নববর্ষের দানবীয় উদযাপন
থার্টি ফার্স্ট নাইট। দিনটির কথা ভাবলেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে আলোর উচ্ছ্বাস। আকাশে অগণিত আলোর ফানুস, আর চারপাশে আতশবাজি। এই দৃশ্য আমাদের কাছে উদযাপনের হলেও এর আড়ালে থাকে মর্মান্তিকতা। দিশেহারা হয়ে পাখিরা ছুটছে, ভীত-সন্ত্রস্ত কুকুরগুলো হন্যে হয়ে পালানোর পথ খুঁজছে।
আতশবাজির তীব্র শব্দ ও আকস্মিক আলো কুকুর, বিড়াল, পাখি ও বন্যপ্রাণীদের ভেতর ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে। অনেক প্রাণী ভয়ে কাঁপতে থাকে, দিগ্বিদিক পালাতে গিয়ে অনেক সময় আহত হয়। পাখিরা হঠাৎ উড়ে গিয়ে ভবন বা গাছের ডালে ধাক্কা খায়, পোষা পাখি অনেক সময় বাসা ছেড়ে পালিয়ে যায়, এমনকি মৃত্যুও ঘটে।
৩১ ডিসেম্বর আমাদের ১৯ দিন বয়সী একটি ছোট্ট শিশুর কথাও মনে করিয়ে দেয়। ২০২২ সালে হৃদরোগে ভুগতে থাকা যে শিশুটি না ফেরার দেশে চলে যায় দানবীয় উদযাপনে।
নতুন বছর এলে আমরা আনন্দিত হই, এই আনন্দের পেছনে থাকে একটি গভীর প্রত্যাশা—যা কিছু জীর্ণ, যা কিছু অশুভ, যা কিছু অমঙ্গল, তার সব কিছু ধুয়ে মুছে নতুন আনন্দোজ্জ্বল দিন আসবে। দুঃখ মুছে সুখ আসবে, অন্ধকার মুছে আলো আসবে।
অথচ স্বপ্ন-আনন্দ-আকাঙ্ক্ষার অন্ধকার অংশটুকুর দিকে ফিরে তাকাই না। কিংবা ইচ্ছে করেই চোখ বুজে থাকি। কেননা আমাদের জীবন, উদযাপন, সুখ-সফলতা, আনন্দগুলো ক্রমে সীমায়িত ও আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। আমরা নিজেদের কথা ভাবি, কিন্তু বারান্দার গ্রিলে প্রতিদিন এসে বসা পাখিটির কথা ভাবি না। আমরা নিজেদের স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভাবি, কিন্তু পথে পথে ঘুরে বেড়ানো উদ্বাস্তু, ভীত কুকুর-বিড়ালের কথা ভাবি না। ফলে আমাদের আনন্দ, আমাদের উচ্ছ্বাস, আমাদের উদযাপন অন্য কারও জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে—এমনকি মৃত্যুও ডেকে আনে।
মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব—এই ধারণাকে আমরা দায়িত্ব হিসেবে নয়, অহং হিসেবে গ্রহণ করেছি। পাখি-পোকা-বুনো প্রাণীর ঘর দখল করে আমরা নিজেদের ঘর বানিয়েছি; তাদের বিতাড়িত করেছি, অনেককে বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিয়েছি। আজ নগরজীবনে টিকে আছে গুটিকয় পাখি আর কিছু বিড়াল-কুকুর—যাদের জীবন প্রতি বছর বর্ষবরণের দানবীয় উল্লাসে বিপন্ন হয়ে পড়ে।
কেন নিউ ইয়ার মানেই আতশবাজি হয়ে উঠল? কেন আমাদের উদযাপন এত প্রকাণ্ড, এত আগ্রাসী হয়ে উঠল? কেন আমরা প্রকৃতির দায়িত্বশীল সন্তান হয়ে উঠতে পারছি না? আমরা তো চাইলে পারি! সত্যিই পারি।
'একটা পাখির গান কী রকম ভালো'—এই বিস্ময় এই প্রগাঢ় অনুভবের হৃদয় কি সত্যিই আমাদের ভেতর থেকে হারিয়ে গেছে? না, হারায়নি। শুধু কোথাও চাপা পড়ে আছে। সেই বিস্ময়কে জাগিয়ে তুলতেই হবে। কারণ এই বিস্ময় না থাকলে আমরা কখনোই প্রকৃতির দায়িত্বশীল সন্তান হয়ে উঠতে পারবো না। আর প্রকৃতির দায়িত্বশীল সন্তান না হলে পৃথিবী হবে আরও বিপন্ন, আমাদের সন্তানদের বাস-অযোগ্য।