‘ছেলের জন্য ন্যায়বিচার চাওয়ার আর সাহস-শক্তি কোনোটিই আমার নেই’

শরিফুল ইসলাম

শাহেদা বেগম এখন আর তার ছেলের মৃত্যুর বিচার চান না। আসলে বিচার চাওয়ার আর সাহস পান না তিনি।

চার সন্তানের মা সম্প্রতি আইনি মারপ্যাঁচে জড়িয়ে পড়েছেন। একের পর এক মামলায় জড়িয়ে তিনি এখন আর ছেলের মৃত্যুর বিচার চাইছেন না। পাঁচ বছর আগে পুলিশি হেফাজতে মারা যায় শাহেদার ছেলে সুজন। এর বিচার চেয়ে আদালতে লড়াই চালিয়ে তিনি আর ঝামেলা পোহাতে চান না।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা ৬২ বছর বয়সী শাহেদাকে একটি মাদক মামলায় আসামি করে। রাজধানীর মিরপুরে তার বাসায় ইয়াবা সিন্ডিকেটের চার সদস্যকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে।

তার পরিবারের সদস্য এবং ভাড়াটিয়ারা বলেন যে তারা কখনও ওই বাড়িতে তথাকথিত ইয়াবা সিন্ডিকেট সদস্যদের দেখেননি।

গত ২ ফেব্রুয়ারি সেই মামলায় গ্রেপ্তার হন শাহেদা। ছয়মাস কারাগারে থাকার পর জামিনে মুক্তি পেয়েছেন তিনি। কারাবন্দী থাকার সময় দুই বার স্ট্রোক হয় তার।

তার আরও দুই ছেলে মো. সবুজ (২৮) এবং মো. সুমন (৩৫) মামলার আসামি। শাহেদাকে গ্রেপ্তারের আগে পুলিশ তার বাড়ির বাইরে কোথাও থেকে সবুজকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে আসে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে।

গত মাসে শাহেদা বলেন, “আমাদের আসামি করা হয়েছে যাতে সুজনের মৃত্যুর ঘটনায় মূল অভিযুক্ত পুলিশের উপ-পরিদর্শক জাহিদুর রহমান এবং আরও তিন পুলিশ ও মিঠুন নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে না পারি।”

তিনি আরও বলেন, “আমার ছেলের জন্য ন্যায়বিচার চাওয়ার আর কোনো সাহস বা শক্তি আমার নেই।”

তার ছেলে মাহবুবুর রহমান সুজন গার্মেন্টসের ঝুট ব্যবসায়ী ছিলেন। ২০১৪ সালে ১৩ জুলাই মিরপুর থানায় পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন করে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয় পরিবারের পক্ষ থেকে।

সুজনের স্ত্রী মমতাজ সুলতানা লুসি ১০ জনকে আসামি করে ওই বছর ২০ জুলাই মহানগর দায়রা জজ আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন।

মামলাটি গ্রহণ করে আদালত বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তদন্তে এসআই জাহিদ, এএসআই রাজ কুমার, কনস্টেবল আসাদ, মিরপুর থানার রাশেদুল এবং মিথুন নির্যাতন ও হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে উঠে আসে।

মামলাটির বিচার কার্যক্রম এখন হাইকোর্টের আদেশে স্থগিত রয়েছে।

শাহেদার পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, যখন ঢাকার একটি আদালতে বিচার চলছিল তখন এসআই জাহিদের মা সুজনের স্ত্রী মমতাজকে বুঝিয়ে রাজি করান, জাহিদের ছোট ভাইকে বিয়ে করতে। মমতাজ তাকে বিয়ে করে সন্তানদের ফেলে প্রায় তিন বছর আগে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন।

সুজনের বড় ভাই মো. শামীম বলেন, “এরপর, তার (মমতাজের) অবস্থান নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। কয়েক মাস পর সে আদালতে বলে যে এসআই জাহিদ সুজনের হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। কিন্তু, অন্যান্য সাক্ষীর জবানবন্দীর কারণে আদালত তার বক্তব্য গ্রহণ করেনি।”

শাহেদার পরিবার ও আদালত সূত্রে যানা যায়, পরবর্তীতে এসআই জাহিদের পরিবার হাইকোর্টে এই বিচার কার্যক্রম স্থগিত চেয়ে একটি রিট আবেদন করে।

এই মামলায় আসামিদের মধ্যে কেবলমাত্র জাহিদকেই সাময়িক বরখাস্ত ও গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

এই সংবাদদাতা সুজনের সাবেক স্ত্রী মমতাজের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো নম্বর খুঁজে পাননি। তার বর্তমান ঠিকানাও জানা যায়নি।

একটি গোলমেলে মামলা

চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি পুলিশ মিরপুর-১ এর ই ব্লকে শাহেদার বাসভবনে অভিযান চালায়।

পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) এসআই হারুন উর রশিদের দায়ের করা মামলা অনুযায়ী, গোপন খবরের ভিত্তিতে ডিবির একটি দল জানতে পারে যে, টেকনাফ থেকে ইয়াবা পাচারকারী সিন্ডিকেটের কিছু সদস্য শাহেদার বাড়িতে লুকিয়ে ছিল।

মামলার বিবৃতিতে লেখা হয়, কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছলে সিন্ডিকেটের সাত থেকে আট সদস্য পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। পুলিশ শাহেদাসহ চারজন ইয়াবা ব্যবসায়ী- লোকমান হোসেন, মো. রঞ্জু এবং ১৩ ও ১৪ বছর বয়সী দুই কিশোরকে গ্রেপ্তার করে।

মামলার নথি অনুযায়ী লোকমান, রঞ্জু এবং কিশোরদের কাছ থেকে আট হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এই ইয়াবা জব্দ করার সময় সেখানে দুজন স্থানীয় সাক্ষী রফিকুল ইসলাম ও নাজু মিয়া এবং পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক জাহাঙ্গীর আলম উপস্থিত ছিলেন।

এসআই মো. ইসহাক আলী মামলাটি তদন্ত করে ২৮ এপ্রিল আদালতে দুটি পৃথক চার্জশিট জমা দিয়েছেন। যার মধ্যে একটি ছিল কিশোর অপরাধের জন্য।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনজন সাক্ষীর সামনে তিনি অভিযুক্তের দেহ তল্লাশি করে ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করেছেন এবং জব্দ দ্রব্যের তালিকা তৈরি করেছেন। এরপরে তিনি তালিকায় সাক্ষীদের স্বাক্ষর নেন।

তবে দুই সাক্ষী রফিকুল ও নাজু এই সংবাদদাতাকে জানিয়েছেন ভিন্ন গল্প। ১৮ সেপ্টেম্বর দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে তারা মামলা ও চার্জশিটে পুলিশ যা দাবি করেছে তার বিরোধিতা করেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ী রফিকুল বলেন, “আমি এর কিছুই দেখি নাই।”

তিনি জানান যে, তিনি পাশের একটি চায়ের দোকানে চা খাচ্ছিলেন। সেসময় তিনি শাহেদার বাড়ির কাছে অনেক মানুষের ভিড় দেখতে পান।

রফিকুল বলেন, “আমি সেখানে গেলে আমার পরিচিত সিরাজ দারোগা (শাহ আলী থানার এসআই সিরাজ) আমাকে একটি কাগজে স্বাক্ষর করতে বলেন। আমি তার অনুরোধ ফিরিয়ে দিতে পারি নাই। আসলে, আমি কিছুই দেখিনি।”

রফিকুল জানান, পুলিশ শাহেদার ছেলে সবুজকে তাদের বাড়ির কাছেই কোথাও থেকে হাতকড়া পরিয়ে ধরে এনেছিল।

শাহেদার বাড়ির অপর পাশে নির্মাণাধীন একটি ভবনের নিরাপত্তা প্রহরী নাজু মিয়া বলেন, “পুলিশ আমাকে স্বাক্ষর করতে বলেছিল। সেখানে কী ছিল না জেনেই আমি স্বাক্ষর করেছিলাম।”

তিনি আরও বলেন, ২ ফেব্রুয়ারি দুপুরে তিনি যখন ছাদে কাজ করছিলেন তখন দেখতে পান পুলিশ সবুজকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে আসছে। পরে পুলিশ সবুজকে ছেড়ে দিলেও তার মাকে আটক করে।

শাহেদার নিজস্ব একতলা বাড়ির স্টিলের যে গেটটি রয়েছে তা সাধারণত বন্ধ থাকে। পরিবারের সদস্য এবং ভাড়াটিয়াদের তালা খুলে যাতায়াত করতে হয়।

নাজু জানান, সবুজকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে আসার আগে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তিনি শাহেদার বাড়ি থেকে কাউকে বের হতে দেখেননি।

শাহেদার বাড়ির ভাড়াটিয়ার কথাতেও নাজু মিয়ার কথার প্রতিফলন পাওয়া যায়। একজন ভাড়াটিয়া জানান, বিকেলে পুলিশ বাড়িতে অভিযান চালানোর আগে তারা কাউকে বাইরে যেতে দেখেনি।

শাহ আলী থানার ডিউটি অফিসার সূত্রে জানা যায়, এসআই সিরাজকে সম্প্রতি রেলওয়ে পুলিশে বদলি করা হয়েছে। তার যোগাযোগের নম্বরও পাওয়া যায়নি।

যোগাযোগ করা হলে মামলার অভিযোগকারী ডিবি এসআই হারুন উর রশিদ জানান, সাক্ষীরা এবং তিনি মামলায় যা উল্লেখ করেছেন তা সত্য। তিনি দাবি করেন যে, সবুজ ইয়াবা ব্যবসায়ী ছিলেন এবং ওই নারী ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আশ্রয় দিতেন।

শাহেদা জানান, তার ছেলে সবুজের ইয়াবা আসক্তি আছে। তবে সে কখনও ইয়াবা ব্যবসায়ী ছিল না। তিনি আরও বলেন, সবুজের বিরুদ্ধে কোনো মাদক মামলা করা হয়নি।

তবে সবুজকে ২০১৩ সালে এসআই জাহিদের দায়ের করা একটি অস্ত্র মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছিল। তিনি জামিন পেয়েছিলেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।

এসআই মো. ইসহাক আলী মামলার বিবৃতি ঠিকই আছে জানিয়ে বলেন, “অপরাধীরা অনেক কিছুই বলে।”

পুলিশ নিয়েছে সাড়ে সাত লাখ টাকা

গত ২ ফেব্রুয়ারি অভিযানের সময় পুলিশ শাহেদার ঘরের আলমারি ভেঙে সাড়ে সাত লাখ টাকা নিয়েছিল। তবে বাজেয়াপ্ত করা পণ্যের তালিকায় এর উল্লেখ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন শাহেদা ও তার পরিবারের সদস্যরা।

শাহেদা জানান, ঢাকার পাইকপাড়ায় দেড় কাঠা জমি বিক্রি করে এই টাকা পেয়েছিলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, “আমি সুজনের দুই সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য আমার বিল্ডিংয়ে আরও এক তলা নির্মাণ করতে চেয়েছিলাম। তবে মনে হচ্ছে তা আর পারব না।

এসআই হারুন শাহেদার বাড়ি থেকে সাড়ে সাত লাখ টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।