ঢাবি শিক্ষার্থীদের খাবার খরচ প্রায় দেড় গুণ বাড়লেও মান বাড়েনি
'এক মাসের টাকা অর্ধেক মাসেই ফুরাল'—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের ক্যানটিনে গত বৃহস্পতিবার দুপুরের খাবার শেষে বিল পরিশোধের পর ম্যানিব্যাগের দিকে তাকিয়ে এমন উক্তি করতে দেখা গেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জুয়েল মিয়াকে। খাবারের দাম বাড়ায় পুরো মাসের টাকা এখন তার অর্ধেক মাসের খাবারের পেছনে খরচ হয়ে যায়।
জুয়েল মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের শিক্ষার্থী। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আগে ১০০ টাকা দিয়ে ৩ বেলার খাবার খাওয়া যেত। এখন ৩ বেলার খাবার খেতে ১৫০ টাকা লাগে। কিন্তু সে তুলনায় খাবারের মান বাড়েনি।'
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সবগুলো হলেই খাবারের দাম বেড়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দাম বাড়লেও মান বাড়েনি খাবারের।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ফিরোজ ডেইলি স্টারকে বলেন, 'প্রতি বেলা খাবারে অন্তত ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশি খরচ হচ্ছে। অথচ আয় তো বাড়েই নাই বরং কমে গেছে। অনেক বন্ধুকে দেখি কোনো রকমে খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় নাকি খাবারে ভর্তুকি দেয়! পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেলে স্বাস্থ্য ভালো থাকে? খাবারের দাম না কমলে আর টিকে থাকা যাবে না।'
'হলের খাবারে ভর্তুকি বাড়াতে হবে। জনগণের টাকায় চলা বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্রমিক-কৃষকের সন্তানরা যেন তিন বেলা খেয়ে লেখাপড়া করতে পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। খাবারের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে', যোগ করেন ফিরোজ।
মাছ-মাংস-ডিমের দাম কোনো কোনো হলে ৫ টাকা, আবার কোন হলে ১০ টাকা বেড়েছে। শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ক্যানটিন মালিক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আগে ভাতসহ এক টুকরা মাছ বিক্রি করতাম ৩০ টাকায়। এখন বিক্রি করি ৩৫-৪০ টাকায়। মুরগির মাংসের দামও একই।' বাজারে সব কিছুর দাম বাড়তি, এ জন্য ৫ টাকা দাম বাড়ানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের ক্যানটিনে গিয়ে দেখা যায়, খাবারের দাম নিয়ে ক্যানটিন মালিকের সঙ্গে তর্ক করছেন এক শিক্ষার্থী।
এ হলে ছাত্রদের মুরগি ও গরুর মাংস দিয়ে পোলাও খেতে হচ্ছে ৬০ টাকা দিয়ে। এ ছাড়া মুরগির ঝাল ফ্রাই ৫০ টাকা, গরুর মাংস ও ভাত ৫৫ টাকা, কৈ মাছ ৪০ টাকা, কাতল মাছ ৩৫ টাকা করে। অন্য হলগুলোতেও প্রায় একই মূল্যে খাবার বিক্রি করা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা ও এসএম হল ছাত্র সংসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জুলিয়াস সিজার কিছুদিন আগে খাবারের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।
তিনি তার ফেসবুকে লেখেন, প্রতি বেলা খাবারের দাম গড়ে ১৫ টাকা বেড়েছে। এ খরচ বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। আমি মনে করি ৩০ টাকা মূল্যের ওপরে দাম বাড়ানো উচিত না।
তবে, ক্যানটিন মালিকরা বলছেন, বাজারে দ্রব্য মূল্য বেড়ে যাওয়ায় তাদের খাবারের দামও বাড়াতে হয়েছে।
খাবারের ওপর মাছি উড়ে!
গত শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে হাবীবের ক্যানটিনে যায় এ প্রতিবেদক। তখন দুপুরের খাবার রান্না প্রায় শেষ। রান্না শেষে ঢাকনা ছাড়া ভাত-তরকারি রাখা হয়েছে। ভাতের ওপর মাছি ভন ভন করেছে। এ দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করেন এ প্রতিবেদক। তখন দ্রুত ঢাকনা দিয়ে ভাত ঢাকতে ব্যস্ত হতে দেখা গেছে ক্যানটিনের এক কর্মচারীকে।
শুধু ভাতই নয়, রান্না করা মাছ-মাংসেরও একই অবস্থা। হলের শিক্ষার্থীরা খাবার খেতে আসলে এখান থেকে নিয়ে খাবার পরিবেশন করা হয়। বিভিন্ন সময়ে অন্য হলেও খাবারের মধ্যে তেলাপোকা ও পঁচা মাংস পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন ডেইলি স্টারকে বলেন, 'হলে খাবারের দাম বেড়েছে, এ ধরনের অভিযোগ পাইনি। তবে, এ ব্যাপারে আমরা অবগত আছি। করোনার বন্ধের পর খাবারের দাম বেড়েছে। যদি কোনো ভর্তুকির প্রয়োজন হয়, সেটি আমরা দেব। কিন্তু হলের ক্যানটিন যারা পরিচালনা করছেন, তারা যাতে অতিরিক্ত মুনাফার জন্য ছাত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে না পারে, তা দেখা হবে।'
সুষম খাদ্য খাওয়ার আহ্বান কর্তৃপক্ষের, তবে...
করোনার বন্ধের পর আবাসিক হল খোলার সময় শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে 'স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর' (এসওপি) তৈরি করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সেখানে সুষম খাদ্য খাওয়ার কথা বলা হয় শিক্ষার্থীদের। কিন্তু, হল খোলার পর খাদ্যের মানের তেমন উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান ডেইলি স্টারকে বলেন, 'খাবারের গুণগত মান যাতে নিশ্চিত করা হয়, সে ব্যাপারে ক্যানটিন পরিচালকদের সঙ্গে খুব শিগগিরই আলোচনা করা হবে। খাবারের মূল্য কোনভাবেই বাড়ানো যাবে না। যাতে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার সরবরাহ করে, সে ব্যাপারে আলোচনা করা হবে।'