এক্সপ্লেইনার

ট্রাম্পকে সরাতে ‘২৫তম সংশোধনী’ কি তবে শেষ অস্ত্র?

ফাহিমা কানিজ লাভা
ফাহিমা কানিজ লাভা

গত ৭ এপ্রিল ইরানকে উদ্দেশ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তেহরান দাবি না মানলে ‘পুরো একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে’। এরপর তাকে ‘অযোগ্য, অসুস্থ ও উন্মাদ’ বলে বসেন কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন এনএএসিপির প্রেসিডেন্ট ডেরিক জনসন।

ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এসব লাগামহীন বক্তব্য কেবল তার মানসিক সুস্থতা নিয়েই প্রশ্ন তোলেনি, বরং বিশ্বশান্তির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি হিসেবে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। 

ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা, বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলার হুমকি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের যাচ্ছেতাই বক্তব্যের কারণে খোদ ওয়াশিংটনেই তাকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে। রাজনীতির মাঠ ছাড়িয়ে আলোচনা এখন ঠেকেছে সংবিধানের ধারা-উপধারা বিশ্লেষণে।

মার্কিন আইনপ্রণেতারা এখন যে আইনি অস্ত্রের কথা বারবার বলছেন, তা হলো দেশটির সংবিধানের ‘২৫তম সংশোধনী’। কিন্তু কী এই আইন? এটি প্রয়োগ করে কি সত্যিই একজন প্রেসিডেন্টকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ও নির্দিষ্ট মেয়াদের আগেই ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব?

মার্কিন সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী কী?

মার্কিন সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী ১৯৬৭ সালে অনুমোদিত হয়। মূলত ১৯৬৩ সালে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রপ্রধানের উত্তরাধিকার নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা দূর করতেই এই আইন আনা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল—যদি কোনো প্রেসিডেন্ট মৃত্যু, পদত্যাগ বা শারীরিক-মানসিক অসুস্থতার কারণে দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে পড়েন, তবে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া কী হবে তা সুনির্দিষ্ট করা।

এই সংশোধনীর চারটি ধারা রয়েছে। প্রথম তিনটি ধারা মূলত প্রেসিডেন্টের মৃত্যু বা স্বেচ্ছায় ক্ষমতা হস্তান্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আলোচনায় আসছে সবচেয়ে কঠোর ‘চতুর্থ ধারা’।

চতুর্থ ধারা: অনিচ্ছুক প্রেসিডেন্টকে সরানোর পথ

২৫তম সংশোধনীর চতুর্থ ধারা অনুযায়ী, যদি প্রেসিডেন্ট নিজে পদত্যাগ করতে রাজি না হন, কিন্তু তিনি দেশ চালানোর জন্য ‘অযোগ্য’ বা ‘অক্ষম’ বলে বিবেচিত হন, তবে তাকে সরানো যেতে পারে। তবে এর প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল।

ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রিসভার (ক্যাবিনেট) সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের একমত হতে হবে যে, প্রেসিডেন্ট তার দায়িত্ব পালনে শারীরিক বা মানসিকভাবে অক্ষম। তারা যদি যৌথভাবে কংগ্রেসের কাছে লিখিতভাবে এই ঘোষণা দেন, তবে তাৎক্ষণিকভাবে ভাইস প্রেসিডেন্ট ‘ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট’ বা ‘অ্যাক্টিং প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।

প্রেসিডেন্ট যদি দাবি করেন যে তিনি সুস্থ ও সক্ষম, তবে তিনি ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রিসভা যদি চারদিনের মধ্যে এর বিরোধিতা করেন, তাহলে বিষয়টি সুরাহার জন্য কংগ্রেসে পাঠাতে হবে।

কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ (সিনেট) ও নিম্নকক্ষ (সিনেট)—উভয় স্থানেই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে যদি প্রেসিডেন্টের ‘অক্ষমতা’ প্রমাণিত হয়, তবেই তিনি স্থায়ীভাবে পদ হারাবেন। 

অভিশংসন ও ২৫তম সংশোধনীর পার্থক্য

অনেকেই অভিশংসনকে (ইমপিচমেন্ট) ২৫তম সংশোধনীর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। দুটির লক্ষ্য এক হলেও প্রক্রিয়া ভিন্ন।

অভিশংসন হলো একটি দীর্ঘ আইনি ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। এটি কংগ্রেসের হাতে থাকে। এখানে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অপরাধ (যেমন ক্ষমতার অপব্যবহার বা দেশদ্রোহিতা) প্রমাণ করতে হয়।

এর আগে ২০১৯ সালে হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দুটি অভিযোগে অভিশংসনের প্রক্রিয়া চালানো হয়েছিল—ক্ষমতার অপব্যবহার ও কংগ্রেসের কাজে বাধাদান। কিন্তু রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত সিনেটে তিনি অব্যাহতি পান।

অন্যদিকে ২৫তম সংশোধনী কোনো দণ্ড বা শাস্তি নয়, বরং জরুরি পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র পরিচালনার নিরবচ্ছিন্নতা রক্ষার একটি উপায়। এখানে কোনো অপরাধের প্রয়োজন নেই, কেবল প্রেসিডেন্ট ‘অক্ষম’ প্রমাণিত হলেই তাকে সরানো যায়। মন্ত্রিসভা যদি মনে করে প্রেসিডেন্টের মানসিক অবস্থা বা আচরণ দেশের জন্য হুমকি, তবে তারা দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারে।

ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এটি প্রয়োগ করা কতটা কঠিন?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ২৫তম সংশোধনী প্রয়োগ করা ‘প্রায় অসম্ভব’ কাজ। কারণ ভাইস প্রেসিডেন্টের সক্রিয় সমর্থন ছাড়া এই প্রক্রিয়া শুরুই করা যাবে না।

বর্তমান প্রশাসনের অধিকাংশ মন্ত্রীই প্রেসিডেন্টের অনুগত। তারা নিজেদের নেতার বিরুদ্ধে এমন ‘বিদ্রোহে’ অংশ নেবেন কি না, তা বড় প্রশ্ন।

তাছাড়া, ডোনাল্ড ট্রাম্প শারীরিক বা মানসিকভাবে অসুস্থ—চিকিৎসকরা এমন কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি। বিরোধীরা তার কথাবার্তাকে ‘উন্মাদের মতো’ বললেও একে রাজনৈতিক বা আইনিভাবে ‘অক্ষমতা’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। 

কেন এখন এই দাবি উঠছে?

সাম্প্রতিক সময়ে ইরানে হামলা এবং ট্রাম্পের ‘সভ্যতা ধ্বংসের’ হুমকিতে ভীত হয়ে পড়েছেন অনেক রাজনীতিক। বার্নি স্যান্ডার্স, চাক শুমার, ইলহান ওমরের মতো আইনপ্রণেতারা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই ‘অস্থির ও বিপজ্জনক আচরণ’ মার্কিন গণতন্ত্র ও বিশ্বশান্তির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টকে এই চতুর্থ ধারার মাধ্যমে জোর করে সরানো যায়নি। এর আগে ২০০২ ও ২০০৭ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ স্বাস্থ্যগত কারণে ২৫তম সংবিধান সংশোধনীর ৩ ধারা অনুসারে ক্ষমতা ভাইস প্রেসিডেন্টের কাছে সাময়িকভাবে হস্তান্তর করেছিলেন। রোনাল্ড রিগানও একবার স্বেচ্ছায় ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন।

তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ট্রাম্পকে ২৫তম সংশোধনীর চতুর্থ ধারায় সরানো যাবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।