রাস্তা পার হতে গেলেই দুর্ঘটনা ঘটে, দৌড় দিয়ে পার হবেন না: প্রধানমন্ত্রী
সড়ক দুর্ঘটনার রোধে পথচারীদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, যেখান-সেখান দিয়ে দৌড় দিয়ে রাস্তা পার হবেন না। রাস্তা পার হতে গেলেই দুর্ঘটনা ঘটে। সে ব্যাপারেও সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। প্রতিটি জায়গায় ফুটওভার ব্রিজ করা আছে, আন্ডার পাস আমরা করে দিচ্ছি।
আজ বুধবার দুপুরে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন স্থানে নবনির্মিত কয়েকটি সড়ক ও সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি এ কথা বলেন।
রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে মহাসড়ক নিরাপদ ও যানজটমুক্ত রাখতে আওয়ামী লীগ সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকার যানজট নিরসনে মেট্রোরেল, বাস র্যাপিড ট্রানজিট প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল, কমিউটার ট্রেন, ভূ-গর্ভস্থ টানেল, ঢাকা শহরের চারদিকে রিং রোড, সার্কুলার রেল লাইন এবং ওয়াটারওয়ে নির্মাণসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হলে রাজধানীবাসী নিরাপদে ও দ্রুত সময়ে যাতায়াত করতে পারবে। কাজের জন্য রাজধানীতেই থাকতে হবে তা না। ঢাকার বাইরে থেকেও সময় মতো এসে কাজ করে আবার নিজ জায়গায় ফেরত যেতে পারবে।
তিনি আরও বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ ২০১০ সাল থেকে ২০১২ সালে জাতীয় মহাসড়কে ২০৯টি দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করে ব্ল্যাক স্পটগুলোতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পরবর্তীকালে জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে আরও ২৫২টি ব্ল্যাক স্পট চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ১৭২টি ব্ল্যাক স্পটে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং অবশিষ্ট ৮০টি ব্ল্যাক স্পট উন্নয়ন করা হবে। এর ফলে ওই সড়কে দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে।
আমাদের দেশে একটা প্রবণতা আছে কোনো একটা অ্যাক্সিডেন্ট হলেই সবার আগে গাড়ির ড্রাইভারকে ধরে পেটানো হয়। এমনকি গণপিটুনি দিয়ে মেরেই ফেলা হয়। হত্যাই করা হয়। সবার কাছে অনুরোধ থাকবে, যখন একটা দুর্ঘটনা ঘটে, সেই দুর্ঘটনা কেন ঘটলো, কী কারণে ঘটলো এবং কার দোষে ঘটলো সেটা বিবেচ্য বিষয়। সেটা খুঁজে দেখা দরকার, বলেন প্রধানমন্ত্রী।
পথচারীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ট্রাফিক রুল সম্পর্কে সবার জ্ঞান থাকা এবং মেনে চলা দরকার। ট্রাফিক রুল সবাই মেনে চলবেন। মোবাইল ফোন কানে নিয়ে কথা বলতে বলতে সড়ক দিয়ে চলা বা রেললাইনের পাশ দিয়ে হাঁটা—এটা কখনো কেউ করবেন না। এটা বন্ধ করতে হবে। যেখান-সেখান দিয়ে দৌড় দিয়ে রাস্তা পার হবেন না। রাস্তা পার হতে গেলেই দুর্ঘটনা ঘটে। সে ব্যাপারেও সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। প্রতিটি জায়গায় ফুটওভার ব্রিজ করা আছে, আন্ডার পাস আমরা করে দিচ্ছি। একটা দুর্ঘটনা হলে সেখানে যখন পুলিশ যায় অবশ্যই এটা দেখবে দোষটা কার। প্রায়ই ছাত্ররা মারা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, কানে মোবাইল ফোন নিয়ে কথা বলতে বলতে চলছে অথবা রাস্তা ছেড়ে দিয়ে মাঝখান দিয়ে হাঁটা শুরু করেছে। যখন একটা যানবাহন চলাচল করে এই যানবাহনের পক্ষে সঙ্গে সঙ্গে ব্রেক কষা সম্ভব হয় না। এটা যান্ত্রিক বিষয়।
চালকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমরা জানি চালকরা দীর্ঘ সময় গাড়ি চালালে অনেক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। অনেক সময় ঝিমিয়ে পড়ে। সে জন্য আমরা হাইওয়েগুলোর পাশে চালক ও যাত্রীদের জন্য বিশ্রামের ব্যবস্থা আমরা নিচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরও বলেন, আমাদের সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় ঢাকা-এয়ারপোর্ট মহাসড়কে শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ সংলগ্ন পথচারী আন্ডার পাস নির্মাণ প্রকল্পের দায়িত্ব নিয়েছিল, আমরা এই আন্ডার পাস নির্মাণের দায়িত্ব দিয়েছিলাম সেনা বাহিনীর হাতে। তার কারণ ছিল ২০১৯ সালের ২৯ জুলাই শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের কাছে দুজন শিক্ষার্থী প্রাণ হারায়। আমি তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। এই দুর্ঘটনার পরপরই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এখানে একটি আন্ডার পাস নির্মাণ করা হবে। আজ সেই আন্ডার পাস উদ্বোধন করছি। এখানে হাজার হাজার পথচারী-শিক্ষার্থীরা চলাচল করে। এই রাস্তাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং যথেষ্ট চওড়া রাস্তা। আমি মনে করি, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই আন্ডার পাস বিশাল ভূমিকা রাখবে। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ও বয়স্ক মানুষের কথা বিবেচনায় এনে লিফটের ব্যবস্থা করা আছে, র্যাম্প করা আছে এবং চলন্ত সিঁড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই আন্ডার পাস নির্মাণের ফলে একদিকে যেমন শিক্ষার্থী ও পথচারীর সড়ক পারপার নিরাপদ হবে, অন্যদিকে এয়ারপোর্ট মহসড়কের এ অংশ যানজট মুক্ত থাকবে।
কক্সবাজার আমাদের পর্যটন নগরী, পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ বালুময় সৈকত এখানে উপস্থিত। এই অঞ্চলটার উন্নয়ন আমাদের একান্তভাবে অপরিহার্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় ২ দশক অশান্ত পরিবেশ ছিল। আমি সরকার গঠন করার পরে ৯৬ সালে এখানে শান্তি চুক্তি করি। শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন একটা প্রতিশ্রুতি। আমরা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। এশিয়ান হাইওয়ে, এশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গেও বাংলাদেশকে আমরা সংযুক্ত করতে চাচ্ছি। আমি মনে করি, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের লক্ষ্যে আমরা যে কাজ করে যাচ্ছি তারই অংশ হিসেবে কক্সবাজারের বালুখালী থেকে বান্দরবানের ঘুমধুম সীমান্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। এই সড়কটি এশিয়ান হাইওয়ের একটি অংশ হিসেবে প্রস্তাবিত। তাই আন্তর্জাতিক এই সড়কটি অন্যান্য সড়ক ও মহাসড়ক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটে। এরপর এর কাজ কিছুটা ব্যাহত হয়। আবার সেই কাজ শুরু করে নির্ধারিত সময়ে সফলভাবে কাজ সমাপ্ত করা হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক সংযোগ স্থাপন করবে এই সড়কটি। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করবে। ফলে স্থানীয় জনসাধারণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, আয় বৃদ্ধিতে এই সড়কটি অগ্রণী ভূমিকা রাখবে। সড়কটি সীমান্তের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমরা আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছি বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা ইতোমধ্যে পুরো সীমান্ত অঞ্চলে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছি এবং সে কাজ চলমান। সেটাও আমাদের সেনা বাহিনী করছে। আমাদের দেশটাকে আমরা নিরাপদ রাখতে চাই। এখানে আগে বিওপি খুব বেশি ছিল না। আমরা নতুন করে বিওপি স্থাপন করেছি। সীমান্ত সড়ক হয়ে গেলে আমাদের সীমান্ত রক্ষা আরও সহজ হবে।
রাঙ্গামাটি জেলা নিয়ে সরকারের ভাবনা জানিয়ে তিনি বলেন, বর্ষাকালে যখন কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর বেড়ে যায় তখন অতিমাত্রায় ঢেউ দেখা দেয়। তখন এই অঞ্চলের লোকের চলাচল খুব কষ্টকর হয়ে যায়। জেলা সদরের সঙ্গে প্রত্যেকটা উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত যাতে সংযোগ থাকে সেই পরিকল্পনা নিয়ে সমগ্র বাংলাদেশে সড়ক নেটওয়ার্কে ব্যবস্থা করেছি। রাঙ্গামাটি জেলা সদর কিংবা বিভাগীয় সদর থেকে চট্টগ্রামে গমনাগমে যেন বাধাগ্রস্ত না হয় এবং স্থানীয় মানুষের চলাচল যাতে সহজ হয়, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে, উৎপাদিত পণ্য যাতে বাজারজাত করতে পারে—সেসব বিষয় বিবেচনা করে আমরা সড়ক নির্মাণ করে যাচ্ছি। পার্বত্য অঞ্চলে সর্ববৃহৎ ৫০০ মিটার দীর্ঘ নানিয়াচর সেতু নির্মাণ করা হয়েছে।