‘জীবন হলো আনন্দ-বেদনার মাঝে বেঁচে থাকা’
বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকী। তার অনন্য সৃষ্টি কালজয়ী সিনেমা ঘুড্ডি। সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা একজন আধুনিক মানুষ তিনি। টিভি নাটক, চলচ্চিত্র, থিয়েটার তিন মাধ্যমেই সফল পদচারণা তার। এই গুণী নির্মাতা ঘুড্ডি ছাড়াও লাল বেনারসি এবং আয়না বিবির পালা সিনেমার নির্মাতা। ছিলেন বিটিভির মহাপরিচালক। শিল্পকলায় অবদানের জন্য পেয়েছেন একুশে পদক। আজ ২৬ আগস্ট তার ৭৫তম জন্মদিন।
জন্মদিনে দ্য ডেইলি স্টারের মুখোমুখি হন সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকী। কথা বলেছেন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে।
আপনার পরিচালিত ঘুড্ডি সিনেমার আবেদন এখনো দর্শকদের কাছে রয়ে গেছে। সেই সময়ে এত আধুনিক সিনেমা নির্মাণের ভাবনা কীভাবে মাথায় এলো?
ঘুড্ডি এতোটা আধুনিক সিনেমা হবে তা তো ভাবনায় ছিল না। এতোটা সাড়া জাগাবে তাও ভাবিনি কখনো। একটা সময়ের গল্প নিয়ে সিনেমা করার ইচ্ছে ছিল। ভারতের পূনা ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে পড়ালেখা শেষ করে তখন দেশে ফিরেছি। একটাই চাওয়া- সিনেমা বানাতে চাই। তারপর সিনেমা বানাতে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিলাম। এক সময় কাজটি শেষ করি। কিন্তু, বুঝতেই পারিনি সিনেমাটি দর্শকের এতোটা কাছাকাছি পৌঁছাবে। মেকিং একটা বড় বিষয়। মেকিংয়ের দক্ষতা আরও বড় বিষয়। এছাড়া, এডিটিং, অভিনয়, গান, ক্যামেরার কাজ- সব মিলিয়ে ভালো একটি সিনেমা হয়েছিল ঘুড্ডি। দর্শকদের কাছে ঘুড্ডির আবেদন এখনো থাকার মূল কারণ হতে পারে- মেকিং, গল্প, অভিনয়, ক্যামেরা, গান। লাকী আখান্দের সুর একটা ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছিল।
হ্যাপী আখন্দের আবার এলো যে সন্ধ্যা গানটি নতুন কিছু ছিল। শাহনাজ রহমতউল্লাহ তখন পাকিস্তান থেকে দেশে ফিরে প্রথম ঘুড্ডি সিনেমায় প্লেব্যাক করেন। তার ঘুম ঘুম গানটিও দর্শকরা গ্রহণ করেছিলেন। সব মিলিয়ে মুক্তির পর চারদিকে বেশ সাড়া পড়ে যায়। ধীরে ধীরে পরবর্তী জেনারেশনের মধ্যে ঘুড্ডি আলোচনায় থেকে গেল।
এদেশের সিনেমা শিল্পের সমস্যা আসলে কোথায়, আপনার অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যাখ্যা করুন…
দেখুন, আমি এই বিষয়টি জোর দিয়ে বলতে চাই মূল সমস্যাতে যাওয়া হচ্ছে না। মূল সমস্যা অন্য জায়গায়। তা হলো– প্রেক্ষাগৃহ। আমার ঘুড্ডি সিনেমা যখন মুক্তি পায় তখন হল সংখ্যা ছিল এক হাজার দুইশ। এখন কমতে কমতে একশরও নিচে নেমে এসেছে। এটা বড় সমস্যা। চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি, চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি, প্রযোজক পরিবেশক সমিতি- এই তিন সমিতির উচিত তীব্রভাবে প্রেক্ষাগৃহর দাবি তোলা। এটা নিয়ে কথা বলা উচিত। কিন্তু, তা না করে অনুদান পেল কী পেল না তা নিয়ে অনেকে পড়ে আছে। আসল বিষয় নিয়ে চিন্তা নেই।
সরকার অনুদানের পরিমাণ বাড়িয়েছে, এটা নিয়ে আপনি কতটা সন্তুষ্ট?
সরকার এ বিষয়ে ভালো করছে। প্রচুর টাকা অনুদান দিচ্ছে। আগের চাইতে অনুদানের টাকার পরিমাণ বেড়েছে। এই সরকারই তা করেছে। সরকার একটি সিনেমার জন্য যে পরিমাণ অনুদান দিচ্ছেন- তা দিয়ে অনেক ভালো সিনেমা করা সম্ভব। এখন অনুদান যারা পাচ্ছেন তাদের সেভাবে কাজ করা প্রয়োজন। যেন ভালো কিছু হয়। সরকারি অনুদানের টাকার পরিমাণ নিয়ে আমি সন্তুষ্ট।
তখনকার আর এখনকার কাজের পার্থক্য কেমন?
কিছু কাজ ভালো হচ্ছে এবং কিছু কাজ দায়সারাভাবে হচ্ছে। প্রস্তুতি নেই। আমি সবচেয়ে বেশি জোর দেব সিনেমার প্রস্তুতির ওপর। স্ক্রিপ্টের ওপর অনেক জোর দিতে হবে। সম্প্রতি আমি একটি নাটক করেছি। আট থেকে নয় বছরের প্রস্তুতি ছিল স্ক্রিপ্টে। আমি বলছি না- এত বছরের প্রস্তুতির দরকার আছে, কিন্তু মানসিকভাবে প্রস্তুতিটা দরকার। এখন হুট করে কিছু একটা বানিয়ে ফেলার প্রবণতা বেশি। কিছু জানে না- অথচ কী করছেন জানতে চাইলে বলবে- শর্ট ফিল্ম করছি, অমুক করছি। এই প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
অনেক কিছুর পরিবর্তন হচ্ছে। আপনার কী মনে হয় এত পরিবর্তনের ভিড়ে শিল্প-সাহিত্যের জগতটা শেষ হয়ে যাবে?
শিল্প-সাহিত্যের জগত কোনোদিন শেষ হবে না। কিছু মানুষ শিল্প-সাহিত্যকে ভালোবেসে কাজ করে যাবে সারাজীবন। সিনেমা শিল্পও কোনোদিন শেষ হবে না, ধ্বংস হবে না। অস্তিত্বের প্রকাশ হলো সিনেমা। সময় ভালো খারাপ যেত পারে। শিল্প সাহিত্য টিকে থাকবে। দেখুন, কলকাতায় একজন মধ্যবিত্ত তার বাজেটে একটি পত্রিকা এবং সিনেমা দেখার বিষয়টি রাখেন। আমাদের এখানে তা নেই। এটা থাকলে আমাদের শিল্প-সাহিত্য অনেক দূর যেত।
একটি নতুন সিনেমা নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, কতদূর এগোলেন?
ক্রান্তিকাল নামে একটি সিনেমা করতে চেয়েছিলাম। করোনা আসার পর কাজটি থেমে গেছে। প্রযোজক করবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। অনেক প্রস্তুতি নিয়ে স্ক্রিপ্ট করেছি। এখন ফাণ্ডের চেষ্টা করছি। ফাণ্ড পেলে ক্রান্তিকাল সিনেমাটি করব। অপেক্ষা করছি।
আজ আপনার জন্মদিন, ৭৫তম জন্মদিনে এসে জীবন নিয়ে আপনার ধারণা…
জন্মদিন এলে আমি খুব আনন্দ পাই। প্রচুর মানুষের ভালোবাসার প্রকাশ ঘটে। আমি উপভোগ করি। ছোটবেলায় জন্মদিনে মা মিষ্টি জাতীয় খাবার রান্না করতেন। খিচুড়ি রান্না করতেন। সেসব কথা মনে পড়ে। জীবন নিয়ে আমার ধারণা হচ্ছে- জীবন হলো আনন্দ-বেদনার মাঝে বেঁচে থাকা।