বাঙ্কারে স্বস্তিতে আছি, নিরাপদবোধ করছি: বাংলার সমৃদ্ধি’র অতিরিক্ত ক্যাপ্টেন

কল্যাণ ব্যানার্জি, সাতক্ষীরা

'আগের চেয়ে স্বস্তিতে আছি। অনেকটা নিরাপদবোধ করছি। বাঙ্কারে প্রবেশ করেছি। তোরা চিন্তা করিস না।' কথাগুলো বলেন ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরে আটকে থাকা বাংলাদেশের এমভি 'বাংলার সমৃদ্ধি' জাহাজের অতিরিক্ত ক্যাপ্টেন মনসুরুল আমিন খান (৩৮)।

গত বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে তার ছোটবোন তালা সরকারি কলেজ শিক্ষক সাবিনা খান মৈত্রীর সঙ্গে তিনি এসব কথা বলেন।

এমভি 'বাংলার সমৃদ্ধি' জাহাজের অতিরিক্ত ক্যাপ্টেন মনসুরুল আমিন খানের বাড়ি সাতক্ষীরা শহরের উত্তর কাটিয়ায়। ২ ভাই বোনের মধ্যে বড় মনসুরুল। ৩ পুত্র সন্তানের জনক মনসুরুলের স্ত্রী আশরুকা সুলতানা গৃহিনী। বাবা নূরুল আমিন খান বিএডিসির অবসরপ্রাপ্ত একাউনটেন্ট। মা মর্জিনা খান গৃহিনী। মনসুরুল আমিন বড় হয়েছেন সাতক্ষীরা শহরে। সাতক্ষীরা সরকারি বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। তারপর পর জাহাজে যোগ দেন। পরে তিনি সিঙ্গাপুর মেরিন পলিটেকনিক থেকে ডিপ্লোমা করেন। সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বরে বাড়ি এসে জানুয়ারিতে জাহাজে যান আবার।

father_of_musurul-1_1.jpg
মনসুরুল আমিন খানের ৩ সন্তান ও তার বাবা নূরুল আমিন খান। ছবি: স্টার

আজ শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে সরেজমিনে মনসুরুল আমিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাবা-মা ও বোন সবার চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। বাবা নূরুল আমিন খানের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে বলেন মেয়ে মৈত্রী কথা বলবে।

সাবিনা খান মৈত্রী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে ভাইয়ার সঙ্গে কথা হয়েছে। তারপর গত ১৪ ঘণ্টায় আর কথা হয়নি। আমাদের পরিবার অনেক বড়। সবাই উৎকণ্ঠার মধ্যে আছেন। ভাইয়ার সঙ্গে পরিবারের অন্যরাও কথা বলতে চেষ্টা করছেন। কেউ কথা বলতে পারলে অন্যদের জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে।'

তিনি বলেন, 'ভাইয়া শুক্রবার রাত ১১টার দিকে ম্যাসেঞ্জারে লিখেছেন, মোবাইলে চার্জ দেওয়া যাচ্ছে না। খাবার সমস্যাও রয়েছে। জাহাজে থাকা ২ জন নারীসহ ২৮ জন সবাই অনেকটা নিরাপদে আছেন। মোবাইলের চার্জ না থাকে যদি এ জন্য ভাইয়ের সঙ্গে বেশি যোগাযোগ না করার চেষ্টা করছেন পরিবারের সদস্যরা।' 

ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা শুরু হলে এমভি 'বাংলার সমৃদ্ধি' জাহাজটি নিরাপদ স্থানে সরে যেতে পারেনি। বুধবার রাত ৯টার দিকে রকেট হামলায় জাহাজে আগুন লেগে যায়। হামলায় জাহাজে থাকা থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুর রহমান মারা যান। কাঁচের টুকরা লেগে হাত কেটে যায় নাবিক ফয়সাল আহমেদের।

বুধবার এমভি 'বাংলার সমৃদ্ধি' জাহাজে হামলার পর ৩ ঘণ্টা পরে মোবাইলে বোন মৈত্রীকে মনসুরুল আমিন বলেছিলেন 'মৃত্যুর ভয়ে জাহাজের সব নাবিক আতঙ্কিত। নতুন করে আবার হামলা হয় কিনা তা নিয়ে তারা শঙ্কিত।'

মৈত্রী জানান, ভাইয়া ভয়ে কথা বলতে পারছিলেন না। শুক্রবার রাতে বলেছেন, সেই আতঙ্ক এখন অনেকটা কেটে গেছে। তাদের পরবর্তী গন্তব্য পোল্যান্ড। তবে যুদ্ধ হচ্ছে। নিরাপদে সেখানে যাওয়া সহজ নয়। বাংলাদেশ ও রাশিয়া সরকার তাদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে সহযোগিতা করছে। 

বাড়িতে দেখা যায়, মনসুরুল আমিন খানের ৩ পুত্র সন্তানের সঙ্গে দাদা নূরুল আমিন খান সময় কাটাচ্ছেন। স্ত্রী আশরুকা সুলতানা অনেকটা বিমর্ষ। ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। কারো সঙ্গে তেমন কথাও বলছেন না।

আশরুকার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে মৈত্রী বলেন, 'ভাইয়ার সঙ্গে ভাবির কথা হয়েছে। ভাবি ভালো আছেন। তিনি কারও সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছেন না, বোঝেন তো…।'

মনসুরুল আমিন খানের পিতা নূরুল আমিন খান জানান, বিএসসির নির্বাহী পরিচালক পীষুষ দত্ত তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তিনি বলেছেন একজন মারা গেছেন। জাহাজে থাকা অন্য ২৮ জন সবাই নিরাপদে আছেন।

নূরুল আমিন খান বলেন, 'পরিবারের সবাই এখন বসে আছেন মনসুরুল আমিন কবে বাড়ি ফিরবে এই অপেক্ষায়।'