দ্বিগুণ গতিতে গলছে হিমালয়ের হিমবাহ, পরের বিপর্যয় কি আঁচ করা সম্ভব?
পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হিমালয়সহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের হিমবাহ ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। এরই ভয়াবহ উদাহরণ দেখা গেল নেপাল ও চীনের তিব্বতে। বুধবার হিমালয়ের একটি নদী উপত্যকায় হঠাৎ পানি, পাথর ও কাদার ভয়াবহ স্রোত নেমে এসে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও মানুষকে ভাসিয়ে নেয়। অনেকে আবার ঘন কাদার নিচে চাপা পড়েন।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনাটি ঠিক কীভাবে ঘটেছে, বিজ্ঞানীরা এখনো তা খতিয়ে দেখছেন। প্রাথমিক মূল্যায়নে ধারণা করা হচ্ছে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কয়েক হাজার ফুট উচ্চতায় হিমবাহের একটি অংশ এবং এর নিচে থাকা পাহাড়ের একটি অংশ একসঙ্গে ভেঙে পড়ে। একসঙ্গে যে পরিমাণ বরফ ও পাথর উপত্যকায় নেমে আসে, এর পরিমাণ প্রায় ৭০টি গিজার মহাপিরামিডের সমান।
ঘটনাটি আগে থেকে অনুমান করা যায়নি। তবে দ্রুত ও ভয়াবহভাবে হিমবাহ ধসে পড়ার মতো ঘটনা উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীতে ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। মানুষের কর্মকাণ্ডজনিত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ নজিরবিহীন হারে গলছে। পাহাড়ের চূড়ায় ঝুলে থাকা হিমবাহ যথেষ্ট পরিমাণে গলে গেলে সেগুলো ভেঙে নিচের সবকিছুর ওপর আছড়ে পড়তে পারে।
হিমালয়ই একমাত্র ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল নয়
উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় থাকা হিমবাহ শুধু হিমালয়েই নেই। নরওয়ে, নিউজিল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও চিলিসহ বিশ্বের বিভিন্ন পার্বত্য অঞ্চলে এমন হিমবাহ রয়েছে, যেগুলো দ্রুত উষ্ণায়নের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
নেপালের কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এক্সপ্লোরার মোহন বাহাদুর চাঁদ বলেন, ‘দ্রুত উষ্ণায়ন ও হিমবাহ গলার কারণে বিশ্বের সব হিমবাহ অঞ্চলই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।’
কোনো হিমবাহ কোথায় অবস্থিত এবং আশপাশের ভূপ্রকৃতি কেমন, তার ওপর নির্ভর করে ধসের পরিণতি হতে পারে আকস্মিক বন্যা থেকে শুরু করে আকাশচুম্বী উচ্চতার মেগাসুনামি পর্যন্ত।
তবে সব পরিস্থিতিই যে আশাহীন, তা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ ঝুঁকি বিশেষজ্ঞ অ্যালটন বায়ার্সের মতে, কিছু ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহকে যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করা হলে ধসের আগে সতর্ক সংকেত পাওয়া সম্ভব। সঠিক পরিস্থিতিতে এ ধরনের সতর্কতার মাধ্যমে হাজারো মানুষের জীবন বাঁচানো যেতে পারে।
হিমবাহ ধস কতটা ভয়াবহ হতে পারে?
পৃথিবীর প্রতিটি মহাদেশেই হিমবাহ রয়েছে। পাহাড়ের চূড়ায় আটকে থাকা এসব বরফ গলে, ফেটে বা ধসে পড়লে বিভিন্ন ধরনের প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে প্রচণ্ড বেগে নেমে আসা বরফগলা পানি থেকে শুরু করে বরফ, পাথর ও ভূমিধসের ভয়াবহ সম্মিলিত স্রোত।
কোনো হিমবাহ উঁচু ফিয়র্ডে (সমুদ্রখাঁড়ি) ভেঙে পড়লে মেগাসুনামিও তৈরি হতে পারে।
২০২৩ সালে পূর্ব গ্রিনল্যান্ডে একটি বিশাল পাথর-বরফের ধস নিচের সংকীর্ণ জলভাগে আছড়ে পড়ে প্রায় ৬৫০ ফুট উঁচু ঢেউ তৈরি করেছিল। ঢেউয়ের আঘাতে ফিয়র্ডের পাথুরে দেয়ালও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২০২৫ সালে আলাস্কার একটি ফিয়র্ডে একই ধরনের ঘটনা প্রায় এক হাজার ৫৮০ ফুট উঁচু মেগাসুনামি তৈরি করে। এটি ওয়াশিংটন মনুমেন্টের প্রায় তিন গুণ উঁচু। ওই ফিয়র্ডে প্রায়ই পর্যটনবাহী জাহাজ চলাচল করে। তবে সৌভাগ্যক্রমে মেগাসুনামিটি ভোররাতে সৃষ্টি হওয়ায় তখন ফিয়র্ডটি ফাঁকা ছিল।
গত মে মাসে সুইজারল্যান্ডের আল্পসের লটশেন উপত্যকায় বার্চ হিমবাহের বড় একটি অংশ ভেঙে পড়ে। এতে পাথর ও বরফের ধস নেমে এসে ব্লাটেন গ্রামের বড় অংশ প্রায় দুই কোটি টন ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে।
নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় কীভাবে ঘটল?
নেপাল-তিব্বত সীমান্তের লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের উত্তর ঢালে বুধবার এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয়।
ফ্রান্সের ইউনিভার্সিটি গ্রেনোবল আল্পসের ভূ-প্রকৃতিবিদ ক্রিস্টেন কুকের মতে, হিমবাহের নিচে থাকা পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে এবং তার সঙ্গে হিমবাহটিও নিচে নেমে আসে।
দ্রুতগতিতে নিচে পড়ার সময় বরফের একটি অংশ গলে যায়। একইসঙ্গে পাথরের ধস সাময়িকভাবে লেন্দে নদীর প্রবাহ আটকে দিয়ে একটি অস্থায়ী হ্রদ তৈরি করে থাকতে পারে। পরে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় বন্যার সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা।
মোহন বাহাদুর চাঁদ বলেন, ‘ঠিক কখন ও কত বড় পরিসরে নদীর প্রবাহ আটকে গিয়েছিল এবং কত পানি জমেছিল, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে বন্যার সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।’
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্ক কী?
কোনো একটি দুর্যোগকে কেবল বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য দায়ী করা যায় না। তবে বিজ্ঞানীদের ধারণা, নেপালের এই ঘটনায় উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের পারমাফ্রস্ট (চিরহিমায়িত ভূস্তর) দুর্বল হয়ে যাওয়ার ভূমিকা থাকতে পারে।
পারমাফ্রস্ট দীর্ঘদিন ধরে বরফ, তুষার ও পাথরকে একসঙ্গে ধরে রাখার মতো কাজ করে। পৃথিবী উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে এই জমাট স্তর দুর্বল হয়ে গেলে পাহাড়ের স্থিতিশীলতাও কমতে পারে।
মোহন বাহাদুর চাঁদের ভাষায়, তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে হিমবাহ গলার গতি বাড়ে। একইসঙ্গে হিমবাহের হ্রদ তৈরি হওয়া ও দুর্বল ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর মতো বিষয়গুলো পাহাড়কে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে।
সামনে আরও হিমবাহ ধসের আশঙ্কা
পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে আগামী কয়েক দশকে হিমবাহজনিত দুর্যোগের সংখ্যা এবং সম্ভবত এগুলোর ভয়াবহতাও বাড়তে পারে।
ফ্রান্সের ভূ-প্রকৃতিবিদ ক্রিস্টেন কুক বলেন, ‘উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে আরও বেশি অস্থিতিশীলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নেপালের এবারের ঘটনাটি ছিল ব্যতিক্রমী বড়। তবে এ ধরনের তুলনামূলক ছোট ধসও ভবিষ্যতে ঘটতে থাকবে।’
হিমালয় এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে খাড়া পাহাড়ের ওপর বিপুলসংখ্যক হিমবাহ রয়েছে এবং তার নিচেই রয়েছে আরও খাড়া নদী উপত্যকা। এসব উপত্যকার অনেক জায়গায় সড়ক, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো গড়ে উঠেছে।
২০১৯ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, হিমালয়ের ২১০টি হিমবাহের হ্রদ হঠাৎ বন্যা সৃষ্টি করে মানববসতিকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
আগাম সতর্কতা কি জীবন বাঁচাতে পারে?
বিজ্ঞানীদের মতে, হিমবাহ ধস পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব না হলেও আগাম সতর্কতা ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রাণহানি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
এর একটি উদাহরণ সুইজারল্যান্ডের ব্লাটেন। ২০২৫ সালে সেখানে হিমবাহের বিশাল অংশ ধসে পড়লেও গ্রামের কোনো বাসিন্দা মারা যাননি। কারণ ধসের নয় দিন আগেই স্থানীয় বাসিন্দা ও পশুদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
ব্লাটেনের হিমবাহটি ১৯৯০-এর দশক থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত ছিল। ২০২৫ সালের শুরুতে সেখান থেকে ঘন ঘন পাথর পড়তে থাকায় বিজ্ঞানী ও নীতিনির্ধারকেরা সতর্ক হন। স্থানীয় বাসিন্দাদের পর্যবেক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পাওয়া তথ্য ধসের সম্ভাবনা সম্পর্কে আগাম ধারণা দেয়।
ব্লাটেনের প্রাকৃতিক দুর্যোগবিষয়ক গবেষক বেঞ্জামিন বেলভাল্ড বলেন, ‘স্থানীয় মানুষের সঙ্গে বিজ্ঞানী ও কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ও নিয়মিত যোগাযোগের ফলে সহজেই লোকজনকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল। এতে প্রায় ৪০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হলেও বহু মানুষের জীবন রক্ষা পায়।’
হিমালয়েও কি এমন ব্যবস্থা সম্ভব?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভব। নেপালের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ শনাক্ত করা, ভবিষ্যৎ বিপদের মানচিত্র তৈরি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে প্রস্তুত করার কাজ চলছে।
তবে হিমালয়ের বিশাল বিস্তৃতি এ কাজকে আল্পসের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন করে তুলেছে। সব হিমবাহ ধসের আগে একই ধরনের সতর্ক সংকেতও দেয় না।
তাই বিশেষজ্ঞরা অত্যাধুনিক ও নিরবচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন। কিন্তু উন্নত দেশগুলোর মতো পর্যাপ্ত অর্থ ও প্রযুক্তি হিন্দুকুশ-হিমালয়ের উন্নয়নশীল দেশগুলোর হাতে সবসময় থাকে না।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো নদী ও বন্যাপ্রবণ এলাকায় অপরিকল্পিত নির্মাণ ও নগরায়ণ। এসব এলাকায় যত বেশি মানুষের বসবাস ও অবকাঠামো গড়ে উঠবে, ভবিষ্যতের কোনো হিমবাহ ধস বা আকস্মিক বন্যায় প্রাণহানির ঝুঁকিও তত বাড়বে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, পরবর্তী হিমবাহ ধস ঠিক কখন বা কোথায় ঘটবে, তা এখনো বিজ্ঞানীরা নির্দিষ্ট করে বলতে পারেন না।
তবে একটি বিষয়ে সতর্কবার্তা স্পষ্ট, হিমালয়ের বরফ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বড় ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি।
মোহন বাহাদুর চাঁদের কথায়, ‘আরও বেশি দুর্যোগ আসছে।’
হিন্দুকুশ হিমালয়ে হিমবাহ গলার হার দ্বিগুণ
হিন্দুকুশ হিমালয় (এইচকেএইচ) অঞ্চলের হিমবাহগুলো দ্রুতগতিতে গলছে। ২০০০ সালের পর থেকে এসব হিমবাহের বরফ কমার হার দ্বিগুণ হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্র (আইসিমোড) প্রকাশিত নতুন দুটি প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বিশ্ব হিমবাহ দিবস উপলক্ষে গত ২১ মার্চ প্রতিবেদন দুটি প্রকাশ করবে আইসিমোড। প্রতিবেদন দুটির নাম ‘চেঞ্জিং ডায়নামিকস অব গ্লেসিয়ার্স ইন দ্য হিন্দুকুশ হিমালয়া রিজিয়ন ফ্রম ১৯৯০ টু ২০২০’ এবং ‘এইচকেএইচ গ্লেসিয়ার আউটলুক ২০২৬: ইনসাইটস ফ্রম ৫০ ইয়ার্স অব হিমালয়ান গ্লেসিয়ার মনিটরিং’।
প্রতিবেদন দুটিতে হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহের পরিবর্তন নিয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিস্তৃত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালের পর থেকে এই অঞ্চলের হিমবাহগুলোর বরফের পুরুত্ব সর্বোচ্চ ২৭ মিটার পর্যন্ত কমেছে। এ পরিস্থিতি এশিয়ার ‘পানির টাওয়ার’ হিসেবে পরিচিত হিমবাহগুলোর ওপর নির্ভরশীল প্রায় ২০০ কোটি মানুষের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করছে।
দুই মেরু অঞ্চলের বাইরে সবচেয়ে বেশি বরফের মজুত রয়েছে হিন্দুকুশ হিমালয়ে। এ অঞ্চলে ৬৩ হাজার ৭০০টির বেশি হিমবাহ রয়েছে, যেগুলো প্রায় ৫৫ হাজার ৭৮২ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। এসব হিমবাহ থেকে এশিয়ার অন্তত ১০টি বড় নদীর উৎপত্তি হয়েছে। ফলে কোটি কোটি মানুষের খাদ্য, পানি, জ্বালানি ও জীবিকার নিরাপত্তার সঙ্গে এগুলোর সম্পর্ক রয়েছে।
তবে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে চার হাজার ৫০০ থেকে ছয় হাজার মিটার উচ্চতায় অবস্থিত হিমবাহগুলোর প্রায় ৭৮ শতাংশ উচ্চতা-নির্ভর উষ্ণায়নের ঝুঁকিতে রয়েছে।
আইসিমোডের মহাপরিচালক পেমা গিয়ামতশো বলেন, ‘এটি দূরের কোনো সমস্যা নয়, এটি আমাদের চোখের সামনে ঘটে চলা একটি সংকট। প্রতি গ্রীষ্ম ও বর্ষায় নতুন নতুন দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে। এই শতাব্দীতে বরফ গলার হার দ্বিগুণ হয়েছে, এ বিষয়টি আমাদের সবাইকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করা উচিত।’
তিনি বলেন, ‘হিন্দুকুশ হিমালয় এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। পানির অনিশ্চয়তা থেকে ভয়াবহ বন্যা, দ্রুত বাড়তে থাকা এসব প্রভাব দেখিয়ে দিচ্ছে যে হিমাঞ্চল রক্ষায় আমাদের সামনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দশক রয়েছে। এখনই হিমবাহ পর্যবেক্ষণ বাড়ানোর পাশাপাশি অভিযোজনমূলক ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করতে হবে।’
ছোট হিমবাহগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলোর মোট আয়তন প্রায় ১২ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে এসব হিমবাহের আনুমানিক বরফের মজুত কমেছে নয় শতাংশ।
আইসিমোডের রিমোট সেন্সিং বিশ্লেষক ও প্রতিবেদনটির প্রধান লেখক সুদান বিকাশ মহার্জন বলেন, ‘সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে রয়েছে অঞ্চলের ছোট হিমবাহগুলো।’
তিনি বলেন, ‘১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে হিন্দুকুশ হিমালয়ের হিমবাহগুলোর মোট আয়তন প্রায় ১২ শতাংশ কমেছে। তবে সবচেয়ে বেশি সংকুচিত হচ্ছে শূন্য দশমিক পাঁচ বর্গকিলোমিটারের কম আয়তনের ছোট হিমবাহগুলো।’
এর ফলে উঁচু পাহাড়ি এলাকার মানুষের জন্য স্থানীয়ভাবে পানির সংকট দেখা দিতে পারে। একইসঙ্গে হিমবাহের হ্রদ ভেঙে আকস্মিক বন্যা বা গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাডের (জিএলওএফ) মতো ঝুঁকিও বাড়ছে।
তিনি বলেন, ‘এই ঝুঁকি আরও বেশি উদ্বেগের কারণ, কারণ এ অঞ্চলের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ হিমবাহই এই ঝুঁকিপূর্ণ ছোট আকারের শ্রেণিতে পড়ে।’
পর্যবেক্ষণে বড় ঘাটতি
‘এইচকেএইচ গ্লেসিয়ার আউটলুক ২০২৬’ প্রতিবেদনে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে থাকা ৩৮টি হিমবাহের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ২০০০ সালের পর থেকে হিমবাহের বরফ ক্ষয়ের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এর ফলে হিমালয়ের কিছু এলাকায় হিমাঞ্চল এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যেখান থেকে হিমবাহের পশ্চাদপসরণ ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে।
তবে প্রতিবেদনে একইসঙ্গে বড় ধরনের তথ্যঘাটতির কথাও তুলে ধরা হয়েছে। পর্যবেক্ষণে থাকা ৩৮টি হিমবাহের মধ্যে মাত্র সাতটি বিশ্ব হিমবাহ পর্যবেক্ষণ সংস্থার (ডব্লিউজিএমএস) নির্ধারিত আন্তর্জাতিক মান পূরণ করে। কারাকোরাম, সিকিম, জাস্কার ও ভুটানের মতো গুরুত্বপূর্ণ হিমবাহ অঞ্চলগুলো এখনো ব্যাপকভাবে পর্যবেক্ষণের বাইরে রয়েছে।
আইসিমোডের হিমাঞ্চল বিশেষজ্ঞ ও প্রতিবেদনের অন্যতম লেখক মোহাম্মদ ফারুক আজম বলেন, ‘অসম্পূর্ণ একটি মানচিত্র হাতে নিয়ে আমরা দ্রুত পরিবর্তনশীল ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘হিমালয়ের বড় একটি অংশ এখনো পর্যবেক্ষণের বাইরে। পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিতে একক মানদণ্ড চালু করা না হলে পানির প্রবাহ ও হিমাঞ্চল-সম্পর্কিত ঝুঁকির দ্রুত পরিবর্তনগুলো বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার আগে শনাক্ত করা সম্ভব হবে না।’
নেপালের মেরা ও রিখা সাম্বা এবং ভারতের ছোট শিগরির মতো হিমবাহগুলোর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ পুরো পর্বতব্যবস্থার জন্য আগাম সতর্কতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে কাজ করবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
পূর্বাঞ্চলে বেশি আয়তন কমেছে
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, হিমবাহ গলার মাত্রা পুরো অঞ্চলে সমান নয়। পূর্ব হেংদুয়ান শান পর্বতমালায় আয়তনের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। মাত্র তিন দশকের মধ্যে কোনো কোনো এলাকায় হিমবাহের আয়তন ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
তবে মোট আয়তন কমার দিক থেকে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায়। হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলের ৭৪ শতাংশের বেশি হিমবাহ এই তিন অববাহিকায় অবস্থিত। ফলে এসব এলাকার হিমবাহ দীর্ঘমেয়াদি পানির নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১০ বর্গকিলোমিটারের বেশি আয়তনের বড় হিমবাহগুলোতে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক পানির মজুতের প্রায় ৪০ শতাংশ রয়েছে। সবচেয়ে বেশি হিমবাহ থাকা কারাকোরাম পর্বতমালায় অঞ্চলের ২৫টি বৃহত্তম হিমবাহের মধ্যে ১৮টি অবস্থিত। দীর্ঘমেয়াদে পানির সংকট, খাদ্যনিরাপত্তা ও দুর্যোগের ঝুঁকিতে থাকায় এ অঞ্চল বিশেষভাবে নাজুক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৫ সালকে আন্তর্জাতিক হিমবাহ সংরক্ষণ বর্ষ এবং ২০২৫–২০৩৪ পর্যন্ত সময়কে হিমাঞ্চলবিষয়ক বিজ্ঞানের জন্য কর্মদশকের সূচনা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে নতুন প্রতিবেদনগুলো দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করেছে।
প্রতিবেদনের লেখকেরা হিমবাহ পর্যবেক্ষণ ব্যাপকভাবে বাড়ানো, তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বড় ধরনের বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন।