ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে তুলে নেওয়া বৈধ নাকি অবৈধ
যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান চালিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করেছে। গতকাল শনিবার স্থানীয় সময় ভোরে মাদুরোকে আটকের পর যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, ভেনেজুয়েলার অপহৃত প্রেসিডেন্টকে নিউইয়র্কের আদালতে ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি করানো হবে।
কী ঘটেছিল সেদিন?
দীর্ঘদিন ধরে নিকোলাস মাদুরোকে অবৈধভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা নেতা আখ্যা দিয়ে সমালোচনা করে আসছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই ধারাবাহিকতায় গতকাল শনিবার মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে মাদুরোকে আটক করে। ওই অভিযানে তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকেও আটক করা হয়।
এর আগে, মাদুরোকে ক্ষমতা ছাড়তে বলছিলেন ট্রাম্প। তার অভিযোগ, মাদুরো মাদক পাচারচক্রের সঙ্গে জড়িত। এই চক্রকে সন্ত্রাসী গ্রুপ হিসেবে ঘোষণা করেছে ওয়াশিংটন।
ট্রাম্পের ভাষ্য, হাজার হাজার মার্কিন নাগরিকের মৃত্যুর জন্য এই পাচারচক্র দায়ী। কারণ, তাদের মাধ্যমে মার্কিনিরা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদন অনুসারে, গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ভেনেজুয়েলার মাদক পাচারকারী জাহাজগুলোয় হামলা চালানো শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। এ পর্যন্ত কমপক্ষে ৩০টি হামলায় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সেসব হামলা যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসন যেভাবে এই অভিযানকে বৈধতা দিচ্ছে
মার্কিন কর্তৃপক্ষ বলছে, দেশটির বিচার বিভাগ ভেনেজুয়েলার মাদুরোকে আটক করতে সামরিক সাহায্য চেয়েছিল। এ ছাড়াও, নিউইয়র্কের গ্র্যান্ড জুরি মাদুরোর সঙ্গে তার স্ত্রী, ছেলে, দুই রাজনৈতিক নেতা ও এক আন্তর্জাতিক গ্যাং লিডারকে অভিযুক্ত করেছে। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ, মাদক ও অস্ত্র সম্পর্কিত অপরাধের মামলা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল প্যাম বন্ডি সমাজমাধ্যমে বলেছেন, অভিযুক্তরা শিগগিরই আমেরিকার মাটিতে, আমেরিকার আদালতে ও আমেরিকার আইনের মুখোমুখি হবেন।
তবে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প দাবি করেন, ভেনেজুয়েলা সরকার যুক্তরাষ্ট্রের তেলের ব্যবসা ও সম্পদ নিজেরাই ব্যবহার করছে বা চুরি করছে। ওয়াশিংটন এগুলো ফেরত নেবে। যুক্তরাষ্ট্র কিছু সময়ের জন্য ভেনেজুয়েলা পরিচালনার পরিকল্পনা করছে। অর্থাৎ, দেশটির সরকারের কাজ দেখভাল করবে। তবে ট্রাম্প স্পষ্ট করে কিছু জানাননি।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন আইনগত বিষয়গুলো জটিল করে ফেলেছে। কারণ, তারা এই অভিযানকে একই সঙ্গে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে আইন প্রয়োগের অভিযান ও ভেনেজুয়েলাকে দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য শুরু হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
'লক্ষ্যভিত্তিক আইন প্রয়োগে অভিযান' বলতে তারা মাদুরোকে ধরে আইনের আওতায় আনাকে বুঝিয়েছেন।
নর্থইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধানবিষয়ক আইন বিশেষজ্ঞ জেরেমি পল গণমাধ্যমকে বলেন, 'আপনি শুরুতে বলছেন, আইন প্রয়োগে এই অভিযান ছিল। তারপর আবার বলছেন, এখন আমরা দেশটি চালাব, এই যুক্তি একদম অর্থহীন।'
আইন কী বলে?
রয়টার্সের তথ্য বলছে—মার্কিন কংগ্রেসের হাতে যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা আছে। তবে প্রেসিডেন্টই সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক। যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক ও রিপাবলিকান পার্টি থেকে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টরা অতীতে বলেছিলেন, যদি অভিযান সীমিত হয় এবং দেশের স্বার্থে হয়, তাহলে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
গত বছরের শেষ দিকে প্রকাশিত ভ্যানিটি ফেয়ার ম্যাগাজিনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের চিফ অব স্টাফ স্যুজি ওয়াইলস বলেছিলেন, ট্রাম্প যদি ভেনেজুয়েলায় স্থলভাগে কোনো ধরনের অভিযান চালানোর অনুমোদন দিতেন, তাহলে কংগ্রেসের অনুমোদন লাগত।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, শনিবারের এই অভিযানের আগে কংগ্রেসকে কিছুই জানানো হয়নি।
আন্তর্জাতিক আইন বলছে—আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগ নিষিদ্ধ। তবে কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম আছে, তবে সেটাও সীমিত। যেমন, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন থাকলে বা আত্মরক্ষার প্রয়োজনে অভিযান চালানো যায়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক পাচার ও গ্যাং সহিংসতা অপরাধ। কিন্তু, এগুলো এমন কোনো সশস্ত্র যুদ্ধ নয়, যার অজুহাতে সামরিক হামলা চালানো যেতে পারে।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় নিরাপত্তা আইন বিশেষজ্ঞ ম্যাথিউ ওয়াক্সম্যান মনে করেন, শুধু ফৌজদারি মামলার অভিযোগ থাকলেই কোনো বিদেশি সরকারকে উৎখাত করতে সামরিক শক্তি ব্যবহার করা যায় না।
তার মতে, মার্কিন সরকার সম্ভবত এটিকে আত্মরক্ষার তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবে।
এর আগেও কি এমন ঘটনা ঘটেছে
যুক্তরাষ্ট্র অতীতে অন্যদেশ থেকে তাদের চোখে অপরাধী এমন অনেককে আটক করেছে। যেমন, লিবিয়া। কিন্তু, তখন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া হয়েছিল। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন বলে আসছিল মাদুরো 'বৈধ' নেতা নয়। তবে, ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলার অন্য কোনো নেতাকে বৈধতার স্বীকৃতিও দেয়নি, যিনি মাদুরোকে আটক করতে অনুমোদন দিতে পারতেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র মধ্য আমেরিকার দেশ পানামার নেতা জেনারেল ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে আটক করেছিল। তার বিরুদ্ধে মাদক-সম্পর্কিত অভিযোগ ছিল। ওয়াশিংটন জানিয়েছিল, তারা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ নিয়েছে। কারণ, পানামার সেনারা এক মার্কিন সেনাকে হত্যা করেছিল।
যুক্তরাষ্ট্র তখনও অভিযোগ করেছিল, নোরিয়েগা বৈধ নেতা নন।
এরপর ২০২২ সালে হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট জুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজ আটকের পর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে তিনি মাদকের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন। তাকে ৪৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে ট্রাম্প গত বছর ডিসেম্বরে হার্নান্দেজকে ক্ষমা করে দেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় যে হামলা করেছে তা অবৈধ হলেও তা হয়তো কোনো জবাবদিহিতার আওতায় আসবে না। কারণ, বর্তমানে আন্তর্জাতিক আইন কার্যকর করার ব্যবস্থা খুবই দুর্বল।
নর্থইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জেরেমি পল বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে শাস্তি দিতে পারে এমন আইনি সংস্থা নেই বললেই চলে। মানে, যুক্তরাষ্ট্রকে শাস্তি দেওয়া প্রায় অসম্ভব।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সাল থেকে নিকোলাস মাদুরোকে ভেনেজুয়েলার বৈধ নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের মতে ওই নির্বাচনটি ছিল কারচুপির।
