বন্যার আতঙ্কে চলনবিলে ধান কাটার তোড়জোড়

আহমেদ হুমায়ুন কবির তপু
আহমেদ হুমায়ুন কবির তপু

বর্ষার পানিতে পুরো বিল তলিয়ে যাওয়ার আগেই পাকা ধান ঘরে তুলতে দিনরাত এক করে কাজ করছেন নাটোরের সিংড়া উপজেলার চলনবিল অংশের কৃষকেরা। 

বন্যার পানি যাতে জমিতে ঢুকতে না পারে, সে জন্য বিলের বিভিন্ন খালে অস্থায়ী মাটির বাঁধ নির্মাণ করেছেন গ্রামবাসী।

চলনবিলে এবার ২০ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেছেন কৃষক সাইফুল ইসলাম। গত সপ্তাহে মাত্র পাঁচ-ছয় বিঘা জমির ধান কাটতে পেরেছিলেন তিনি। এর মধ্যেই ভারী বৃষ্টি শুরু হওয়ায় ধান কাটা বন্ধ রাখতে বাধ্য হন।

এদিকে টানা বৃষ্টিতে আত্রাই নদীর পানি বেড়ে দাহাপাড়া এলাকায় ঢুকতে শুরু করেছে। এতে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে গ্রামবাসীরা নিজেরা মিলে মাটির অস্থায়ী বাঁধ দিয়ে পানির তোড় আটকানোর চেষ্টা করছেন। কৃষক সাইফুল জানান, আগামী এক সপ্তাহ আবহাওয়া ভালো থাকলে বিলের সব ধান কেটে ঘরে তোলা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর ধান কাটার পর বর্ষার পানি আসে। কিন্তু এবার ধান কাটার শুরুতেই আত্রাই নদীর পানি বেড়ে গেছে। তাই এখন আমাদের দিন কাটছে চরম দুশ্চিন্তায়।’

গত রোববার সকালে আকাশ পরিষ্কার হওয়ায় সাইফুলসহ অন্য কৃষকেরা আবারও ধান কাটতে মাঠে নামেন। তার পুরো কাজ শেষ করতে অন্তত ১০ দিন আবহাওয়া শুকনো থাকা দরকার।

এই সংকট শুধু দাহাপাড়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। আত্রাই নদীর পানি খালের মাধ্যমে বিলে প্রবেশ করায় সিংড়ার চলনবিলের পুরো অংশই এখন বন্যার হুমকিতে রয়েছে।

সিংড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার ফরিদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘চলতি বছর উপজেলায় ৩৬ হাজার ৬১০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৭৮ হাজার টন। এটি দেশের অন্যতম বড় ধান উৎপাদনকারী উপজেলা। কিন্তু আগাম বৃষ্টিপাতের কারণে ধান কাটা ব্যাহত হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ পর্যন্ত ১৪ হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। গত তিন দিনের টানা বৃষ্টিতে কাজ অনেক পিছিয়ে গেছে। আত্রাই নদীর পানি বেড়ে খালে পানি ঢুকছে, যা যেকোনো সময় খেত ভাসিয়ে দিতে পারে বলে কৃষকেরা ভয় পাচ্ছেন।’

বন্যার পানি ঠেকাতে স্থানীয় কৃষি কার্যালয় ইতিমধ্যে জোরমল্লিকা, চৌগ্রাম ও শোলমারী এলাকায় তিনটি অস্থায়ী মাটির বাঁধ নির্মাণ করেছে।

জরুরি পরিস্থিতির মধ্যেও খরচ বাঁচাতে অনেক কৃষক কম্বাইন্ড হারভেস্টার ব্যবহার না করে সনাতন পদ্ধতিতেই ধান কাটছেন।

সাতপুকুরিয়া গ্রামের কৃষক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে প্রতি মণ ধান ১ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত বছরের চেয়ে কম। এখন যদি হারভেস্টার ব্যবহার করি, তাহলে খরচ অনেক বেড়ে যাবে। লাভের মুখ দেখতেই আমরা হাতে ধান কাটছি।’

বিলের প্রায় ৬০ শতাংশ ধান এখনো মাঠে রয়ে গেছে। তাই আগামী দুই সপ্তাহ কৃষকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষকেরা বলছেন, আবহাওয়া ভালো থাকলে এবং অস্থায়ী বাঁধগুলো টিকলে সব ফসল নিরাপদে ঘরে তোলা যাবে। ধান কাটার এই পুরো মৌসুমে স্থানীয় কৃষি কার্যালয় নিবিড়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

নাটোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এমদাদ হোসেন জানান, উজান থেকে নেমে আসা পানির কারণে গত কয়েক দিন ধরে আত্রাই নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। শুধু গত তিন দিনেই অন্তত ১০ ফুট পানি বেড়েছে।

গতকাল পর্যন্ত এই নদীর পানি বিপৎসীমার ২ দশমিক ৬৯ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

তিনি বলেন, ‘সিংড়ার পরিস্থিতি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি, কারণ এই এলাকাটি বন্যার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই আছে।’