১৮০ কিমি গতিতে নেমে আসে ধ্বংসের স্রোত, ১০০ কিমি দূরেও বদলে যায় নদীর গতিপথ
হিমবাহ ধসে নেপাল ও তিব্বতে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের মাত্র দুই দিন পরই নেপালে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। হিমালয়ের একটি হিমবাহের বিশাল অংশ ভেঙে পড়ার পর বরফ, পাথর ও কাদার স্রোত নদীতে নেমে এসে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। সেই ধ্বংসাবশেষে নদীর প্রবাহ আটকে তৈরি হয়েছে একটি বড় প্রাকৃতিক হ্রদ। এখন হ্রদটির পানি বাড়তে থাকায় সেটির বাঁধ ভেঙে আরেক দফা বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, এই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ৬৯১ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ প্রায় তিন হাজার মানুষ।
নেপাল জানিয়েছে, দেশটিতে কয়েকশ বিদেশিসহ দুই হাজার ৪২৬ জন মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। আর এ পর্যন্ত ৬৭৫ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে কাঠমান্ডু।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি আজ রোববার জানিয়েছে, তিব্বতে ৫৪৬ জন নিখোঁজ এবং ১৬ জনের মৃত্যুর খবর জানা গেছে। সিসিটিভি আরও জানিয়েছে, নিখোঁজদের মধ্যে ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক।
নেপালের রাসুয়া জেলায় শুক্রবার নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়। পরে অবশ্য অভিযান আবার শুরু করা হয়েছে। এরমধ্যেই নেপালে প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানবিক বিপর্যয় ঘনীভূত হচ্ছে। রেড ক্রসের তথ্য অনুযায়ী, এই দুর্যোগে নেপালের প্রায় ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
যেভাবে বিপর্যয়ের শুরু
রয়টার্স জানিয়েছে, বুধবার হিমালয়ের লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের কাছে একটি হিমবাহের বড় অংশ ভেঙে নিচে পড়ে। কয়েক দিন আগে তোলা স্যাটেলাইট ছবির সঙ্গে পরবর্তী ছবির তুলনায় হিমবাহটির বড় একটি অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বরফ ও পাথরের বিশাল স্তূপ পাহাড়ি সীমান্তঘেঁষা লেন্দে খোলা নদীর দিকে ধেয়ে যায়। সেই সঙ্গে নেমে আসে কাদা ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ। দ্রুতগতির এই স্রোত তিব্বতের গিরং বন্দর ও নেপালের দিকে আছড়ে পড়ে।
এর ফলে নদীর পানি হঠাৎ ফুলে গিয়ে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা তৈরি হয়। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ প্রকল্প ও গ্রামের পর গ্রাম পানির স্রোতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যাচাই করা ভিডিওতে সীমান্ত এলাকার অনেক মানুষকে প্রবল স্রোতে ভেসে যেতে দেখা গেছে।
চীনের সরকারি ভূতত্ত্ববিদ গুও ঝাওচেং বলেন, ‘বরফ ও পাথরের ধ্বংসাবশেষের স্রোত প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৫০ মিটার বা ঘণ্টায় প্রায় ১৮০ কিলোমিটার গতিতে নিচে নেমে আসে। ফলে মানুষজনের প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় খুবই কম ছিল। ধ্বংসাবশেষের স্রোত ২০ কিলোমিটারেরও বেশি এলাকা অতিক্রম করে।’
নদীপথে নেমে আসে ধ্বংসের স্রোত
হিমবাহ ধসের সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাতগুলোর একটি পড়ে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের গিরং বন্দরে। সিসিটিভি ফুটেজে সেখানে বন্যার ভয়াবহতা ধরা পড়ে।
স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হিমবাহ থেকে নেমে আসা ধ্বংসাবশেষের স্রোতে এলাকার প্রায় সব ভবনই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লেন্দে খোলা ও ভোতে কোশি নদীর সংযোগস্থলে চীন ও নেপালের অভিবাসন ও শুল্ক বিভাগের ভবনগুলো ছিল। একটি সেতু দিয়ে ভবনগুলো যুক্ত ছিল।
পাহাড় থেকে প্রায় চার হাজার ৫০০ মিটার নিচে নেমে আসা বন্যার পানি ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে গিয়ে নদীর গতিপথ বদলে দেয়। ভারতের সীমান্তের কাছাকাছি এলাকাতেও এর প্রভাব পড়ে।
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিআইএমওডি) জানিয়েছে, বন্যার পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পলি ও পাথর ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীতে নেমে আসে। নিচের দিকে গালছির কাছে মাত্র ৩০ মিনিটে নদীর পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার বা ৩০ ফুট বেড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
রেড ক্রস জানিয়েছে, বন্যায় পুরো গ্রাম ধ্বংস হয়ে গেছে এবং সড়ক ও সেতু নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বহু মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৬৮ বছর বয়সী কেশব প্রসাদ বারাল বলেন, ‘কাদার বিশাল স্রোত তাদের বাড়ির দিকে ধেয়ে এসেছিল। স্ত্রীকে নিয়ে ছাদে ওঠার চেষ্টা করলেও কাদার স্রোতে তার স্ত্রী ভেসে যান।’
এর মধ্যেই তৈরি হয়েছে দুটি নতুন হ্রদ
আল জাজিরা বলছে, বুধবারের বিপর্যয় শুধু বন্যা ও ভূমিধসেই শেষ হয়নি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, হিমবাহ ধসের পর ওই এলাকায় দুটি নতুন হ্রদ তৈরি হয়েছে।
একটি তৈরি হয়েছে হিমবাহের কাছাকাছি উঁচু এলাকায়। সেখানে হিমবাহ গলে আসা পানি আটকে আছে।
অন্যটি নেপালের লেন্দে নদীতে তৈরি হয়েছে। এটি আকারে বড় এবং তুলনামূলকভাবে বেশি বিপজ্জনক। বিশাল ভূমিধসে নদীর পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পানি আটকে এই হ্রদ তৈরি হয়েছে।
হ্রদটি ছোচেন খোলা ও পুরেপু সাংপো নদীর মিলনস্থলের কাছে লেন্দে নদী এলাকায় অবস্থিত। এটি ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর উজানে। এসব নদীর পানি দক্ষিণ দিকে বয়ে কাঠমান্ডুর দিকে যায়।
রাসুয়া জেলার কর্মকর্তারা শুক্রবার জানান, প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে তৈরি হওয়া হ্রদটির পানি উপচে পড়তে শুরু করেছে। নদীতেও পানির উচ্চতা বাড়ছে।
কেন এই হ্রদ এত বিপজ্জনক?
হ্রদটির পানি আটকে আছে মূলত ভূমিধসে জমে থাকা পাথর, বরফ, কাদা ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষের তৈরি একটি প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে।
এই বাঁধ শক্ত কোনো স্থায়ী কাঠামো নয়। পানি বাড়তে থাকলে বাঁধ ক্ষয়ে যেতে পারে। একপর্যায়ে বাঁধ ভেঙে গেলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পানি নিচের দিকে নেমে আরেকটি ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করতে পারে।
নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পাওয়ান ভট্টরাই বলেন, ‘এ ধরনের খাড়া উপত্যকায় বাঁধ সামান্য ভেঙে গেলেও খুব দ্রুতগতির পলি ও ধ্বংসাবশেষ বহনকারী বন্যা তৈরি হতে পারে। এতে নিচের দিকে থাকা মানুষজন সতর্ক হওয়ার খুব কম সময় পাবেন।’
চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার হ্রদটিতে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমেছিল। পরবর্তী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি সেখানে জমতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
এই পরিমাণ পানি প্রায় এক হাজার ২০০টি অলিম্পিক সুইমিং পুলের সমান।
নেপালি গবেষক ও হিমবাহজনিত বন্যা বিশেষজ্ঞ নিশেষ খাড়কা বলেন, ‘হ্রদটি হঠাৎ ভেঙে গেলে আরেক দফা বন্যা হতে পারে। পানির সঙ্গে কাদা ও পাথর নেমে এলে বন্যা আরও ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠবে। এতে নিখোঁজদের সন্ধান ও উদ্ধার অভিযান আরও কঠিন হয়ে পড়বে।’
এ ছাড়া, নদীর নিচের দিকে থাকা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেল ও স্থাপনাগুলোও ঝুঁকিতে রয়েছে। আকস্মিক বন্যা সেসব এলাকায় আঘাত হানলে শ্রমিক ও প্রকৌশলীরা আটকা পড়তে বা আহত হতে পারেন।
জলবায়ু পরিবর্তন দায়ী?
হিমবাহটি ঠিক কী কারণে ধসে পড়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। নেপালের কর্মকর্তারা প্রথমে ওই অঞ্চলে অনুভূত একটি ভূমিকম্পকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) পরে জানায়, যে কম্পনকে ভূমিকম্প মনে করা হয়েছিল, সেটি আসলে হিমবাহের বরফ ও পাথর ধসে পড়ার সময় সৃষ্ট ভূকম্পনজনিত শক্তি।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরাসরি এই ঘটনাকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘটেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। একইসঙ্গে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও হিমবাহ গলে যাওয়ার কারণে পাহাড়ি এলাকার স্থিতিশীলতা কমে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আর্থ সায়েন্সেস নিউজিল্যান্ডের প্রধান বিজ্ঞানী সাইমন কক্স বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের বরফ ও পাথরের স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করছে। এতে হিমবাহ ধস ও ধারাবাহিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।’
তাপমাত্রা বাড়লে খাড়া পাহাড়ি ঢালে বরফের সহায়ক শক্তি কমে যায়। পাশাপাশি বরফ গলা পানি বাড়ে এবং বরফ জমা, গলা ও বৃষ্টিপাতের ধরনেও পরিবর্তন আসে। এসব কারণে কোনো কোনো এলাকায় পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে বড় ধরনের ধসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এখন কী করা হচ্ছে?
চীন হ্রদটির পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আট সদস্যের একটি প্রকৌশল দল মোতায়েন করেছে। দলটি আকাশপথে জরিপ ও ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরির কাজ করছে।
তবে দুর্গম ও খাড়া ভূখণ্ডের কারণে সেখানে পৌঁছানো কঠিন। হ্রদের পানি নিরাপদভাবে কমানোর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব কি না, সেটিও এখনো স্পষ্ট নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক এই প্রক্রিয়া পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে স্যাটেলাইট ও ড্রোনের মাধ্যমে নিয়মিত নজরদারি, নদীর পানির উচ্চতা পর্যবেক্ষণ, হ্রদের পানি নিরাপদভাবে কমানোর সম্ভাবনা যাচাই, আগাম সতর্কবার্তা এবং সময়মতো মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো যেতে পারে।
রাসুয়া জেলায় হ্রদের পানি উপচে পড়ার পর শুক্রবার উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হলেও পরে তা আবার শুরু হয়। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, হ্রদটির পানি উপচে পড়ার ঝুঁকি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণযোগ্য।
এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, বন্যায় নেপালের ছয়টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আটজন স্বাস্থ্যকর্মী নিখোঁজ রয়েছেন।
নেপাল জানিয়েছে, আপাতত বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই। দেশটির নিরাপত্তা সংস্থাগুলোই অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছে।
হিমালয়ে এমন বিপর্যয় নতুন নয়
হিমবাহ ধস ও হিমবাহের হ্রদ ভেঙে আকস্মিক বন্যার ঘটনা হিমালয়ে এর আগেও ঘটেছে।
২০১২ সালে নেপালের সেতি নদীর ভয়াবহ বন্যায় পাথরধস, সাময়িকভাবে নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বরফ-পাথরের ধস মিলিত হয়ে বড় ধরনের বিপর্যয় তৈরি করেছিল।
২০১৬ সালের জুলাইয়ে তিব্বতের আরু পর্বতমালায় একটি হিমবাহের অংশ ভেঙে প্রায় ছয় কোটি ৮০ লাখ ঘনমিটার বরফ পাহাড় থেকে নিচে নেমে যায়। এতে নয়জন পশুপালক ও শত শত প্রাণী মারা যায়। দুই মাস পর কাছের আরেকটি হিমবাহ ধসে প্রায় আট কোটি ৩০ লাখ ঘনমিটার বরফ নিচে নেমে যায়।
২০২২ সালের নভেম্বরে চীনের ছিংহাই প্রদেশে বুকাদাবান ফেং হিমবাহ থেকে প্রায় চার কোটি ঘনমিটার বরফ বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি হ্রদে আছড়ে পড়ে। এতে প্রায় ১৩ মিটার বা ৪২ ফুট উঁচু ঢেউ তৈরি হয়েছিল।
উত্তর পাকিস্তানেও এ ধরনের বন্যা ঘটেছে। ২০২২ সালের মে মাসে হুনজা উপত্যকার হাসানাবাদ এলাকায় শিষপার হিমবাহের কারণে তৈরি বরফের বাঁধে আটকে থাকা একটি হ্রদ হঠাৎ ভেঙে বন্যা সৃষ্টি করেছিল।
নেপালের এবারের পরিস্থিতিতে তাই বুধবারের বিপর্যয়ই শেষ নয়। বরং হিমবাহ ধসে তৈরি হওয়া নতুন হ্রদের পানির উচ্চতা বাড়তে থাকায় দুর্গত এলাকায় এখন নতুন করে অপেক্ষা করছে আরেকটি সম্ভাব্য বিপর্যয়।
