তাইওয়ান কেন চীনের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

চলতি সপ্তাহে ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের। বৈঠকে তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করতে ট্রাম্পকে অনুরোধ করতে পারেন শি।

মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায় বার্তাসংস্থা রয়টার্স।

প্রতিবেদনে বিশ্বের দুই শীর্ষ নেতার বৈঠকে তাইওয়ান ইস্যু কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, তা নিয়েও বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।

তাইওয়ান নিয়ে চীনের অবস্থান কী?

চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে মনে করে। তবে তাইওয়ান নিজেদের স্বাধীন সত্তা ও সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে চায়। তারা চীনের অংশ হতে চায় না।

চীন মনে করে তাইওয়ান তাদের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার বিষয়, যা নিয়ে অন্য কোনো দেশের প্রশ্ন তোলার বা হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই।

দক্ষিণ-পূর্ব চীনের উপকূল থেকে প্রায় একশ মাইল দূরে তাইওয়ান দ্বীপের অবস্থান। ১৭ শতকে কিং রাজবংশের শাসনামলে প্রথমবারের মতো দ্বীপটি চীনের নিয়ন্ত্রণে আসে। ১৮৯৫ সালে জাপানের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে চীন দ্বীপটি জাপানের হাতে তুলে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আবারও চীনের নিয়ন্ত্রণে আসে তাইওয়ান।

১৯৪৯ সালে মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্টদের কাছে চিয়াং কাই-শেকের নেতৃত্বাধীন ‘রিপাবলিক অব চায়না’ সরকার পরাজিত হয়ে তাইওয়ানে পালিয়ে যায়। এরপর ১৯৪৯ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত কাই-শেকের দল তাইওয়ান থেকে সরকার পরিচালনা করে এবং নিজেদের চীনের বৈধ সরকার হিসেবে দাবি করে। ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার সময় থেকে এই কাই-শেকের নেতৃত্বাধীন ‘রিপাবলিক অব চায়না’ই জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্য ছিল।

তবে একাত্তর সালের ২৫ অক্টোবর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ রেজ্যুলেশন গ্রহণ করে মাও সেতুংয়ের ‘পিপলস রিপাবলিক অব চায়নাকে’ বৈধ ঘোষণা করে এবং নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য পদ দেয়। একইসঙ্গে কাই-শেকের ‘রিপাবলিক অব চায়না’ প্রতিনিধিদের বহিষ্কার করে সংস্থাটি।  

এরপর ১৯৭৯ সালে মাওয়ের উত্তরসূরিদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে যুক্তরাষ্ট্র। একইসঙ্গে কাই-শেকের দলের প্রতি সমর্থনও প্রত্যাহার করে দেশটি। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমেই একঘরে হয়ে পড়ে তাইওয়ান।

প্রতিবেদনে বলা হয়, তাইওয়ানের স্বায়ত্তশাসন ও প্রাদেশিক সরকারের বিষয়ে চীনের আপত্তি নেই। কিন্তু কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে চায়। এর জন্য প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করবে চীন।

১৯৭৯ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ‘এক চীন’ নীতি মেনে আসছে। তাইওয়ান যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও অস্ত্রের অন্যতম বড় ক্রেতা। বিষয়টি সহজভাবে নেয়নি বেইজিং।

এমনকি তাইওয়ানের সঙ্গে বিদেশি নেতাদের উচ্চপর্যায়ের বৈঠককেও বেইজিং নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখে।

ছবি: রয়টার্স

অতীতে চীনের প্রতিক্রিয়া

২০২২ সালে তৎকালীন মার্কিন হাউজ স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি তাইপে সফর করলে তাইওয়ানের চারপাশে বড় ধরনের সামরিক মহড়া শুরু করে চীন। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাইওয়ানের যোগাযোগের জবাবে বেইজিং একাধিকবার মহড়া চালিয়েছে।

দ্বীপটির কাছে চীনের সর্বশেষ বড় সামরিক মহড়া হয় গত ডিসেম্বরে। ওই মাসেই তাইওয়ানের কাছে এক হাজার ১০০ কোটি ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজ বিক্রি অনুমোদন করে ট্রাম্প প্রশাসন। যা এখন পর্যন্ত তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অস্ত্র বিক্রির প্যাকেজ।

তাইওয়ানের বার্ষিক সামরিক মহড়া।  ৮ আগস্ট, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

তাইওয়ানের অবস্থান কী?

বেইজিংয়ের সার্বভৌমত্বের দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের ‘রিপাবলিক অব চায়না’ নামে একটি স্বাধীন দেশ দাবি করে তাইওয়ান সরকার।

তাদের মতে, বিশ্বের বাকি দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা এবং নিজেদের নেতা নির্বাচনের পূর্ণ অধিকার রয়েছে।

তাইওয়ানের বক্তব্য—চীন কখনো একদিনের জন্যও এই দ্বীপ শাসন করেনি। ফলে তাইওয়ানের প্রতিনিধিত্ব করার বা কোনো ধরনের সার্বভৌমত্ব জাহির করার অধিকার বেইজিংয়ের নেই।

তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে এ নিয়ে বারবার চীনের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিলেও বেইজিং তা প্রত্যাখ্যান করেছে।

চীন বা তাইওয়ান—কোনো দেশের সরকারই আনুষ্ঠানিকভাবে একে অপরকে স্বীকৃতি দেয়নি। লাই চিং-তেকে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে মানতে রাজি নয় চীন। তাকে একজন ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসেবে উল্লেখ করে দেশটি।

লাই অবশ্য জানিয়েছেন, তাইওয়ান যেহেতু ইতোমধ্যে একটি স্বাধীন দেশ, তাই নতুন করে আলাদাভাবে আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণার কোনো প্রয়োজন নেই।

দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন সম্মেলনের ফাঁকে ট্রাম্প ও  শি। ৩০ অক্টোবর, ২০২৫। ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি কী?

১৯৭৯ সালে তাইপের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে যুক্তরাষ্ট্র। মেনে নেয় ‘এক চীন’ নীতিও।

চীন সরকারের এ নীতি অনুযায়ী তাইওয়ান আলাদা কোনো দেশ নয়।

প্রশ্ন ওঠে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে?

১৯৭৯ সালের ১০ এপ্রিল ‘তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট’ পাস করে মার্কিন কংগ্রেস। এই আইন অনুযায়ী, আত্মরক্ষার জন্য তাইওয়ানকে প্রযুক্তি ও অস্ত্র সরবরাহ করতে বাধ্য যুক্তরাষ্ট্র।

এরপর ১৯৮২ সালে রোনাল্ড রিগ্যান সরকারের সময়ে তাইওয়ানকে ‘সিক্স অ্যাসুরেন্স’ নামে ৬টি প্রতিশ্রুতি দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ওই বছর যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সই করা ‘তৃতীয় যৌথ ইশতেহারে’ উল্লেখ ছিল ওই ৬ প্রতিশ্রুতি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই ৬ প্রতিশ্রুতি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের তাইওয়ান নীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

এর মূল উদ্দেশ্য হলো—চীনের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং একইসঙ্গে তাইওয়ানের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষায় সমর্থন দিয়ে যাওয়া।

৬ প্রতিশ্রুতির মধ্যে তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধের কোনো নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করেনি যুক্তরাষ্ট্র এবং এ ধরনের অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে আগে থেকে পরামর্শ করতে রাজি নয় ওয়াশিংটন।

যদিও চীন বারবারই তাইওয়ানের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দাবি জানিয়ে আসছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের থ্রিডি মডেলের সঙ্গে চীন ও তাইওয়ানের পতাকার অংশ। ১৭ এপ্রিল, ২০২৫। ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে তাইওয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে?

রয়টার্স জানায়, তাইপেতে ‘আমেরিকান ইনস্টিটিউট ইন তাইওয়ান’ নামে দূতাবাসের মাধ্যমেই মূলত দেশটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক রাখছে যুক্তরাষ্ট্র।

তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টরা মূলত ‘ট্রানজিট’ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের কূটনীতিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার পথে ওয়াশিংটনে নামেন তারা।

যুক্তরাষ্ট্র এবং তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টরা সরাসরি ফোনে কথা বলেন না। তবে ট্রাম্প মে মাসে বলেছিলেন, লাই চিং-তেকে ফোন করবেন তিনি। যদিও এখনো তা হয়নি।

এর আগে ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ট্রাম্প তাইওয়ানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাই ইং-ওয়েনের সঙ্গে ১০ মিনিট ফোনে কথা বলেন।

এ ঘটনায় চীন তখন তুলনামূলকভাবে সংযত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল। তাইওয়ানকে দায়ী করে একটি প্রতিবাদপত্র দেয় বেইজিং।