পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রতিবেদন

‘২৪ বছর পার হলেও চুক্তির কোনো মৌলিক বিষয় সরকার বাস্তবায়ন করেনি’

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের ২৪ বছর পার হলেও চুক্তির কোনো মৌলিক বিষয় সরকার বাস্তবায়ন করেনি এবং বাস্তবায়নের জন্য কোনো আন্তরিক উদ্যোগও বর্তমানে সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত বলে জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।

আজ রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো 'জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি ২০২২: পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতির উপর প্রতিবেদন' এ একথা জানায় জনসংহতি সমিতি। 

প্রতিবেদনে গত দুই মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি তুলে ধরে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি আজ বিস্ফোরন্মুখ অবস্থায় উপনীত হয়েছে।

এতে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের পরিবর্তে বর্তমান সরকার পূর্ববর্তী সামরিক স্বৈরশাসকদের মতো  বলপ্রয়োগের মাধ্যমে উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া তথাকথিত সমাধানের ভ্রান্ত নীতি অনুসরণ করে চলেছে, তা আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট।'

প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘ ১৩ বছরের বেশি সময় ধরে একনাগাড়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকেও পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরকারী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার চুক্তি বাস্তবায়নের কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রেখেছে। অথচ সরকার গোয়েবলসীয় কায়দায় উদ্দেশ্য-প্রণোদিতভাবে প্রতিনিয়ত পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন করে চলেছে ও পার্বত্যাঞ্চলে উন্নয়নের জোয়ার অব্যাহত রেখেছে বলে প্রচার করছে। শুধু তাই নয়, সরকার পক্ষ বর্তমানে অব্যাহতভাবে চুক্তির বিভিন্ন ধারা লঙ্ঘনসহ চুক্তিবিরোধী ও জুম্ম স্বার্থ পরিপন্থী নানা পরিকল্পনা ও কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে চলেছে। চুক্তির অন্তর্নিহিত বিষয়বস্তুকে পদদলিত করে জনস্বার্থবিরোধী সড়ক নির্মাণসহ নানা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে জুম্মদের ক্রমাগত স্বভূমি থেকে উচ্ছেদ, অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস ও অধিকতর প্রান্তিকীকরণসহ এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।' 

গত দুই মাসে (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি ২০২২) নিরাপত্তাবাহিনীর আগ্রাসনমূলক অভিযান, আধিপত্য, নিপীড়ন, নির্যাতনমূলক কার্যক্রম অব্যাহত আছে বলে তুলে ধরা হয় প্রতিবেদনে। এই সময়ে  গ্রেপ্তার, খুন, হয়রানিসহ কমপক্ষে ২৮টি মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা সংঘটিত করেছে বলে জানায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।

এছাড়াও সেটেলার বাঙালি কর্তৃক ভূমি দখলের চেষ্টা, পার্বত্য চট্টগ্রামের ২ বৌদ্ধ ভিক্ষুর ওপর হামলা, তাদের মধ্যে এক ভিক্ষু খাগড়াছড়িতে নৃশংসভাবে খুন, আরেকজন চট্টগ্রামে হামলায় আহত হন। 

এছাড়াও এই সময়ে বান্দরবানের আলিকদমে ও উপজেলা সদরে কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠী কর্তৃক বেআইনিভাবে অবাধে বালু, পাথর উত্তোলন এবং অবৈধভাবে কাঠ পাচারের অভিযোগ পাওয়া যায়। যথাযথ চিকিৎসা সেবার অভাবের কারণে জানুয়ারি মাসে তিন পার্বত্য জেলায় নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অন্তত ১৫ শিশুর মৃত্যু হওয়ার খবর জানা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করে জনসংহতি সমিতি।

প্রতিবেদন বলা হয়, 'দীর্ঘ ২৪ বছরেও জুম্ম জনগণের ন্যায্য অধিকারের সনদ পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন না করে এবং জুম্মদের অধিকার পদদলিত করে তাদের চরম অনিশ্চয়তার দিকে নিক্ষেপ করা হয়েছে। সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক দল সৃষ্টি করে তাদেরকে আজ জুম্ম জনগণ ও চুক্তি বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে এক সংঘাতমূলক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে। অপরদিকে চুক্তি স্বাক্ষরকারী জনসংহতি সমিতির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, গ্রেপ্তার, হয়রানি, হুমকি দিয়ে এলাকাছাড়া করা হয়েছে। ফলে তাদেরকে আবারো ঠেলে দেয়া হচ্ছে আত্মগোপনের পথে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি এক অস্থিতিশীল অবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে।'