২৮৬ একর খাস জমি দখলের অভিযোগ ইউপি চেয়ারম্যান ও সহযোগীদের বিরুদ্ধে
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার চন্দ্রদ্বীপে ২৮৬ একর খাসজমি দখলের অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান এনামুল হক ওরফে আলকাচ মোল্লা ও তার লোকজনের বিরুদ্ধে।
স্থানীয় লোকজন ও ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সাল থেকে সরকারিভাবে খাস জমির একসনা বন্দোবস্ত বা ডিসিআর (ডুপ্লিকেট কার্বন রিসিপ্ট) দেওয়া বন্ধ রয়েছে। এর ফলে কৃষকরা চাইলেও সরকারিভাবে জমি বন্দোবস্ত নিতে পারছেন না। এই সুযোগে ২৮৬ একর আবাদযোগ্য ও অনাবাদি খাস জমি দখলে রেখে এ চক্রটি চাষাবাদ ও স্থানীয়ভাবে মৌখিক বন্দোবস্ত দেয়।
জানা গেছে, এসব খাস জমির মধ্যদিয়ে প্রবাহিত ৪টি খালে বাঁধ দিয়ে তারা মাছ চাষ করেন। এভাবে প্রতি বছর চেয়ারম্যান ও তার লোকজন প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব।
বরিশাল দিয়ারা সেটেলমেন্ট কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নে ৪৫৭ দশমিক ৩০ একর খাস জমি রয়েছে। এর মধ্যে হালোট (জনচলাচলের পথ) রয়েছে ৬ দশমিক ২২ একর, খাল রয়েছে ৫৪ দশমিক ৪৫ একর ও নদী রয়েছে ১১৫ দশমিক ৯৮ একর (চর জেগে উঠলেও চাষাবাদের যোগ্য না)। বাকি ২৮০ দশমিক ৬৫ একর চাষযোগ্য খাস জমি।
ফারুক মাঝি নামে একজন কৃষক দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, তার বাড়ি রাঙ্গাবালী উপজেলার চরযমুনা গ্রামে। ৩ বছর ধরে তিনি চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নে জমি লিজ নিয়ে তরমুজ চাষ করেন। এ বছর চর নিমদী ও রায় সাহেব এলাকায় মোট ১৮০ একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। এর মধ্যে চর নিমদীর ৩০ একর সরকারি খাস জমি রয়েছে। ওই ৩০ একর জমি বাবদ একর প্রতি ১০ হাজার টাকা করে দিতে হয়েছে চেয়ারম্যান আলকাচ মোল্লাকে।
চর রায়সাহেব গুচ্ছগ্রামের পূর্ব পাশে ৮০ একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার নুরাবাদ গ্রামের মিজানুর রহমান হাওলাদার। নভেম্বরের শেষ দিকে ৪ মাসের জন্য প্রতি একর জমির জন্য ১০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই ৮০ একরের মধ্যে ১৪ একর খাস জমি রয়েছে। এর মধ্যে একর প্রতি ১০ হাজার টাকা করে ৬ একরের টাকা নিয়েছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মো. বাবুল হাওলাদার ও ৮ একরের টাকা নিয়েছেন ইউপি চেয়ারম্যান আলকাচ মোল্লা। তবে এ বিষয়ে মিজানুর রহমান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. আবুল বশার মৃধার মাধ্যমে চেয়ারম্যান আলকাচ মোল্লা চর রায়সাহেব গুচ্ছগ্রামের উত্তর-পূর্ব ও পশ্চিম পাশে, জোড়খালের পূর্বপাশে এবং কারেন্টের খালের পূর্ব ও পশ্চিম পাশে সরকারি প্রায় ৭০ একর জমি দখলে নিয়ে চাষাবাদ ও মৌখিক বন্দোবস্ত দেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউপি সদস্য আবুল বশার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এখানে অল্প কিছু খাস জমি আছে, যা গরীবদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।'
এ ছাড়া আওয়ামী লীগ নেতা বাবুল হাওলাদার এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন বলেও দাবি করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবলীগ নেতা বলেন, 'আলকাচ মোল্লা আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেতা হলেও স্থানীয় সাংসদ আ স ম ফিরোজের ভাতিজা হওয়ার সুবাধে তার বিরুদ্ধে কথা বলার কারও সাহস নেই। তিনি ও তার লোকজন চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের প্রায় আড়াইশ একর খাস জমি দখলে রেখে চাষাবাদ ও মৌখিক বন্দোবস্ত দেন।'
চর ব্যারেট ও চরমিয়াজানে প্রায় ৫০ একর জমি দখলে রেখে চাষাবাদ ও বন্দোবস্ত দেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মো. বাবুল হাওলাদার ও ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি ও একই ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. জসিম উদ্দিন। এরা সবাই চেয়ারম্যান আলকাচের খুবই বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত।
এ বিষয়ে ইউপি সদস্য জসিম উদ্দিন বলেন, 'খাসজমি যা ছিল, তা নদীতে ভেঙে গেছে। কিছু আছে, যা রেকর্ডীয় সম্পত্তির মালিকেরা তাদের জমির সঙ্গে ওই জমি দখলে রেখেছেন।' তার দখলে কোনো খাস জমি নাই বলেও দাবি করেন তিনি।
আলকাচ মোল্লা আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে ২০২১ সালে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এ কারণে চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
খাস জমি দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে আলকাচ মোল্লা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ওই ইউনিয়নে কিছু খাস জমি ছিল। যার বেশির ভাগই নদীতে ভেঙে গেছে। যেটুকু বাকি আছে তা নাজিরপুর, মমিনপুর এলাকার ভূমিহীন কৃষকেরা চাষাবাদ করেন। আর কিছু জমিতে স্থানীয় ভূমিহীন কৃষকেরা ঘর তুলে বসবাস করছেন। আমার বিরুদ্ধে খাস জমি দখলে রেখে বেচা-কেনার অভিযোগ সত্য না।' আর এ ঘটনার সঙ্গে তার কোনো নেতা-কর্মীও জড়িত না বলে দাবি করেন তিনি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল আমিন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'খোঁজ নিয়ে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। খাস জমি দখলমুক্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'