কৃষি জমিতে লবণ ব্যবহারে উর্বরতা হারাচ্ছে মাটি
অধিক ফলনের আশায় কৃষি জমিতে রাসায়নিক সারের সঙ্গে লবণ মিশিয়ে ব্যবহার করছেন নাটোরের কিছু কৃষক। ফলে জমির উর্বরা শক্তি নষ্ট হওয়াসহ দীর্ঘ মেয়াদী ক্ষতির মুখে পড়ছে কৃষি জমি।
অন্যের জমি লিজ নিয়ে আবাদ করা কৃষকদের মধ্যে লবণ প্রয়োগের এই প্রবণতা বেশি দেখা গেছে বলে দাবি কৃষি বিভাগের।
তবে আবাদি জমিতে লবণ ব্যবহার না করতে কৃষি বিভাগ সচেতনতামূলক তেমন কোনো পদক্ষেপও নিচ্ছে না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি বছর নাটোরে ৬০ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে ধান, ২৩ হাজার ৮৫২ হেক্টর জমিতে গম, ৪ হাজার ৭৫৬ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ ও ২১ হাজার ৯৭০ হেক্টর জমিতে রসুনসহ অন্যান্য ফসলের আবাদ হয়েছে। এসব ফসল চাষে বেশিরভাগ জমিতেই কৃষকরা লবণ ব্যবহার করেছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে আরও জানা গেছে, নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার হালতি বিলসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিবছর সাড়ে ৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান ও ২ হাজার ৬৪০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ-রসুনের চাষ হয়। এসব ফসল চাষে কৃষকরা রাসায়নিক সারের সঙ্গে ব্যাপকহারে আয়োডিনযুক্ত লবণ প্রয়োগ করে।
জমিতে লবণ দেওয়ার বিষয়ে নলডাঙ্গা উপজেলার শেখপাড়া গ্রামের কৃষক আখতারুজ্জামান রেন্টু দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, জমিতে লবণ দিলে মাটির উর্বরা শক্তি নষ্ট হয় তা তিনি জানেন।
কৃষকরা জেনে বুঝেই জমিতে লবণ প্রয়োগ করছে দাবি করে তিনি বলেন, 'লবণ না দিলে ফসল একেবারেই কম হয়, তাই কৃষকরা এ কাজ করছে।'
একই উপজেলার মাধবপুর গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'জমিতে লবণ দিলে ফসলের ফলন বেশি হয় এবং গাছ তরতাজা থাকে। পাশাপাশি রাসায়নিক সার ও কীটনাশক কম লাগে। এ সব কারণে তারা জমিতে লবণ প্রয়োগ করছে। তবে ফসলের অধিক ফলনের আশায় জমিতে সারের সঙ্গে লবণ প্রয়োগ করার প্রবণতা শুধু বর্গাচাষী ও জমি লিজগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে দেখা যায়। নিজের জমিতে কোন কৃষক লবণ প্রয়োগ করেন না।'
নলডাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফৌজিয়া ফেরদৌস দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'অসাধু কিছু কৃষক অধিক ফলনের লোভে পেঁয়াজের জমিতে লবণ প্রয়োগ করে। আমরা মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি, তারা যেন জমির গুণগত মান ঠিক রাখতে লবণ প্রয়োগ না করেন। লবণ দিলে কৃষকের শুধু নিজের জমির ক্ষতি হচ্ছে এটাই নয়, পাশাপাশি দেশের জন্য বড় ক্ষতি হচ্ছে।'
কৃষি বিভাগ এসব বিষয়ে জনসচেতনা সৃষ্টিতে কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'নলডাঙ্গা উপজেলায় মোট ১৪ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে ধান, গম, পেঁয়াজ ও রসুনসহ বিভিন্ন ফসলের চাষাবাদ হয়। তবে লবণ ব্যবহারী কৃষকের সংখ্যা বেশি নয়।'
নলডাঙ্গা শহীদ নজমুল হক সরকারি কলেজের প্রভাষক কৃষিবিদ সুপেন্দ্রনাথ বিশ্বাস দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ফসলি জমিতে খাবার লবণ ব্যবহার গুরুতর অপরাধ। লবণ সোডিয়াম ক্লোরিন দ্বারা গঠিত। মাটিতে সোডিয়াম ক্লোরিনের পরিমাণ বেড়ে গেলে মাটির গুণাগুণ নষ্ট হয়। জমিতে লবণ দিলে সাময়িক ভালো ফল পাওয়া গেলেও স্থায়ীভাবে উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাবে। তাই কোনোভাবে খাওয়ার লবণ জমিতে প্রয়োগ করা ঠিক না।'
এদিকে নাটোরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মাহমাদুল ফারুক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'লবণ ব্যবহারের ফলে ফসলের শেকড়ের কচি মুখ পুড়ে যাওয়ায় গাছের শেকড়ের বিস্তার কমে যায় এবং ফসল হলুদ হয়ে যায়। এ ছাড়া জমিতে লবণ দিলে মাটির গঠন ভেঙে যায়, যার ফলে মাটিতে সঠিক মাত্রায় পানি ও বাতাস থাকতে পারে না এবং গাছের শেকড় সহজে পানি গ্রহণ করতে পারে না।'