদ্ধারকাজে নিয়োজিত রয়েছে এবং তাদের কর্মীরা আহতদের দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছেন।

বৈরুত থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি ম্যালকম ওয়েব বলেন, আমরা একের পর এক বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম।

তিনি আরও বলেন, এমন অনেক এলাকায় হামলা চালানো হয়েছে যেখানে কেউ হামলার আশঙ্কা করেনি। এর ফলে রাস্তায় চরম আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। শিশুরা কাঁদছিল, মানুষ চিৎকার করছিল—অসংখ্য আহত মানুষ হাসপাতালের দিকে ছুটছিল। অনেকে যানজটের মধ্যে নিজেদের গাড়ি ফেলে রেখেই পালিয়ে যান।

হিজবুল্লাহ এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলি, রাজধানী এলাকা, সিডন, দক্ষিণ লেবানন এবং বেকা উপত্যকার ‘বেসামরিক এলাকা’ লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে।

লেবাননের পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরি এই হামলাকে ‘পুরোদস্তুর যুদ্ধাপরাধ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

লেবাননে নিযুক্ত জাতিসংঘের বিশেষ সমন্বয়কারী জিনাইন হেনিস-প্লাশার্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লেখেন, ইসরায়েলি এই হামলা ‘চলতে পারে না।’

পাঁচ সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় লেবাননে এই বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। যদিও মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান জানিয়েছিল যে, লেবাননও এই যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতাভুক্ত ছিল।

তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেন যে, এই যুদ্ধবিরতি লেবাননের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তিনি হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে আক্রমণ অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেন।

লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম বলেন, ইসরায়েল ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় হামলা চালিয়েছে এবং ‘নিরপরাধ বেসামরিক মানুষকে’ হত্যা করেছে।

সালাম আরও বলেন, ইসরায়েল ‘যুদ্ধ বন্ধের সমস্ত আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কাই করছে না, যা তারা কখনোই মানেনি।’

এদিকে হিজবুল্লাহর সংসদ সদস্য ইব্রাহিম আল মুসাউয়ি সতর্ক করে বলেছেন, ইসরায়েল যদি ‘যুদ্ধবিরতি মেনে না চলে’, তবে ইরান ও তার মিত্ররা এর কড়া জবাব দেবে।

গত ২ মার্চ থেকে লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় এক হাজার ৫৩০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১০০ জনের বেশি নারী এবং ১৩০ শিশু। এ ছাড়া ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ১২ লাখেরও বেশি মানুষ।