‘আমরা মাথা নত করব না’, পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে সংসদে যা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী
পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন থেকে সরে যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থায়নে এই সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন। বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার ৯ দিন পর প্রধানমন্ত্রী ২০১২ সালের ৮ জুলাই সংসদে এই কথা বলেন।
২০১২-১৩ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তার সমাপনী বক্তব্যে ২৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৫-১৬ এর মধ্যে মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। কোথা থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হবে তার একটি রূপরেখাও দেন প্রধানমন্ত্রী।
নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেওয়ার পর সারা দেশে মানুষের মধ্যে যে উৎসাহ দেখেছেন তাকে 'নজিরবিহীন' মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা কারও কাছে মাথা নত করব না। বিশ্বব্যাংক খোঁড়া অজুহাতে বাংলাদেশের যে বিশাল ক্ষতি করেছে আমরা কোনোভাবেই তা মেনে নিতে পারি না। প্রকল্পে এক পয়সাও অর্থ ছাড় না করেই বিশ্বব্যাংক যে দুর্নীতির অভিযোগ এনেছে তা কোনো বাঙালি মেনে নিতে পারে না।
পদ্মা সেতু নির্মাণে বিলম্ব ঘটানোর অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, বিলম্বের কারণে নির্মাণ খরচ বেড়ে গেছে। আমি অর্থমন্ত্রীকে বলব বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক ও জাইকার মতো ঋণদাতাদের এই প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধের জন্য বিশ্বব্যাংক প্ররোচিত করেছে বলেও সেদিন অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
অর্থায়ন যেভাবে
পদ্মা সেতু নির্মাণে বছর ধরে ব্যয়ের একটি প্রাক্কলন হাজির করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণে ২০১২-১৩ অর্থবছরে প্রয়োজন হবে ৩ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৭ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৭ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা ও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এই সেতু নির্মাণ সম্পন্ন হবে।
ওই অর্থবছরে ৫৫ হাজার কোটি টাকা এডিপিতে বরাদ্দ থাকার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন যে, কয়েকটি মন্ত্রণালয় বলেছে যে তারা এ বছর তাদের জন্য বরাদ্দের পুরো অর্থ খরচ করবে না।
'এডিপি থেকে ২৪ হাজার কোটি টাকা বাঁচানো সম্ভব। এর জন্য আমাদের সাশ্রয়ী হতে হবে আর কিছু মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে কাটছাঁট করার প্রয়োজন হতে পারে। পদ্মা সেতু নির্মাণও উন্নয়ন প্রকল্প আর এতে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে। সরকার আর সময় অপচয় না করে শিগগির নির্মাণ কাজ শুরু করবে।'
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সরকার সভরেইন বন্ড ছেড়ে ৭৫০ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর পাশাপাশি সরকার সারচার্জ আরোপ করতে পারে, যেটা যমুনা নদীতে সেতু তৈরি করার সময় করা হয়েছিল। এই প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগকেও আমরা স্বাগত জানাব।
সেতু নির্মাণের কোন খাতে কত খরচ হবে সে সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মূল সেতু নির্মাণে খচর হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা; নদী শাসনে ৭ হাজার ২০০ কোটি; জাজিরা প্রান্তে সংযোগ সড়ক তৈরিতে ১ হাজার ২৮১ কোটি টাকা এবং মাওয়া প্রান্তে সংযোগ সড়ক তৈরিতে আরও ৩১০ কোটি টাকা খরচ হবে।
ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনে সরকার ইতোমধ্যে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা খরচ করেছে বলেও সেদিন সংসদে জানান তিনি।
বিশ্বব্যাংকের সমালোচনা
বিশ্বব্যাংকের কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের প্রেসক্রিপশন মানতে গিয়ে দেশের পাট ও রেলওয়ে খাত ধ্বংস হয়েছে। এই সংস্থাটি থেকেই কৃষিক্ষেত্রে ভর্তুকি প্রত্যাহারের পরামর্শ এসেছে।
'তারা চায় আমরা যেন ভিক্ষা করি। তারা আমাদের গিনিপিগ করেই রাখতে চায়… কিন্তু আমরা ভিক্ষা নেই না; আমরা ঋণ নিয়ে সুদসমেত তা ফেরত দেই।'
বিশ্বব্যাংকের অংশীদার হিসেবে এর আয়ব্যয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও ব্যালেন্স শিট চাওয়ার অধিকার আছে বলেও প্রধানমন্ত্রী সংসদে মন্তব্য করেন।
দুর্নীতি নিয়ে অভিযোগ জানানোর আহ্বান
এর আগে প্রধানমন্ত্রী সংসদে তার মোবাইল ফোন নাম্বার ও ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করে দুর্নীতি নিয়ে অভিযোগ জানাতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন।
বিশ্বব্যাংক ইস্যুতে কল করা বেশিরভাগ মানুষের সমর্থন পাওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, দেশ-বিদেশ থেকে প্রচুর মানুষের সাড়া পেয়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণে সহায়তার জন্য প্রবাসীদের অনেকে বলেছেন যে তারা আরও কঠোর পরিশ্রম করে রেমিট্যান্স পাঠানো বাড়াবেন। এমনকি স্কুল শিক্ষার্থীরা ফোন করে বলেছেন যে তারা টিফিনের খরচ বাঁচিয়ে টাকা পাঠাবে।
ঈষৎ সংক্ষেপিত, মূল প্রতিবেদনটি পড়তে এই লিংকে ক্লিক করুন