নেপালে বন্যা: বেঁচে ফেরা কয়েকজনের বর্ণনায় ভয়াল সেই দিন

স্টার অনলাইন ডেস্ক

‘গাড়ির লুকিং গ্লাসে দেখছিলাম বন্যার স্রোত আমার দিকে ধেয়ে আসছে। বাঁচার জন্য গতি বাড়িয়ে দেই আমি,’ বলেন নেপালের মাকওয়ানপুর জেলার থাহা পৌরসভার ট্রাকচালক রাজ কুমার কার্কি (৩৬)।  

বুধবার সকালে নুয়াকোটের বেত্রাবতী থেকে পণ্যবোঝাই ট্রাক নিয়ে তিমুরের দিকে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। এমন সময় মাইকে সতর্কবার্তা শুনতে পান—‘বন্যা আসছে, বন্যা আসছে।’

ট্রাকটি ঘুরিয়ে গালছির দিকে রওনা হন কার্কি। কিছুক্ষণ পরই দেখতে পান বিশাল ঢেউ ছুটে আসছে তার পেছনে।

বলেন, ‘দেখলাম আমার পেছনে থাকা প্রায় নয়টি গাড়ি ইতোমধ্যে ভেসে গেছে।’

গতি আরও বাড়িয়ে ট্রাক চালিয়ে যেতে থাকেন কার্কি। ত্রিশূলীর ধুঙ্গে বাজারের কাছে এসে পাহাড়ের দিকে উঠে যান তিনি। বলেন, ‘অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেয়েছি।’

ওই রাত পাহাড়ের ঢালে কাটান তিনি। জানান, সেখান থেকে বেত্রাবতী ও আশপাশের জনপদ ধ্বংস হতে দেখেন। ত্রিশূলী নদীতে অনেককে ভেসে যেতেও দেখেছেন তিনি।

নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তায় পরদিন বৃহস্পতিবার কাঠমান্ডু পৌঁছান কার্কি। শুক্রবার বিকেলে বাড়ি ফেরেন।

গত ২০ বছর ধরে পেশাদার গাড়িচালক কার্কি। গত পাঁচ বছর ধরে রাসুয়া থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পণ্য পরিবহন করছেন তিনি।

গত বুধবার হিমালয় পর্বতশ্রেণিতে হিমবাহ ধস থেকে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস হয়। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৮০০ এর বেশি মানুষ মারা গেছেন এবং নিখোঁজ তিন হাজারের বেশি।

তবে অনেকে এ দুর্যোগ থেকে নানা কৌশলে বেঁচে ফিরেছেন। সংবাদমাধ্যম কাঠমুণ্ডু পোস্টে তুলে ধরা হয়েছে এমন কয়েকজন বেঁচে ফেরা মানুষের গল্প।

‘বিদ্যুতের তার ধরে বেঁচে ফিরেছি’

বুধবার বন্যা শুরু হওয়ার সময় রৌতহাটের রাজদেবী পৌরসভার-২ নম্বর ওয়ার্ডের হাজমিনিয়া এলাকায় মিষ্টির দোকানে কাজ করছিলেন রামবচন সাহ (৩৬)।

তিনি জানান, কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ দেখেন বন্যার পানি দোকানে ঢুকে পড়েছে। এরপর স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। এসময় তার হাত একটি তারে আটকে যায়।

রামবচন বলেন, ‘বাঁচার আর কোনো উপায় না দেখে বিদ্যুতের তারটি ধরে ফেলি। প্রায় আধা ঘণ্টা এভাবে জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে লড়াই করেছি। নিচ দিয়ে তখন প্রচণ্ড বেগে বন্যার পানি ছুটে যাচ্ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘হাত যদি তার থেকে ফসকে যেত, তাহলে আমার বেঁচে থাকার কোনো সুযোগ ছিল না।’

শেষ পর্যন্ত রামবচন বেঁচে যান। তবে ওই দোকানের বাকি তিন কর্মী স্রোতে ভেসে গেছেন। এখনো তাদের সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।

বন্যার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে। তাতে দেখা যায়, কাদামাখা শরীরে খালি পায়ে কর্দমাক্ত রাস্তায় কষ্ট করে হাঁটছেন এক তরুণ। এটি ছিল রামবচন সাহের ছবি। 

গাথে কামি ও রাজ কুমার কার্কি। ছবি: কাঠমুন্ডু পোস্ট

‘এখনো মনে হয় স্বপ্ন দেখছি’

রাসুয়া জেলায় ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাছে বুধবার সকালে কাজ করছিলেন গাথে কামি (৪০)। হঠাৎ পাহাড় থেকে পাথর গড়িয়ে পড়ার মতো শব্দ শুনতে পান।

এরপরই দেখেন, ভোতেকোশি নদীর পানি তাদের দিকে ধেয়ে আসছে।

এসময় কামি আশপাশের সবাইকে দৌড় দিতে বলেন। তিনি নিজেও প্রায় ৫০০ মিটার উঁচু জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়ের দিকে ছুটে যান। একপর্যায়ে জ্ঞান হারান তিনি।

জ্ঞান ফেরার পর দেখেন, নিচের জনপদটি মাটির নিচে চাপা পড়েছে।

বলেন, ‘এখনো মনে হয়, যেন স্বপ্ন দেখছি। পুরো ঘটনাটা এখনো চোখের সামনে ভাসছে।’

কুমাখ গ্রামীণ পৌরসভার-১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা কামি। তিনি জানান, ছোটবেলায় গরু ও ছাগল চরানোর সময় খাড়া পাহাড়ে দৌড়ানোর অভিজ্ঞতা ছিল তার। তাই পালিয়ে বাঁচতে পেরেছেন।

তুলসী বাহাদুর ভান্ডারি। ছবি: কাঠমুন্ডু পোস্ট

‘ঢেউটি আমাকে ছুঁড়ে না ফেললে আজ বেঁচে থাকতাম না’

বাগমতী প্রদেশের দোলখা জেলার বাসিন্দা তুলসী বাহাদুর ভান্ডারি।

তিনি জানান, রাসুয়ার একটি জনপদের মধ্য দিয়ে কাদা-পানির স্রোত বয়ে যাওয়ার সময় শক্তিশালী একটি ঢেউয়ের ধাক্কায় পাহাড়ের ঢালে ছিটকে পড়েন তিনি। তাতেই প্রাণে বেঁচে যান।

বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ভান্ডারি। তিনি বলেন, ‘কালো কাদা ও পানির ওই স্রোত কোথা থেকে এলো, আমরা কিছুই বুঝতে পারিনি। দৌড়ানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু স্রোত আমাকে ধরে ফেলে। এরপর প্রচণ্ড জোরে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।’

ভান্ডারি বলেন, ‘ওই ঢেউটি যদি আমাকে পাহাড়ের ঢালের দিকে ছুঁড়ে না দিত, তাহলে আজ আমি বেঁচে থাকতাম না।’

নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে যারা প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন, তাদের অনেকেরই মনে এখনো তাজা স্বজন ও বন্ধুদের স্রোতে ভেসে যাওয়ার দৃশ্য।