যুক্তরাষ্ট্রে ২ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে হত্যার টাইমলাইন

স্টার অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রক্ত শীতল করা এক সময়রেখা তুলে ধরেছেন তদন্তকারীরা।

এ ঘটনায় সন্দেহভাজন ব্যক্তি একাধিক অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছেন।

সিএনএনের এক প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, কীভাবে ভুক্তভোগীরা নিখোঁজ হন এবং পরে তাদের হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে—সে বিষয়ে বিস্তারিত সময়রেখা প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ।

২৭ বছর বয়সী দুই বাংলাদেশি জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টিকে প্রায় দুই সপ্তাহ আগে টাম্পায় সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল। প্রায় এক সপ্তাহ পর লিমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তদন্তকারীরা মনে করছেন, বৃষ্টিকেও হত্যা করা হয়েছে, যদিও তার মরদেহ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

লিমনের রুমমেট ২৬ বছর বয়সী হিশাম আবুগারবিয়েহর বিরুদ্ধে দুটি প্রথম-ডিগ্রি হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। মঙ্গলবার এক বিচারক তাকে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আটক রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।

গত সপ্তাহে দাখিল করা এক আবেদনে প্রসিকিউটররা শিক্ষার্থীদের নিখোঁজ হওয়ার আগে ও পরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। সেখানে সন্দেহভাজনের গতিবিধি, কেনাকাটা, অনলাইন সার্চ ও আচরণের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।

৭ ও ১১ এপ্রিল: অ্যামাজন থেকে কেনাকাটা

গ্রেপ্তারি পরোয়ানার হলফনামা অনুযায়ী, আবুগারবিয়েহ অ্যামাজন থেকে ডাক্ট টেপ, ময়লার ব্যাগ, লাইটার ফুয়েল এবং আগুন জ্বালানোর সরঞ্জাম কিনেছিলেন।

১৩ এপ্রিল: চ্যাটজিপিটির সঙ্গে কথোপকথন

প্রসিকিউটররা একটি চ্যাটজিপিটি কথোপকথনের উল্লেখ করেছেন, যেখানে আবুগারবিয়েহ নাকি প্রশ্ন করেছিলেন—‘একজন মানুষকে কালো ময়লার ব্যাগে ভরে ডাম্পস্টারে ফেলে দিলে কী হয়?’

চ্যাটবট উত্তর দেয়, বিষয়টি বিপজ্জনক শোনাচ্ছে।

এর জবাবে তিনি বলেন—‘তারা কীভাবে জানতে পারবে?’

১৬ এপ্রিল: শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শেষ যোগাযোগ

হিলসবরো কাউন্টি কোর্টে দাখিল করা আবেদনে বলা হয়, ওই দিন দিনের বেলায় বন্ধুদের সঙ্গে লিমন ও বৃষ্টির যোগাযোগ ছিল, তবে পরে আর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। তারা কয়েকবার ফোনে সংক্ষিপ্ত কথা বলেন।

দুপুরের দিকে বৃষ্টিকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হাঁটতে দেখা যায়। তবে সন্ধ্যায় এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে তার চশমা নেওয়ার কথা থাকলেও তিনি সেখানে যাননি এবং ফোন কলেরও জবাব দেননি।

অন্যদিকে লোকেশন ডেটা অনুযায়ী, লিমন বিকেল পর্যন্ত বাড়ি ও ক্যাম্পাস এলাকায় ছিলেন। পরে সন্ধ্যা ৭টা ৪৩ মিনিটের দিকে তিনি প্রায় ৩২ মাইল দূরের ক্লিয়ারওয়াটারের দিকে যান। প্রায় ১০ মিনিট পর একই এলাকায় আবুগারবিয়েহর সাদা রঙের হুন্দাই জেনেসিস জি৮০ গাড়ি দেখা যায়।

ফোন ও ট্রাফিক ডেটা বিশ্লেষণে দেখা যায়, সারারাত জুড়ে সন্দেহভাজন ও লিমনের ডিভাইসের অবস্থানের মধ্যে মিল রয়েছে।

রাত প্রায় সাড়ে ১০টার দিকে আবুগারবিয়েহর ফোন থেকে ডোরড্যাশের মাধ্যমে সিভিএস থেকে ময়লার ব্যাগ, লাইসোল ওয়াইপস, ফেব্রিজসহ বিভিন্ন সামগ্রী অর্ডার করা হয় এবং প্রায় ৩০ মিনিটের মধ্যে তা সরবরাহ করা হয়।

আরেক রুমমেট জানান, তিনি আবুগারবিয়েহকে একটি কার্ট ব্যবহার করে তার রুম থেকে কার্ডবোর্ডের বাক্স অ্যাপার্টমেন্টের কমপ্যাক্টর ডাম্পস্টারে নিয়ে যেতে দেখেছেন।

১৭ এপ্রিল: নিখোঁজের রিপোর্ট

হলফনামা অনুযায়ী, সন্দেহভাজনের ফোনে চ্যাটজিপিটিতে সার্চ করা হয়—‘হিলসবরো রিভার স্টেট পার্কে কি গাড়ি তল্লাশি করা হয়?’

কর্তৃপক্ষ জানায়, রাত ১টা থেকে ভোর ৪টা ৩০ মিনিটের মধ্যে তিনি টাম্পা বে অতিক্রমকারী ইন্টারস্টেট ২৭৫-এর অংশ হাওয়ার্ড ফ্র্যাংকল্যান্ড ব্রিজে দুইবার যান।

এদিকে লিমন ও বৃষ্টিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিখোঁজ ঘোষণা করা হয়। পরদিন পুলিশ বৃষ্টির কর্মস্থলে তল্লাশি চালিয়ে তার লাঞ্চবক্স, ম্যাকবুক ও আইপ্যাডসহ ব্যক্তিগত জিনিসপত্র উদ্ধার করে।

২২ এপ্রিল: সন্দেহভাজনের মায়ের সঙ্গে কথা

কর্তৃপক্ষ আবুগারবিয়েহর মায়ের সঙ্গে কথা বলে। তিনি জানান, সর্বশেষ ১৮ এপ্রিল তিনি ছেলেকে দেখেছেন। তার মতে, ছেলে রাগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যায় ভুগত এবং অতীতে পরিবারের সদস্যদের প্রতি সহিংস আচরণ করেছে।

আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালে হামলার অভিযোগে আবুগারবিয়েহকে দুইবার গ্রেপ্তার করা হলেও পরে অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়। এক ঘটনায় তার ভাইয়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত যোগাযোগ নিষিদ্ধ করার আদেশ দেন, তবে সেটির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন পরে নাকচ হয়।

২৩ এপ্রিল: তল্লাশি জোরদার

হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের দপ্তর মামলার অবস্থা ‘বিপন্ন’ হিসেবে উন্নীত করে।

একটি ডাম্পস্টারে তল্লাশি চালিয়ে রক্তমাখা কালো কুশন ফ্লোর ম্যাট, লিমনের মানিব্যাগ, বৃষ্টির ফোন কেস, লিমনের চশমা এবং রক্তমাখা পোশাক উদ্ধার করা হয়।

এসময় আবুগারবিয়েহ তার গাড়ি তল্লাশির অনুমতি দেন। প্রসিকিউটরদের মতে, গাড়িটি ‘সম্প্রতি পরিষ্কার করা হয়েছে’ বলে মনে হয়েছে। তিনি গাড়ির ডেটা দেখার অনুমতিও দেন, তবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

তদন্তকারীরা বলেন, আবুগারবিয়েহ ভুক্তভোগীদের শেষ কবে দেখেছেন সে বিষয়ে অসংগতিপূর্ণ বক্তব্য দেন। প্রথমে তিনি দাবি করেন, তারা কখনো তার গাড়িতে ওঠেননি এবং তিনি ক্লিয়ারওয়াটারে যাননি। পরে বলেন, মাছ ধরার জায়গা খুঁজতে সেখানে গিয়েছিলেন। এরপর আবার দাবি বদলে বলেন, তিনি লিমন ও তার বান্ধবীকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন।

জিজ্ঞাসাবাদের সময় পুলিশ তার বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙুলে ব্যান্ডেজ দেখতে পায়, যেটিকে তিনি পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে হয়েছে বলে জানান। এ ছাড়া, তার বাম বাহুতে নতুন কাটা দাগ এবং দুই পায়েও আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়।

প্রসিকিউটররা আরও জানান, ওই দিন তিনি চ্যাটজিপিটিতে সার্চ করেছিলেন—‘নিখোঁজ বিপন্ন প্রাপ্তবয়স্ক বলতে কী বোঝায়?’

২৪ এপ্রিল: লিমনের মরদেহ উদ্ধার, গ্রেপ্তার

হাওয়ার্ড ফ্র্যাংকল্যান্ড ব্রিজের কাছে সন্দেহভাজনের ফোনের লোকেশন ডেটার সঙ্গে মিলে এমন একটি স্থান থেকে একটি কালো ময়লার ব্যাগ উদ্ধার করা হয়।

প্রসিকিউটরদের মতে, ব্যাগটি আবুগারবিয়েহর বিছানার নিচে পাওয়া ব্যাগগুলোর মতোই ছিল। এর ভেতরে মানবদেহের অংশ পাওয়া যায়, যা পরে লিমনের বলে শনাক্ত করা হয়।

ময়নাতদন্তে লিমনের মৃত্যু হত্যাকাণ্ড হিসেবে নিশ্চিত করা হয়। চিকিৎসা পরীক্ষকের প্রতিবেদনে বলা হয়, তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে একাধিকবার আঘাত করা হয়েছে, যার মধ্যে পিঠের নিচে একটি গভীর ছুরিকাঘাত ছিল, যা লিভার পর্যন্ত পৌঁছায়।

ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর ফ্লোরিডার লুটজ এলাকায় পারিবারিক সহিংসতার একটি ঘটনায় পুলিশ গেলে সেখান থেকে আবুগারবিয়েহকে গ্রেপ্তার করা হয়।

২৫ এপ্রিল: আদালতে হাজিরা ও অভিযোগ

প্রসিকিউটররা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রি-ট্রায়াল আবেদন দাখিল করেন, যেখানে সন্দেহভাজনের কেনাকাটা ও চ্যাটজিপিটি ব্যবহারসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়।

আবুগারবিয়েহ আদালতে হাজির হন এবং তার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত অভিযোগ আনা হয়—মরদেহ অবৈধভাবে সরানো, মৃত্যু গোপন রাখা, প্রমাণ নষ্ট করা, অবৈধভাবে আটকে রাখা এবং হামলা।

তার পক্ষে নিয়োজিত হিলসবরো কাউন্টি পাবলিক ডিফেন্ডারের দপ্তর বিস্তারিত মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলে, ‘আমরা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমাদের মক্কেলকে প্রতিনিধিত্ব করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছি।’

২৬ এপ্রিল: নতুন দেহাবশেষ উদ্ধার

হাওয়ার্ড ফ্র্যাংকল্যান্ড ব্রিজের আশপাশের জলপথ থেকে আরও মানবদেহের অংশ উদ্ধার করা হয়। সেগুলো শনাক্ত করার কাজ চলছে।

২৭ এপ্রিল: ওপেনএআইকে ঘিরে তদন্ত

ফ্লোরিডা কর্তৃপক্ষ চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআইকে ঘিরে একটি ফৌজদারি তদন্তের পরিধি বাড়িয়েছে, যাতে এই হত্যাকাণ্ডও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ওপেনএআইয়ের মুখপাত্র ড্রু পুসাতেরি বলেন, ‘এটি একটি ভয়াবহ অপরাধ এবং এতে ক্ষতিগ্রস্ত সবার প্রতি আমাদের সমবেদনা। আমরা এসব প্রতিবেদন খতিয়ে দেখছি এবং তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করতে যা সম্ভব করব।’

অ্যাটর্নি জেনারেল জেমস উথমেয়ার বলেন, চ্যাটজিপিটি অপরাধে কোনোভাবে সহায়তা করেছে কি না এবং ওপেনএআইয়ের কোনো দায় আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

২৮ এপ্রিল: জামিন ছাড়াই আটক

একটি শুনানিতে মামলার পরবর্তী ধাপ নির্ধারণ করা হয়। হিলসবরো কাউন্টির বিচারক জে লগান মারফি হত্যার অভিযোগে আবুগারবিয়েহকে জামিন ছাড়া আটক রাখার জন্য প্রসিকিউটরদের আবেদন মঞ্জুর করেন।

সন্দেহভাজন ওই শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন না। এখনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি।