নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের ব্যাখ্যায় নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য

‘প্রধানমন্ত্রী নিজেও ভার্চুয়ালি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ভোট চেয়েছেন, সেটার কী হবে?’

নিজস্ব সংবাদদাতা, নাটোর

নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে মেয়র প্রার্থীর পক্ষে মতবিনিময় সভায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল কুদ্দুস বলেছেন, 'নির্বাচন কমিশন থেকে লোক এসে আমাকে আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে চিঠি দিয়ে গেছেন। আমি তাদের বলেছি, প্রধানমন্ত্রী নিজেও ভার্চুয়ালি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ভোট চেয়েছেন। সেটার কী হবে?'

আজ বুধবার দুপুরে আওয়ামী লীগের নাটোর পৌর শাখা আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় অংশ নিয়ে তিনি এমন মন্তব্য করেন।

সভায় তিনি নাটোর পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী উমা চৌধুরী জলির পক্ষে কাজ করার নির্দেশনা দেন। আগামী ১৬ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

সভায় আব্দুল কুদ্দুস বলেন, 'আমাকে ২৭ তারিখ সন্ধ্যা ৯টা ২০ মিনিটে এক চিঠি পাঠিয়েছে। আমি নাকি সেই দিন বক্তৃতা দিয়ে আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছি। আমাদের নির্বাচন কমিশনের সচিব (ঢাকার) হুমায়ন কবীর খন্দকার, উনার সঙ্গে আমি সরাসরি কথা বলেছি। আমি বলেছি, ঠিক আছে বলেছেন, করেছি। কিন্তু আমার একটা জবাব দিতে পারবেন কি? ৫-৬ দিন আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের নেত্রী যখন মালদ্বীপে যান, তার আগের দিন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন কেন্দ্রীক নারায়ণগঞ্জের সমস্ত নেতা-কর্মীরা কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের হলঘরে সভা করেছেন। সেইখানে গণভবন থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ভার্চুয়ালি। যে, ''আইভীকে আমি নৌকা দিয়েছি। আইভীর জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে আইভীকে জয়যুক্ত করা তোমাদের দায়িত্ব।'' তাহলে এইখানে মাননীয় নির্বাচন কমিশন সচিব মহোদয় আপনারা কী বলবেন, এখানে নির্বাচনী আচরণবিধি ভায়োলেট হয়েছে কি না? উনি বলেছেন, ''স্যার এতদূর তো চিন্তা করি নাই!'''

আব্দুল কুদ্দুস বলেন, 'আমি আরেকটি কথা বলেছি, আমার জেলা আওয়ামী লীগের অফিস, আমার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের অফিস, আমার থানা আওয়ামী লীগের অফিসে, থানা আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটি, জেলা আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটি সভা করতে পারব না। এটা কেমন কথা হলো? উনি (হুমায়ন কবীর খন্দকার) বললেন, ''স্যার আমরা দিছি দিছি, আপনারা একটু চেপে চলেন।'' তো চেপেই চলব, আল্লাহ যদি বাঁচায় রাখে চেপেই চলবনি!'

নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল কুদ্দুস দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, '২৭ তারিখে নির্বাচন কমিশন থেকে লোক এসে আমাকে আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে চিঠি দিয়ে গেছেন। আমি তাদের বলেছি, প্রধানমন্ত্রী নিজেও ভার্চুয়ালি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ভোট চেয়েছেন। সেটার কী হবে? উনারা উত্তর দিতে পারেননি।'

268103491_321610286347674_290487319743833597_n.jpg
নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুল। ছবি: স্টার

আব্দুল কুদ্দুস ছাড়াও নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুল ও নাটোর-নওগাঁ আসনের সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য রত্না আহমেদও নির্বাচনী আচরণ বিধি লঙ্ঘন করে সভা করেছেন। তবে, শফিকুল ইসলাম নৌকার পক্ষে ভোট চাইলও রত্না আহমেদ কোনো বক্তব্য দেননি।

শফিকুল ইসলাম শিমুল বলেন, 'অনেক মিডিয়ার ভাইয়েরা আমাদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করছেন, আমরা আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছি। আমরা আমাদের পার্টি অফিসে বসে আছি, আমরা আমাদের দলীয় নেতা-কর্মীদের নৌকার পক্ষে ভোট দিতে বলেছি এটা আচরণবিধি লঙ্ঘনের মধ্যে পড়ে না। আপনারা যেভাবে খুশি লেখেন, তাতে আমাদের কিছু যায়-আসে না! আমরা যদি ঐক্যবদ্ধভাবে নৌকার পক্ষে কাজ করি, নৌকার মেয়র প্রার্থী উমা চৌধুরী জলি কোনোভাবে হারতে পারেন না! কিন্তু আমরা মুখে বলি এক, অন্তরে বলি আর এক। সবাই যদি একসঙ্গে কাজ করি তাহলে নৌকার জয় হবেই ইনশাল্লাহ।'

267069007_1110927426315041_5055086888947710400_n.jpg
ছবি: স্টার

আচরণবিধি লঙ্ঘন করে নির্বাচনী সভায় উপস্থিত থাকা বিষয়ে জানতে চাইলে রত্না আহমেদ ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমাদের দলের বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল আমাদের ডেকেছেন, আমরা গিয়েছি। এটা নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন হলে তিনি আমাদের ডাকতেন না।'

আওয়ামী লীগের রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেনকে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'দলীয় কার্যালয়ে সভা করলে বা ভোট চাইলে আচরণবিধি লঙ্ঘন হবে না।'

এ বিষয়ে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও নাটোর পৌরসভা নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার মো. আছলাম ডেইলি স্টারকে বলেন, 'সংসদ সদস্য আব্দুল কুদ্দুস বার বার নাটোর পৌর নির্বাচন এবং গুরুদাসপুর উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন। আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে সংসদ সদস্য আব্দুল কুদ্দুস ও শফিকুল ইসলাম শিমুলকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সংসদ সদস্য রত্না আহমেদকেও চিঠি দেওয়া হবে।'

মো. আছলাম আরও বলেন, 'সংসদ সদস্যরা যেহেতু উচ্চ পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি। সে কারণে আমাদের পক্ষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়। সংসদ সদস্যদের আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। কমিশন চাইলে ব্যবস্থা নিতে পারে।'

সংসদ সদস্যদের আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) নাটোর জেলা কমিটির সভাপতি খগেন্দ্রনাথ রায় ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে চিঠি পাওয়ার পরও যদি আইন প্রণেতারা তা না মানেন, তবে সেটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সভ্যতার সবচে বড় কথা হলো আইন। আইন প্রণেতারা যদি আইন লঙ্ঘন করেন, তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।'