বৈষম্যমূলক আচরণকে ‘দণ্ডনীয় অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করার আহ্বান
বৈষম্যমূলক আচরণ থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে এ ধরনের আচরণকে 'দণ্ডনীয় অপরাধ' হিসেবে গণ্য করার আহ্বান জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাদের মতে কোনো আইনে ক্রিমিনাল প্রভিশন না থাকলে, তা প্রকৃতপক্ষে কোনো আইনে পরিণত হয় না।
প্রস্তাবিত বৈষম্যবিরোধী আইনের উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়ে আজ রোববার মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) আয়োজিত এক ওয়েবিনারে এসব কথা বলেছেন বক্তারা।
এমজেএফ এর নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম ওয়েবিনারে বলেন, 'মানুষের মনোজগতে ও দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনা না গেলে, আইন করেও কোনো লাভ হবে না। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সামাজিক সম্প্রীতি সৃষ্টি করা।'
'আইনের মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষ যেন বিচার পায়, সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। আমাদের লক্ষ্য মানুষকে ক্ষমতায়িত করার ক্ষেত্রে এই আইন কতটা যেতে পারে, তা দেখা,' যোগ করেন তিনি।
শাহীন আনাম আরও বলেন, 'ভুক্তভোগী মানুষ যদি সরাসরি আদালতে শরণাপন্ন হতে না পারেন, তাহলে এ ধরনের আইন কতটা দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত মানুষের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে, এ ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ থাকবে। প্রকারান্তরে এটি আইনের আশ্রয় লাভের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা।'
ওয়েবিনারে অংশ নেন এ আইনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইন প্রণেতা, বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ।
এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটির সভা প্রধান শহীদুজ্জামান সরকার।
তিনি এ ওয়েবিনারে উঠে আসা সব সুপারিশ স্ট্যান্ডিং কমিটির কাছে পাঠানোর অনুরোধ করেছেন।
ওয়েবিনারে বক্তারা বলেন, প্রস্তাবিত আইনে বৈষম্যমূলক আচরণের ফলে ফৌজদারি প্রতিকারের কোনো বিধান রাখা হয়নি। এতে আইনের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।
নাগরিক সমাজ, আইন কমিশন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের বৈষম্য বিরোধী আইনের খসড়ায় বৈষম্যমূলক আচরণকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বিবেচনা করা হয়েছে এবং ভুক্তভোগীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছিল।
কিন্তু সম্প্রতি জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত বিলে শাস্তির কোনো বিধান রাখা হয়নি বলে উল্লেখ করেন বক্তারা।
তারা বলেন, 'যদিও প্রস্তাবিত বৈষম্য বিরোধী আইনে স্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে যে কোনো অজুহাতেই কারো প্রতি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো বৈষম্য করা যাবে না, তথাপি কয়েকটি বিষয়ে আরও সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন।'
এ ক্ষেত্রে তারা হিজরা, তৃতীয় লিঙ্গ বা ট্রান্সজেন্ডার কমিউনিটি এবং দলিত জনগোষ্ঠী শব্দের সংজ্ঞা ও তফসিল থাকার কথা উল্লেখ করেন।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে দলিত নেতা মিলন বিশ্বাস বলেন, 'উপযুক্ত কারণ ছাড়া পিতৃ বা মাতৃ পরিচয় প্রদানে অসমর্থতার কারণে কোনো শিশুকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করতে অস্বীকৃতি, অমত বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি বা বাধা প্রদান করা যাবে না' বলে আইনে যা বলা হয়েছে। এগুলো সুনির্দিষ্ট করতে হবে।
তিনি বলেন, 'কোন কোন কারণে শিশুকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করতে অস্বীকৃতি জানানো যাবে বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যাবে, তা সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। নয়তো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ কখনোই শিক্ষায় সমান সুযোগ পাবে না।'
এসডিজি প্ল্যাটফর্মের আহবায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, 'অনেকেই বলেন আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে। কিন্তু আমি বলতে চাই আইন তখনই কার্যকর হয়, যখন রাজনৈতিক ইচ্ছা দৃশ্যমান হয়, দক্ষ প্রশাসন থাকে এবং নাগরিকদের পক্ষ থেকে সক্রিয় মনিটরিং করা হয়।'
তিনি বলেন, 'আইনে বৈষম্যের তালিকাটি আরও প্রসারিত ও সামগ্রিক করতে হবে।'
ওয়েবিনারে চাকমা সার্কেলের চিফ রাজা দেবাশীষ বলেন, 'আইনটিতে আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। আন্তর্জাতিক শ্রম আইন কনভেনশনের ১০৭ ও ১১১ ধারা অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।'
সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারি বলেন, 'এই খসড়া আইনটি আমার কাছে খানিকটা অপেশাদার বলে মনে হয়েছে। মনিটরিং কমিশন নিয়েও আমি সন্দেহ পোষণ করছি। কারণ এখানে সব শ্রেণি-পেশার লোকের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়নি। এছাড়া আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় নাই। এটা একটা কাঠামোগত ত্রুটি। ফলে বিচারের জন্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষদের ছুটে বেড়াতে হবে।'
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রংও একটি শক্তিশালী মনিটরিং কমিটি গঠনের কথা বলেন।
নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী প্রধান জাকির হোসেন বলেন, 'যে খসড়া আইনটি প্রথমে প্রণয়ন করা হয়েছিল, সেখানে "বৈষম্য বিলোপ বা নিরসন" কথাটি ছিল। এখন বলা হচ্ছে "বৈষম্য বিরোধী আইন"। এই সংজ্ঞাটি স্পষ্ট হওয়া দরকার।'
যৌনকর্মী নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে বলা হয়, তাদের শিশুরা মায়ের পেশার কারণে মূলধারার স্কুলে পড়ার সুযোগ পায় না। আইন প্রণয়ন বিষয়ক কমিটিতে যৌনকর্মীদের প্রতিনিধিত্ব নাই।
একই অভিযোগ এসেছে হিজড়া, তৃতীয় লিঙ্গ বা ট্রান্সজেন্ডার কমিউনিটির পক্ষ থেকে।
আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে কোন বৈধ পেশা বা চাকরি গ্রহণ বা বৈধ ব্যবসা পরিচালনায় নিষিদ্ধ করা যাবে না। তাহলে যৌনকর্মীর পেশা বা ব্যবসা কেন অবৈধ বলে গণ্য হবে, তা সুনির্দিষ্ট করতে হবে বলে উল্লেখ করেন বক্তারা।
বেসরকারি সংস্থা ব্লাস্টের পক্ষ থেকে ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, 'সেবা প্রাপ্তিতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের শিকার হয়। যেমন, শিক্ষা, চিকিৎসা, চাকরি ইত্যাদি ক্ষেত্রে। বৈষম্যের সংজ্ঞাকে আরও ব্যাপকভাবে দেখতে হবে। এর কারণ ও মনিটরিং কমিটির কার্যপরিধি নিয়ে ভাবতে হবে।'
রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক মেঘনা গুহ ঠাকুরতাও এই আইনের পরিধি বাড়ানোর উপর গুরুত্ব দেন।
এমজেএফ বৈষম্য বিরোধী আইনের খসড়া প্রণয়নের সঙ্গে ২০০৮ সাল থেকে জড়িত। পাশাপাশি রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস বাংলাদেশ, নাগরিক উদ্যোগ, বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদ, আদিবাসী ফোরাম, ব্লাস্টসহ ১৫টি অধিকার সংগঠন এ আইনটি নিয়ে কাজ করে আসছে।