‘গুপ্ত’ নিয়ে তপ্ত রাজনীতি
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘গুপ্ত’ শব্দটি ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। আভিধানিক অর্থে শব্দটির অর্থ গোপন বা লুকানো। তবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশেষ একটি গোষ্ঠীর দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক কৌশলকে ইঙ্গিত করে শব্দটির ব্যবহার হচ্ছে।
এমনকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও নির্বাচনের আগে বিরোধীদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে ‘গুপ্ত’ শব্দটি উচ্চারণ করেছেন, যদিও তিনি কোনো দলের নাম উল্লেখ করেননি।
গতকাল মঙ্গলবার চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে একটি গ্রাফিতিতে ‘গুপ্ত’ লিখে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও শিবিরের সংঘর্ষ এই আলোচনাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
‘গুপ্ত’ কারা?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আন্ডারগ্রাউন্ড বা গোপন তৎপরতা নতুন নয়। ১৯৭৪ সালে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি, পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি, জাসদ ও গণবাহিনী, সাম্যবাদী দলসহ (এমএল) বেশকিছু দলের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদীর নেতৃত্বে ১৯৪১ সালে জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠার পর থেকে দলটি পাঁচবার নিষিদ্ধ হয়। সর্বশেষ কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে ২০২৪ সালের ১ আগস্ট তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
কোনো দল বা সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা হলে সেই দলটি আর প্রকাশ্যে রাজনীতি করার আইনি বৈধতা হারায়। ফলে তাদের গোপনে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হয়।
তবে বর্তমানে ‘গুপ্ত’ শব্দটি মূলত ইসলামী ছাত্রশিবিরকে উদ্দেশ্য করে ব্যবহৃত হচ্ছে। সংগঠনটির কয়েকজন কর্মী আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে ছাত্রলীগের বিভিন্ন পদে ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তাদের আসল পরিচয় বা নতুন রাজনৈতিক অবস্থান সামনে আসার পর ‘গুপ্ত’ শব্দটি রাজনৈতিক মহলে বিদ্রূপ ও সমালোচনার হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
খোলস পাল্টানোর কৌশল নাকি বাধ্যবাধকতা?
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রলীগের একচ্ছত্র আধিপত্যের সময় টিকে থাকার জন্য তাদেরকে ‘কৌশলগত ছদ্মবেশ’ নিতে হয়েছে বলে দাবি করে ছাত্রশিবির।
তবে সমালোচকরা একে ভিন্ন নজরে দেখছেন। অভিযোগ রয়েছে, শিবিরের কর্মীরা ছাত্রলীগে গুপ্ত থেকে তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তাদের মতোই অন্যায় করে বেড়িয়েছে, অন্যায় সুবিধা ভোগ করেছে।
২০২৪-এর গণঅভ্যুথ্থানের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রকাশ্যে আসে। এতে সভাপতি হিসেবে সাদিক কায়েম ও সেক্রেটারি হিসেবে এস এম ফরহাদের নাম দেখা যায়।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে জিতে সাদিক কায়েম সহ-সভাপতি (ভিপি) হন। তবে তার একটি পুরোনো ভিডিওতে দেখা যায়, সূর্যসেন হলে ‘নৌকা’ ‘নৌকা’ বলে স্লোগান দিচ্ছেন ও সেলফি তুলছেন সাদিক কায়েম।
অন্যদিকে, ফরহাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ২০২২ সালে ঘোষিত কমিটিতে ছিলেন। এছাড়া জসীমউদ্দীন হল ডিবেটিং ক্লাবের সভাপতি থাকাকালে ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে তার ছবি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের সোহরাওয়ার্দী হল সভাপতি আবরার ফারাবীর ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতা নিয়েও ব্যাপক আলোচনা হয়। তিনি একসময় ফেসবুকে শেখ হাসিনাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন এবং জামায়াত-শিবিরকে ‘খুনি’ আখ্যা দিয়েছিলেন। পরে তিনি স্বীকার করেন, ২০২২ সাল পর্যন্ত তিনি ছাত্রলীগের সাথে যুক্ত ছিলেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক সার্জিস আলমও অমর একুশে হল ছাত্রলীগের পদধারী ছিলেন বলে গণমাধ্যমে খবর আসে। আরেক সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে একটি জাতীয় পত্রিকায় ‘বাংলাদেশ মানেই বঙ্গবন্ধু’ শিরানামে মতামত প্রকাশ করেন।
২০২৫ সালের আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আবদুল কাদের ফেসবুক এসব নিয়ে একটি পোস্ট করলে তাকে তোপের মুখে পড়তে হয়।
ওই পোস্টে তিনি বলেন, ‘হলে থাকার কারণে ছাত্রশিবিরের যে ছেলেগুলো সক্রিয়ভাবে ছাত্রলীগ করত, তারা মূলত আইডেনটিটি ক্রাইসিস (আত্মপরিয়ের সংকট) থেকে উতরানোর জন্য কিছু ক্ষেত্রে অতি উৎসাহী কর্মকাণ্ডে জড়াত। সেটা নিজেকে ছাত্রলীগ প্রমাণের দায় থেকে। ছাত্রলীগ যে নিপীড়ন-নির্যাতন চালাত, তারা সেগুলার অংশীদার হতো, লীগের কালচারই চর্চা করত।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ‘গুপ্ত’ বা সাধারণ না হয়েও ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ নাম নিয়ে রাজনীতি করা একটি দ্বিমুখী সংকটের জন্ম দিয়েছে। এটি প্রতিকূল পরিবেশে সংগঠনের টিকে থাকার কৌশল হতে পারে, তবে তা ছাত্রলীগের আমলের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হওয়া নিপীড়নের দায়কেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সংঘাতের নেপথ্যে
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ক্ষমতার নতুন সমীকরণে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বিভিন্ন বক্তব্যে ‘গুপ্ত’ শক্তির বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
শুরুতে ক্যাম্পাসগুলোতে কে বেশি শক্তিশালী ও জুলাই অভ্যুত্থানে কার অবদান কতটুকু—এই বিতর্কের জের ধরেই ‘গুপ্ত’ শব্দটি সংঘর্ষের বারুদে পরিণত হয়েছিল।
এরপর ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি নিয়ে কলহ করেছে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা তার একটি উদাহরণ। এছাড়া, একে অপরের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি, প্রভাব বিস্তারসহ নানা অভিযোগ এই তিক্ততা আরও বাড়িয়েছে।
ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের কারণে নিজেদের পরিচয়ে রাজনীতি করতে পারত না বলে দাবি করা সংগঠনগুলো ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে একই অবস্থায় নেই। তারপরও সাধারণ শিক্ষার্থী হয়ে লুকিয়ে নিজেদের রাজনীতি করা এবং বিশেষ সময়ে স্বনামে আবির্ভূত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রশিবিরের নামে।
তিক্ততার সর্বশেষ নজির হিসেবে যুক্ত হয়েছে চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজে ছাত্রদল এবং ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা। কলেজের ভবনের দেয়ালে একটি গ্রাফিতির নিচে লেখা ছিল—ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রলীগ মুক্ত ক্যাম্পাস। সোমবার রাতে কলেজ শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মী সেখানে গিয়ে গ্রাফিতি থেকে ‘ছাত্র’ শব্দটি মুছে ওপরে লেখেন ‘গুপ্ত’।
সবমিলিয়ে এটাই দৃশ্যমান, সংগঠনগুলোর বিরোধ ও নেতৃত্বের লড়াইয়ে ‘গুপ্ত’ তকমাটি বর্তমানে শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে।



