মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে এআই দৌড়ে এগিয়ে যেসব চীনা কোম্পানি
বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নির্ধারণের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞাকে পাত্তা না দিয়ে চীন এখন নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি চিপ এবং ওপেন-সোর্স কৌশলের ওপর ভর করে এআই খাতে ঘটাচ্ছে এক অভাবনীয় রূপান্তর।
মেইতুয়ানের সম্পূর্ণ দেশীয় চিপে তৈরি মডেল থেকে শুরু করে ডিপসিকের বিশ্ব কাঁপানো ‘স্পুটনিক মুহূর্ত’—সব মিলিয়ে বেইজিংয়ের এআই ইকোসিস্টেম এখন ওয়াশিংটনের সমকক্ষ হওয়ার পথে।
যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত কম্পিউটার চিপ রপ্তানিতে কড়াকড়ির মধ্যেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে চীন। ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের মতো মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে দেশটির প্রযুক্তি জায়ান্ট থেকে শুরু করে নতুন স্টার্টআপগুলো।
চীনের এআই দৌড়ে এগিয়ে থাকা উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরেছে বার্তাসংস্থা এএফপি।
প্রযুক্তি জায়ান্টদের দাপট
বাইদু
‘চীনের গুগল’ নামে পরিচিত বাইদু এআই খাতে সবচেয়ে আগে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। শীর্ষ এআই গবেষকদের নিয়োগ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করে ‘এরনি’ নামের চ্যাটবট, যা চীনের প্রথম দিকের চ্যাটবটগুলোর একটি। তবে তাদের আয়ের বড় অংশ এখনো আসে অনলাইন সার্চ ও বিজ্ঞাপন ব্যবসা থেকে।
আলিবাবা
ই-কমার্স জায়ান্ট আলিবাবা পরিচিত তাদের ওপেন-সোর্স ‘কুয়েন’ এআই মডেলের জন্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রোগ্রামারদের কাছে এটি জনপ্রিয়। কারণ প্রয়োজন অনুযায়ী সহজেই মডেলটি পরিবর্তন ও ব্যবহার করা যায়।
টেনসেন্ট
শেনঝেনভিত্তিক টেনসেন্টকে একসময় এআই প্রতিযোগিতায় কিছুটা সতর্ক খেলোয়াড় হিসেবে দেখা হতো। তবে সম্প্রতি তারা বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা পনি মা সম্প্রতি স্বীকার করেন, অতীতে টেনসেন্টের এআই উদ্যোগ ছিল ‘ফুটো জাহাজের’ মতো। এখন প্রতিষ্ঠানটি এক বিলিয়নের বেশি ব্যবহারকারীর উইচ্যাটে এআই এজেন্ট পরীক্ষামূলকভাবে যুক্ত করছে।
টিকটকের এআই
টিকটকের মালিক বাইটড্যান্স ভূরাজনৈতিক চাপের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি এখন এআইয়েও জোর দিচ্ছেন।
প্রতিষ্ঠানটির চ্যাটবট ‘দৌবাও’ বর্তমানে চীনের সবচেয়ে জনপ্রিয় এআই চ্যাটবট। এর মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারী ৩০ কোটির বেশি। সম্প্রতি এটি অর্থের বিনিময়ে সাবস্ক্রিপশন সুবিধাও চালু করেছে।
জুনে প্রতিষ্ঠানটি উন্মুক্ত করে ‘সিড্যান্স ২.৫’ নামের ভিডিও তৈরির নতুন এআই মডেল। সিনেমার মতো মানসম্মত ভিডিও তৈরির সক্ষমতার কারণে এটি কপিরাইট ও সৃজনশীল পেশায় এআইয়ের প্রভাব নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
চীনের এআই নায়ক: ডিপসিক
২০২৩ সালে একটি হেজ ফান্ডের পার্শ্বপ্রকল্প হিসেবে যাত্রা শুরু করে ডিপসিক।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে কম খরচে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চ্যাটবট উন্মুক্ত করে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে। অনেকেই এই ঘটনাকে এআই খাতে ‘স্পুটনিক মুহূর্ত’ হিসেবে আখ্যা দেন, কারণ এটি যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া আধিপত্য নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে।
ওপেন-সোর্স কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে ডিপসিক চীনের এআই শিল্পে নতুন গতি এনে দেয়। এপ্রিল মাসে প্রতিষ্ঠানটি উন্মুক্ত করে ‘ভি৪’ মডেল। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বশেষ অর্থায়ন পর্ব শেষে কোম্পানিটির মূল্যায়ন দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি।
‘এআই টাইগার’ স্টার্টআপগুলো
ঝিপু এআই, মিনিম্যাক্স এবং মুনশট এআইকে একসঙ্গে বলা হয় চীনের ‘এআই টাইগার’। মূল এআই মডেল তৈরির ক্ষেত্রে তারা পুরোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে।
ঝিপু এআইয়ের ‘জিএলএম-৫.২’ মডেল ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের বিকল্প হিসেবে বিদেশি প্রোগ্রামারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টা ও বিনিয়োগকারী মার্ক অ্যান্ড্রিসেনের মতে, অনেক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এটিকে প্রথম চীনা মডেল হিসেবে দেখছেন, যা অনেক ক্ষেত্রে মার্কিন শীর্ষ এআই মডেলের সমকক্ষ, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে এগিয়েও।
সাংহাইভিত্তিক মিনিম্যাক্স এআই সঙ্গী থেকে শুরু করে ভিডিও তৈরির নানা পণ্য বানাচ্ছে।
অন্যদিকে মুনশট এআই পরিচিত তাদের জনপ্রিয় ‘কিমি’ মডেলের জন্য। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি পেয়েছে ২০০ কোটি ডলারের নতুন অর্থায়ন। এতে কোম্পানিটির মূল্যায়ন দাঁড়িয়েছে প্রায় তিন হাজার ১৫০ কোটি ডলার।
নতুন প্রতিযোগীরা
খাদ্য সরবরাহ প্ল্যাটফর্ম মেইতুয়ান জুনে জানায়, তাদের ‘লংক্যাট-২.০’ মডেলই প্রথম বড় আকারের এআই মডেল, যা পুরোপুরি চীনে তৈরি কম্পিউটার চিপ দিয়ে প্রশিক্ষিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের চিপ রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার মধ্যে এটিকে দেখা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে।
এদিকে স্মার্টফোন নির্মাতা শাওমি তুলনামূলক দেরিতে এআই প্রতিযোগিতায় নামলেও বড় বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। মার্চে প্রতিষ্ঠাতা লেই জুন জানান, আগামী তিন বছরে এআই খাতে অন্তত ৮৭০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে শাওমি।
প্রতিষ্ঠানটির সর্বশেষ ‘মিমো-ভি২.৫’ মডেল বর্তমানে বিভিন্ন এআই মডেল ব্যবহারের প্ল্যাটফর্ম ওপেনরাউটারে মাসিক ব্যবহারের হিসেবে রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে।