ভারত-পাকিস্তানের লড়াইয়ের আগে ফের আড়ালে মাঠের ক্রিকেট
বাইরের ইস্যু নিয়ে এত আলোচনা যে এর থেকে দূরে থাকতে সূর্যকুমার যাদবের মনে হচ্ছে ফোন বন্ধ করে একটা ঘুম দেন। অবশ্য সে উপায় যে নেই তা জানেন, খেলার ফাঁকে নানান আনুষ্ঠানিকতায় যোগ দিতে হচ্ছে। সেখানে না চাইলেও চলে আসছে পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচের ইস্যু। যে ইস্যুতে মূলত ক্রিকেট নেই, প্রবলভাবে আছে রাজনীতি।
পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে ভারতীয় দলের হাত না মেলানো এতই স্পর্শকাতর আকার ধারণ করেছে যে দেশটির সাবেক ক্রিকেটাররাও শব্দ প্রয়োগে থাকছেন সতর্ক। আফগানিস্তান-শ্রীলঙ্কা ম্যাচ চলাকালীন ধারাভাষ্য দিতে আসা ভারতীয় কিংবদন্তি সুনীল গাভাস্কারের কাছে প্রসঙ্গটা টানতেই বললেন, 'দেখ, এই বিষয়ে এখন যেকোনো মন্তব্যই ঝুঁকিপূর্ণ।'
ভারতের আরেক সাবেক অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলির কাছে সূর্যকুমারের সিদ্ধান্ত নিয়ে জানতে চেয়েছিলো স্থানীয় গণমাধ্যম। গাঙ্গুলীর উত্তরে আছে এমন কিছু যাতে বোঝা যায় বিষয়টা তিনি পছন্দ করেননি, কিন্তু সরাসরি সূর্যকুমারকে সমালোচনাও করতে চান না, 'দেখুন, প্রতি অধিনায়ক আলাদা সবার তরিকা ভিন্ন। দল যেটা ভালো মনে করেছে, করেছে। আমার এই ব্যাপার মন্তব্য নেই।' 'সন্ত্রাসবাদ সারা দুনিয়ায় বন্ধ হওয়া উচিত। শুধু ভারত-পাকিস্তান নয়, রাশিয়া, কাতার সব জায়গায় আমরা যা দেখছি, তা চলতে পারে না।'
ক্রিকেটের সঙ্গে যে রাজনীতি, সন্ত্রাসবাদ এত কিছু জড়িয়ে যাচ্ছে সেটা পছন্দ নয় গাঙ্গুলির, 'এটা করা উচিত না (সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে খেলা গুলিয়ে ফেলা)। খেলা খেলার জায়গায়, সন্ত্রাসবাদ সন্ত্রাসবাদের জায়গায়। অন্য সব খেলায় এত হয় না, ক্রিকেটে বেশি হয়।' রোববার সুপার ফোরে ভারত-পাকিস্তানের খেলায় ব্যাটে-বলের লড়াই নিয়ে আলোচনা ক্ষীণ, ম্যাচ শেষে ভারত আবারও হাত না মিলিয়ে চলে যাবে কিনা, পাকিস্তান ফের প্রেজটেন্টশন বর্জন করবে কিনা এই আলাপই বেশি। পাকিস্তান অবশ্য ম্যাচের আগেই সংবাদ সম্মেলন বর্জন করে ফেলেছে। এই নিয়ে টুর্নামেন্টে টানা দ্বিতীয়বার আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন বর্জন করল তারা। যা আসলে বিরল।
পাকিস্তানের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচটা ভারত হেসেখেলে জেতার পর দুই দলের শক্তির ফারাক দেখা গেছে স্পষ্ট। বহুজাতিক আসরে বারবার পাকিস্তানের বিপক্ষে ভারতের জয়, এবং বেশিরভাগ জয় একপেশে হওয়ায় ক্রিকেটের আলাপটা পড়ে গেছে আড়ালে। রাজনীতির রঙ লাগিয়ে তৈরি হাইপ সেখানে নিয়েছে মূল ভূমিকা। দুই দলের প্রথম লড়াইতে দুবাই স্টেডিয়ামে বেশ কিছু আসন ফাঁকা দেখা গেছে। সুপার ফোরের ম্যাচের টিকেট নিয়েও নেই এতটা তীব্রতা।
দুই দলের মধ্যে আগের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই এখন নেই কেন এই বিষয়ে ঢুকতে চাইলে না ভারত অধিনায়ক। পাকিস্তানের নাম না নিয়েই বললেন, আপনারা কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা বলছেন, আমি জানি না। আমার কাছে, একবার মাঠে নামলে শুধু মনে হয় পুরো স্টেডিয়াম ভর্তি। আর যখন স্টেডিয়াম ভর্তি থাকে, আমি আমার দল এবং সবাইকে বলি, "চল সবাই, এবার বিনোদনের সময়।" এত মানুষ খেলা দেখতে এসেছে, তাই সবাইকে বিনোদন দিতে হবে। আর এর বাইরে কোন কিছু ভাবি না।'
হট ফেভারিট ভারত গ্রুপে কোন ম্যাচেই সত্যিকার অর্থে চ্যালেঞ্জে পড়েনি। ওমানের বিপক্ষে নিজেদের থেকেই চ্যালেঞ্জে পড়ার তাগিদ দেখা গেছে তদের। ম্যাচ খেললেও সূর্যকুমার যাদব ইচ্ছে করে ব্যাট করেনি। জাসপ্রিত বুমরাহকে বিশ্রাম দেওয়া, মূল বোলারদের বল না করিয়ে অনিয়মিতদের নিয়ে বল করানো মিলিয়ে মনে হয়েছে ভারত খেলছে অনেকটা অনুশীলন ম্যাচের আদলে।
অন্য দিকে সুপার ফোরে উঠলেও চির প্রতিদ্বন্দ্বির কাছে হেরে আছে পাকিস্তান। বিশেষ করে দলটির ব্যাটাররা আছেন প্রশ্নের মুখে। শুক্রবার রাতে আইসিসি একাডেমিতে বাংলাদেশের অনুশীলনের পর পরই প্রবেশ করে পাকিস্তান দল। পাকিস্তানের এক ঝাঁক সমর্থককে টিম বাসের কাছে গিয়ে খেলোয়াড়দের ডেকে বিভিন্ন পরামর্শ দিতে দেখা যায়। শাহীন আফ্রিদিরা অনেকটা কান বন্ধ রেখে ঢুকেছেন।
ভারতের কাছে আরেকবার হারলে এসব পরামর্শের ভাষা যথেষ্ট আপত্তিকর দিকে যাওয়ার শঙ্কা প্রবল। ভারতের হাত না মেলানোর জের গ্রুপের শেষ ম্যাচ পর্যন্ত টেনে আনে পাকিস্তান। ম্যাচ রেফারি অ্যান্ডি পাইক্রটকে সরিয়ে দেওয়ার দাবিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কেটের পরিস্থিতিতে চলে গিয়েছিলো। নজিরবিহীনভাবে এক ঘণ্টা পিছিয়ে পরে শুরু হয় ম্যাচ। হুমকি দিয়েও পরে সেই অবস্থান ধরে রাখতে না পারায় দলটির দুর্বলতাই ফুটে উঠেছে। আপাতত কোণঠাসা পাকিস্তান দলকে চাঙ্গা করতে পারে মাঠের ক্রিকেটই। সুপার ফোরে তারা যদি ভারতকে হারিয়ে দেয় গোটা টুর্নামেন্টের চেহারাই হয়ত বদলে যাবে।