শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এবার দ্বৈরথটা একটু অন্যরকম
এশিয়া কাপ থেকে বিদায়ের কিনারে দাঁড়িয়ে ছিলো বাংলাদেশ। লিটন দাসদের ঝুলে থাকা ভাগ্য টেনে তুলে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশকে নিয়ে আসে সুপার ফোরে। এক ম্যাচের জন্য শ্রীলঙ্কার সমর্থক হয়ে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররাও। সাময়িক এই বন্ধুত্ব শেষে সেই লঙ্কানদের হারাতে তীব্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার মিশন।
আবুধাবিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে লঙ্কানদের জয় দুবাইর হোটেলে বসে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন সবাই। দ্রুতই আবার ডুবতে হয়েছে লঙ্কানদের হারানোর পরিকল্পনায়।
এই টুর্নামেন্টের সূচিটাই বেশ গোলমেলে। এত দ্রুত রঙ বদল, পরিপ্রেক্ষিত বদল যে তাল মেলানো মুশকিল। গত দুই-তিনদিনে যা হলো তাতে সমীকরণের জটিল অঙ্কে বোধহয় দেশের পুরো ক্রিকেট সমর্থকদেরই বুঁদ থাকতে হয়েছে। নিরপেক্ষ দুই দলের খেলায় আর কবে বাংলাদেশের মানুষকে এত নজর দিতে হয়েছে কে জানে! শ্রীলঙ্কা-আফগানিস্তান ম্যাচ যতনা ছিলো শ্রীলঙ্কার, ততখানিই যেন ছিলো বাংলাদেশের।
পেস বোলিং কোচ শন টেইট জানালেন, বৃহস্পতিবার হোটলে বসে তাদের নজর ছিলো আবুধাবির মাঠে, 'আমরা খেলা দেখছিলাম। আমি ব্যক্তিগতভাবে খেলার শেষ অংশটা দেখেছি। ডিনারের আগে স্কোর চেক করছিলাম। আমরা হোটেলে বসেই খেলা দেখেছি। ম্যাচ চলাকালীন একটু এদিক-সেদিক হচ্ছিল, তাই আমরা চিন্তায় ছিলাম। আমাদের দুই বোলার ৫০ রানের বেশি খরচ করে ফেলায় বিষয়টা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিলো, আমাদের ভাগ্য ভালো।'
আফগানিস্তানের বিপক্ষে রান তাড়ায় শ্রীলঙ্কার ব্যাটিং বাংলাদেশকে যেমন সুপার ফোরে আনার আনন্দ দিয়েছে, আবার কুশল মেন্ডিসদের দারুণ ছন্দ খানিক পরই কপালে একটু হলেও চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
গত জুলাইতে শ্রীলঙ্কাকে তাদের মাঠে প্রথমবার সিরিজ হারিয়ে এশিয়া কাপে এসে নিজেদের সুবিধাজনক জায়গায় দেখছিল বাংলাদেশ। কিন্তু এই মঞ্চে লঙ্কানরা প্রথম দেখায় বাংলাদেশকে একদমই পাত্তা দেয়নি, জিতেছে দাপট দেখিয়ে।
সুপার ফোরের মঞ্চে নামার আগে তাই সুবিধাজনক জায়গায় দেখার আর উপায় নেই। তবে বাংলাদেশের জন্য প্রেরণা হতে পারে খাদের কিনার থেকে উৎরে যাওয়া। এখন আর কোন হারানোর ভয় ছাড়াই তেড়েফুঁড়ে খেলতে পারবেন লিটনরা। এই ধরণের পরিস্থিতি সাধারণত কোন কোন দলকে চাঙ্গা করে দেয়। কোণঠাসা অবস্থা থেকে কেবল এগুনোরই পথ খোলা আছে।
টুর্নামেন্টটি এত দ্রুত এগুচ্ছে যে এতে আছে একটা সুবিধা, সুপার ফোরে একটা জয় পেলেই গ্রুপ পর্বের সব তেতো স্মৃতিও আড়ালে পড়ে যাবে। এমন পরিস্থিতিকে শাপেভর মনে হচ্ছে বাংলাদেশ দলের, 'এখন নতুন দিন। এই ধরনের টুর্নামেন্টের সৌন্দর্যই হলো, যেমন আপনি বললেন, ম্যাচগুলো দ্রুত আসে। যখন একের পর এক ম্যাচ আসে, তখন আগেরটা যতটা সম্ভব ভুলে গিয়ে সামনে এগোনোর ভালো সুযোগ মেলে।'
'ভালো দিক হলো আমরা কেবল আমাদের কাজের দিকেই মনোযোগ দিতে পারি, আর আমি নিশ্চিত শ্রীলঙ্কাও তাই করবে কারণ আমরা একে অপরকে বেশ ভালোভাবেই চিনি। এটা ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। সেমিফাইনালে ওঠা অনেক বড় প্রচেষ্টা। এখন আমরা সেদিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছি: আজ রাতে অনুশীলন, আর কাল বড় লড়াই।'
শ্রীলঙ্কা আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে জেতার পাশাপাশি একটা আবেগময় পরিস্থিতিতেও পড়ে গিয়েছিলো। বাঁহাতি স্পিন অলরাউন্ডার দুনিত ওয়ালালেগের বাবা মারা যান ম্যাচের মাঝেই। জয়ের আনন্দ ছাপিয়ে যায় তাদের খানিক্ষণের জন্য। ওয়ালালাগের জন্য শোক জানিয়েছে বাংলাদেশ দলও।
বাবাকে চিরবিদায় বিদায় ফের এশিয়া কাপে উড়ে আসছেন ওয়ালালেগে। বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলার জন্যও প্রস্তুত তিনি।
একটা বিষয় খুব পরিষ্কার, এই ম্যাচের আবহে কেমন যেন পুরনো উত্তেজনাময় মাঠের বাইরের দ্বৈরথটা আপাতত নেই। বাংলাদেশের সমর্থকদের আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে শ্রীলঙ্কার প্রতি কৃতজ্ঞতা ঝরে পড়ল। যদিও শ্রীলঙ্কা তো আর বাংলাদেশের জন্য নয়, নিজেদের জন্যই জয়রথ অব্যাহত রেখে এসেছে। তবু নিজেদের সুপার ফোরে উঠা, ওয়ালালেগের বাবার মৃত্যু মিলিয়ে ঝাঁজটা একটু শিথিল।
শ্রীলঙ্কাকে বাংলাদেশ হারাতে চায়, গ্রুপ পর্বে বাজে খেলার স্মৃতি মুছতে চায়। ফেরাতে চায় নিজেদের গর্বের জায়গায়। তা করতে গিয়ে রেষারেষি নয়, অনেকটা বন্ধুত্বের আবহেই হবে ম্যাচ।
যদিও লঙ্কন ব্যাটিং কোচ থিলান কান্দাম্বি এসে জানান, তারা আর কিছুই নয় স্রেফ ডুবে থাকতে চান ক্রিকেটে, 'ক্রিকেটের প্রসঙ্গে বললে, আমার মনে হয় তাদের দল যথেষ্ট ভালো এবং গত কয়েক মাস ধরে তারা খুব প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ খেলছে। আমাদের ছেলেরা তাদের ভালোভাবেই চেনে, তাই আমরা তাদের শক্তি-দুর্বলতা জানি। আমরা সেই জায়গাগুলো কাজে লাগানোর চেষ্টা করব।'
আফগানিস্তানের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ জিতলেও অনেক বড় প্রশ্নের জায়গা ছিলো পঞ্চম বোলার ঘাটতি। দুই অনিয়মিত স্পিনার দিয়ে ৪ ওভারের পঞ্চাশ রানের বেশি দিয়ে দিয়েছিলো বাংলাদেশে। টেইটের মতে ওতেই সমীকরণ নিজেদের বাইরে চলে যায়।
শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে একাদশে আরেকজন বোলার বাড়ানো নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে টেইট মন্তব্য না করলেও, মনে হচ্ছে সেই পথেই হাঁটবে বাংলাদেশ। দুবাইর উইকেটে স্পিনাররাই বেশি সুবিধা পান, সেদিক থেকে আরেকজন বিশেষজ্ঞ স্পিনার খেলানোর সম্ভাবনা প্রবল।
সেদিক থেকে সুপার ফোর মঞ্চে একাদশে ফিরতে পারেন শেখ মেহেদী হাসান। তিনি ফিরলে ব্যাটারদের একজনকে বসিয়ে দেয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
শনিবার বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ৮টায় শুরু হওয়া ম্যাচ জিতলে এমনকি ফাইনালের ছবি সামনে আসতে পারে লিটন দাসদের।