ইউক্রেনে রাশিয়ার শীর্ষ ফিল্ড কমান্ডার কে, জানে না যুক্তরাষ্ট্র

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের প্রায় এক মাস হতে চলছে। সেখানে রাশিয়ার শীর্ষ ফিল্ড কমান্ডার কে হতে পারেন সে সম্পর্কে নিশ্চিত নয় যুক্তরাষ্ট্র।

গতকাল সোমবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এ তথ্য জানিয়েছে।

প্রতিবেদন মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ও সাবেক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা গণমাধ্যমটিকে জানিয়েছেন—ইউক্রেনে রণক্ষেত্র পরিচালনায় রাশিয়া কাকে দায়িত্ব দিয়েছে সে ব্যাপারে ধোঁয়াশার কারণে হয়তো সেখানে আপাতদৃষ্টিতে রুশ বাহিনীর এমন 'কৌশলহীনতা' ও 'অব্যবস্থাপনা' দেখা যাচ্ছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা মনে করেন, ইউক্রেনজুড়ে হামলা চালানো রুশ বাহিনীর ইউনিটগুলোর নিজেদের মধ্যে তেমন কোনো যোগাযোগ নেই। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, কোনো একক নেতৃত্ব ছাড়াই ইউনিটগুলো 'স্বাধীনভাবে' পরিচালিত হচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউক্রেনে রুশ সেনা ও কমান্ডাররা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখতে কখনো কখনো বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত মোবাইল ফোন ও অন্যান্য 'অনিরাপদ মাধ্যম' ব্যবহার করছেন।

এর ফলে কখনো কখনো রুশ বাহিনীর মধ্যে 'বিশৃঙ্খলা' সৃষ্টি হচ্ছে উল্লেখ করে এতে আরও বলা হয়, এমন ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমের দেশগুলো বিস্মিত।

ইউরোপে মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক কমান্ডার লেফটেনেন্ট জেনারেল মার্ক হার্টলিং সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, 'যুদ্ধের মৌলিক নিয়ম হলো—এখানে ইউনিটগুলোর ঐক্য বজায় রাখতে একজন শীর্ষ কমান্ডার থাকবে। এর মানে কাউকে না কাউকে পুরো যুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে হবে। তার নির্দেশে সব ইউনিটের সমন্বয়ের মাধ্যমে সবকিছু পরিচালিত হবে। তিনি যুদ্ধের জয়-পরাজয় পর্যালোচনা করবেন।'

রণক্ষেত্রে উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাসহ মোট কতজন রুশ সেনা নিহত হয়েছেন যে বিষয়েও সঠিক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না উল্লেখ করে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, ইউক্রেনীয়দের দাবি—যুদ্ধের প্রথম ৩ সপ্তাহে ৫ রুশ জেনারেল নিহত হয়েছেন। তবে তাদের সেই দাবি তাৎক্ষণিকভাবে সিএনএন যাচাই করতে পারেনি।

অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন জেনারেল ডেভিড পেট্রিয়াস সিএনএন'কে বলেন, 'যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো জেনারেল নিহত হওয়া খুবই দুর্লভ ঘটনা।'

রাশিয়ার আঞ্চলিক টেলিভিশন জিটিআরকে কোসট্রোমা গত বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, 'চৌকশ রুশ বিমান ইউনিটের কমান্ডার কর্নেল সেরগেই সুখারেভ ইউক্রেনের রণক্ষেত্রে নিহত হয়েছেন।'

এ বিষয়ে পেট্রিয়াসের মন্তব্য, 'বলা যেতে পারে রুশ সেনাদের কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ছে।'

তবে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এসব বিষয়ে সিএনএন'র কাছে কোনো মন্তব্য করেনি।

ইউক্রেনে হাজার মাইলজুড়ে রাশিয়া যে রণক্ষেত্র সৃষ্টি করেছে তার সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে লেফটেনেন্ট জেনারেল মার্ক হার্টলিং বলেন, 'যুদ্ধক্ষেত্রে যে বিস্তৃত যোগাযোগ ব্যবস্থা, নির্দেশনা, নিয়ন্ত্রণ ও গোয়েন্দা তথ্যের প্রয়োজন তা রুশদের নেই।'

ইউরোপে মার্কিন সেনাবাহিনীর কমান্ডার লেফটেনেন্টে জেনারেল বেন হজ বলেন, 'এমনকি রাশিয়ার নৌবাহিনীকেও দেখছি না তাদের বিমান বা সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করতে।'

তবে তিনি জানান যে, রুশ সশস্ত্র বাহিনীর 'কমান্ড স্ট্র্যাকচার' সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই।

সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, রণক্ষেত্রে প্রায়শই দেখা যাচ্ছে কমান্ডারদের সঙ্গে রুশ সৈনিকরা যোগাযোগ রাখতে পারছেন না।

স্থলযুদ্ধে মন্থর রুশ বাহিনী

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরুর পর সেখানকার শহরগুলোতে সামরিক-বেসামরিক স্থাপনায় ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রুশ বাহিনী। কিন্তু, স্থলযুদ্ধে তাদের অগ্রগতি খুবই মন্থর।

কিয়েভের কাছে থাকা আলোচিত ৪০ মাইল দীর্ঘ সামরিক কনভয় নিয়েও এখন তেমন কোনো তথ্য সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে না।

সিএনএন'র প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউক্রেনীয়দের প্রবল প্রতিরোধের মুখে রুশ সেনারা স্থলপথে এগোতে পারছে না। সমর বিশেষজ্ঞরা একে রাশিয়ার 'কৌশলগত ভুল' বলে অভিহিত করেছেন।

পশ্চিমের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, কিয়েভসহ ইউক্রেনের আকাশ এখনো রাশিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন গত শুক্রবার সিএনএন'কে বলেন, 'রাশিয়াকে বেশ কয়েকটি ভুল সিদ্ধান্ত নিতে দেখা গেছে। ইউক্রেনে রসদ সরবরাহ নিয়ে মস্কোকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাদের ভালো গোয়েন্দা ব্যবস্থা বা স্থলবাহিনীর সঙ্গে বিমান বাহিনীর ভালো সমন্বয়ও দেখা যাচ্ছে না।'

তবে এসবই প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের 'গোপন' রণ কৌশলের অংশ কি না তা সময়ই বলতে পারবে। কেননা, ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর সাফল্য-ব্যর্থতা ও বাহিনীর নেতৃত্ব নিয়ে রাশিয়ার সরকার নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমে তথ্য পাওয়া দুষ্কর।

গত ৪ মার্চ ফরাসি সংবাদমাধ্যম ফ্রান্স টুয়োন্টিফোর জানায়, রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী সেরগেই শোইগু ও চিফ অব স্টাফ ভালেরি গেরাসিমভ ইউক্রেনে পুতিনের শুরু করা যুদ্ধে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছেন।

এ দিকে, গতকাল রুশ সংবাদমাধ্যম তাস জানায়, ক্রেমলিন ইউক্রেনের সঙ্গে আরও সহযোগিতা ও আলোচনাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ গণমাধ্যমকে বলেন, যারা মস্কো-কিয়েভ আলোচনায় মধ্যস্থতা করতে চান তাদের সবার প্রতি রাশিয়া কৃতজ্ঞ।

তার কথায় 'শান্তি আলোচনা'র প্রতি রাশিয়ার আগ্রহ প্রকাশ পেলেও তা আবার নতুন কোনো 'কৌশল' কি না তা ক্রেমলিনই ভালো জানে।

তবে, গত ৬ মার্চ দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল'র প্রতিবেদনে বলা হয়, রুশ সেনাপ্রধান ইউক্রেনে দ্রুত বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে তারা সেখানে সম্ভাব্য 'চোরাবালি'তে পড়তে যাচ্ছে।