কঠোরতার পথে শিক্ষা, নতুন দিগন্তের সন্ধানে পাবলিক পরীক্ষা
পাবলিক পরীক্ষাকে আরও কঠোর ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করার উদ্যোগে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের আভাস স্পষ্ট। দীর্ঘদিন ধরে চলমান অনিয়ম, প্রশ্নফাঁস, নকল ও মানহীন মূল্যায়ন পদ্ধতির বিরুদ্ধে এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী।
শিক্ষামন্ত্রীর এই যাত্রা শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং মানসিকতার পরিবর্তনের সূচনা। যেখানে ‘পাস’ নয়, ‘যোগ্যতা’ই হবে শিক্ষার মূল মানদণ্ড।
গত প্রায় ১৭ বছরের শিক্ষা বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে একটি দ্বৈত চিত্র দেখা যায়। একদিকে শিক্ষার হার বেড়েছে, স্কুল-কলেজে ভর্তির সংখ্যা বেড়েছে, মেয়েদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন দিন দিন তীব্র হয়েছে। পরীক্ষায় পাসের হার বাড়লেও দক্ষতার মান সেই অনুপাতে বাড়েনি। অনেক ক্ষেত্রে সার্টিফিকেটধারী শিক্ষার্থীরা মৌলিক জ্ঞান ও দক্ষতায় পিছিয়ে রয়েছে।
এই বৈপরীত্যই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম সংকট।
গত এক দশকে প্রশ্নফাঁস সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছিল। প্রযুক্তির অপব্যবহার, অসাধু চক্রের সক্রিয়তা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা বহুবার ঘটেছে।
এতে শুধু পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হয়নি, বরং মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থীদের মনোবল ভেঙেছে। একইসঙ্গে ‘সহজে পাস’ সংস্কৃতি একটি প্রজন্মকে পরিশ্রমবিমুখ করেছে।
গবেষণামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, যেখানে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া দুর্বল, সেখানে শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহও কমে যায়।
নকলের প্রবণতাও দীর্ঘদিন ধরেই পরীক্ষার একটি ‘অপ্রকাশ্য স্বীকৃত’ বাস্তবতায় পরিণত হয়েছিল। কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষকের উদাসীনতা, আবার কোথাও স্থানীয় প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ—সবমিলিয়ে পরীক্ষার হলগুলোতে শৃঙ্খলার অভাব ছিল চোখে পড়ার মতো।
ফলে প্রকৃত মেধা যাচাইয়ের পরিবর্তে ‘ম্যানেজমেন্ট’ দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। এটি একটি জাতির জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক সংকেত।
সেই প্রেক্ষাপটে শিক্ষামন্ত্রীর কঠোর অবস্থান একটি ইতিবাচক বার্তা দেয়। পরীক্ষাকেন্দ্রে সিসিটিভি স্থাপন, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও বিতরণে নিরাপত্তা জোরদার এবং অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলে পরীক্ষার পরিবেশে আমূল পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে শুধু নীতিমালা প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। এর কার্যকর বাস্তবায়নই হবে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
গবেষণামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, শিক্ষা ব্যবস্থায় টেকসই উন্নয়ন আনতে হলে তিনটি স্তরে একযোগে কাজ করতে হয়—নীতিনির্ধারণ, বাস্তবায়ন ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন।
প্রথমত, নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, মাঠপর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো অনিয়মই অদেখা না থাকে। তৃতীয়ত, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের সচেতনতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা শর্টকাটে সাফল্য অর্জনের বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হন।
গত ১৭ বছরে শিক্ষাখাতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও মানোন্নয়নে ঘাটতি ছিল। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আধুনিক ভবন হয়েছে, কিন্তু পাঠদানের গুণগত মান উন্নত হয়নি। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কারিকুলামের আধুনিকায়ন ও দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আরও বেশি মনোযোগ প্রয়োজন ছিল। সেটা না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ফলাফল ভালো দেখা গেলেও বাস্তব জীবনের প্রতিযোগিতায় তারা পিছিয়ে পড়েছে।
বর্তমান উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি হতে পারে ‘টার্নিং পয়েন্ট’। কঠোর পরীক্ষা মানেই শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ বাড়ানো নয়; বরং এটি তাদের প্রকৃত সক্ষমতা যাচাইয়ের ন্যায্য পদ্ধতি। এতে করে শিক্ষার্থী মুখস্থ-নির্ভরতা থেকে বের হয়ে বিশ্লেষণধর্মী চিন্তায় অভ্যস্ত হবে। দীর্ঘমেয়াদে তারা হয়ে উঠবে দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী ও প্রতিযোগিতামূলক মানবসম্পদ।
তবে মনে রাখতে হবে, কঠোরতা যেন মানবিকতা পরিপন্থী না হয়। শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বাস্তব সীমাবদ্ধতাগুলো বিবেচনায় নিতে হবে। পরীক্ষার পাশাপাশি ধারাবাহিক মূল্যায়ন, প্রজেক্টভিত্তিক শেখা ও সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ বাড়াতে হবে। শিক্ষা শুধুমাত্র নম্বরের খেলা নয়, এটি সামগ্রিক বিকাশের প্রক্রিয়া।
মো. তরিকুল ইসলাম; লেখক, কলামিস্ট, শিক্ষা পরামর্শক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
ইমেইল: mtislam.ca@gmail.com