ঋণের টাকায় কেনা স্বপ্নের করুণ সমাপ্তি
সচ্ছলতার আশায় ঋণের অনেক টাকা খরচ করে লেবাননে গিয়ে ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের আফসার আলীর ছেলে শফিকুল ইসলাম (৪৫)।
সোমবার দুপুর ১২টার দিকে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের নাবাতিয়েহ জেলার জেবদিন এলাকায় ড্রোন হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত হন। তাদেরই একজন শফিকুল।
নিহত আরেকজন হলেন একই জেলার আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের আব্দুল কাদেরের ছেলে নাহিদুল ইসলাম নাহিদ (৪০)। তারা একই এলাকায় বসবাস করতেন। তাদের মৃত্যুর খবরে সাতক্ষীরার দুটি গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
মঙ্গলবার সকালে শফিকুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উঠানে স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়। ঘরের এক কোণে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন তার স্ত্রী রুমা খাতুন। কখনো দুই সন্তানকে জড়িয়ে ধরে বিলাপ করছেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী সংসারের হাল ধরতে বিদেশে গিয়েছিল। এত টাকা ঋণ করে গেল, এখন এই ঋণ আমি কীভাবে শোধ করব? আমার দুই সন্তানকে নিয়ে কীভাবে বাঁচব?’
সরকারের কাছে তার একটাই আকুতি, যেন স্বামীর মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হয়।
শফিকুলের মা আজেয়া খাতুন ছেলের নাম ধরে বারবার ডাকছেন। কখনো বিলাপ করছেন, কখনো নির্বাক হয়ে বসে থাকছেন। বৃদ্ধ বাবা আফসার আলীও শোকে বাকরুদ্ধ।
ছেলের বিদেশযাত্রার স্মৃতি মনে করে তিনি বলেন, ‘ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে গরু বিক্রি করেছি। এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছি, আত্মীয়দের কাছ থেকেও ধার করেছি। ভেবেছিলাম, ছেলে উপার্জন করে সংসারের কষ্ট দূর করবে। এখন সে লাশ হয়ে ফিরবে।’
পরিবার জানায়, গত রমজানে শফিকুল ইসলাম লেবাননের উদ্দেশে বাড়ি ছাড়েন। নাহিদুল ইসলামের মাধ্যমে সেখানে যান তিনি। লেবাননে গিয়ে একটি ফলের বাগানের শ্রমিকের কাজ নেন। বিদেশে যাওয়ার জন্য প্রায় ১২ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল, যার বেশির ভাগই ঋণ।
স্থানীয়রা জানান, শফিকুল ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী ও শান্ত স্বভাবের মানুষ। সংসারের অভাব ঘোচাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে তার এমন মর্মান্তিক মৃত্যু পরিবারকে অসহায় করে দিয়েছে।
ধুলিহর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, ‘শফিকুলের পরিবার অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় আছে। আমরা তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি।’
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত বলেন, ‘নিহতের পরিবারের সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। মরদেহ দেশে আনার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’