বিশ্লেষণ

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা কেন জরুরি, কেন বারবার আটকে যায়?

ফাহিমা কানিজ লাভা
ফাহিমা কানিজ লাভা

মানুষ অসুস্থ হলে ডাক্তার যা ওষুধ দেন, সেটা কিনতেই হয়। দাম যতই হোক, অনেক সময় না কিনে উপায় নেই। বিশেষ করে যে ওষুধ জীবন বাঁচায় বা অনেকদিন খেতে হয়, সেগুলোর দাম বাড়লে রোগীর পরিবারের ওপর সরাসরি চাপ পড়ে। 

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খরচের বড় অংশ মানুষ নিজের পকেট থেকে দেয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি যায় ওষুধ কিনতে। তাই কোন ওষুধ সবচেয়ে জরুরি, সেগুলোর দাম কেমন হবে, বাজারে সহজে পাওয়া যাবে কি না—এসব শুধু ওষুধ কোম্পানির বিষয় নয়। সাধারণ মানুষের চিকিৎসার খরচের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

এই কারণেই ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা’ গুরুত্বপূর্ণ। আর এই তালিকার ওষুধের দাম সরকার ঠিক করবে কি না, সেটাও দীর্ঘদিনের আলোচনা।

সম্প্রতি সরকার ২০২৬ সালের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা আর দাম নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিল করেছে। কিন্তু এর মানে এই না যে সব দাম নিয়ন্ত্রণ উঠে গেছে। আগের কিছু ব্যবস্থা এখনো চালু আছে। তালিকা নতুন করে হালনাগাদ করার সিদ্ধান্তও হয়েছে।

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ মানে কী? 

যে ওষুধগুলো মানুষের সবচেয়ে জরুরি ও মৌলিক স্বাস্থ্য চাহিদা মেটায়, সেগুলোই অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ (এসেনশিয়াল ড্রাগ)। সাধারণ জ্বর-পাতলা পায়খানা থেকে শুরু করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হাঁপানি, হৃদরোগ বা ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের ওষুধও এতে থাকতে পারে। 

কোনো দেশের মানুষের বড় অংশের যেসব রোগ বেশি হয়, সেগুলোর জন্য কোন ওষুধ বেশি কার্যকর, নিরাপদ আর কম দাম—সেটা দেখে তালিকা বানানো হয়। উদ্দেশ্য একটাই, সবচেয়ে দরকারি ওষুধ যেন সবসময় বাজারে আর সরকারি হাসপাতালে থাকে, আর দাম যেন সাধারণ মানুষের নাগালে থাকে।

এই ধারণা এল কোথা থেকে?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ১৯৭৭ সালে প্রথম এ ধারণা চালু করে। উদ্দেশ্য ছিল উন্নয়নশীল ও আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোতে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ অল্প দামে সহজলভ্য করা।

ডব্লিউএইচওর প্রথম তালিকায় প্রায় ২০০টি জেনেরিক ওষুধ ছিল। বিভিন্ন দেশকে নিজ নিজ বাস্তবতার নিরিখে নিজস্ব তালিকা তৈরির আহ্বান জানায় সংস্থাটি। 

এরপর থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতি দুই বছর পর পর এই তালিকা হালনাগাদ করছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২৫তম তালিকায় ৫২৩টি ওষুধ আছে। শিশুদের জন্য আলাদা তালিকায় ৩৭৪টি। এখন ১৫০টির বেশি দেশ নিজেদের তালিকা বানাতে এটা অনুসরণ করে। 

বাংলাদেশে শুরু কীভাবে?

স্বাধীনতার পর দেশে হাজার হাজার ধরনের ওষুধ বিক্রি হতো। নিবন্ধিত ওষুধই ছিল ৪ হাজার ৩৪০টি। এর অনেকগুলোই ছিল অকার্যকর, অপ্রয়োজনীয় ও চড়া দামের। আবার জীবন রক্ষাকারী মৌলিক ওষুধেরও ঘাটতি ছিল।

এই পরিস্থিতি বদলাতে ১৯৮২ সালে সরকার একটি কমিটি গঠন করে। সেখানে ছিলেন তৎকালীন পিজির পরিচালক অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলাম, চক্ষুবিজ্ঞানী মোবারক আলী, ফার্মাকোলজিস্ট এম এ মান্নান, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ এম কিউ কে তালুকদার, চিকিৎসা শিক্ষার পরিচালক হুমায়ুন হাই, সার্জন আজিজুর রহমান, ঔষধ প্রশাসনের পরিচালক নুরুল আনোয়ার ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। এই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ঐতিহাসিক ‘জাতীয় ওষুধ নীতি ১৯৮২’ জারি করা হয়।

এতে প্রথমবারের মতো সাধারণ মানুষের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ১৫০টি ওষুধ বেছে নিয়ে ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা’ করা হয়। ১ হাজার ৭৪২টি ক্ষতিকর ও অকার্যকর ওষুধ এক ধাক্কায় নিষিদ্ধ করা হয়। 

ব্র্যান্ড নামের বদলে কম দামে জেনেরিক নামে ওষুধ বিক্রি বাধ্যতামূলক করা হয়। এতে স্থানীয় ওষুধ শিল্প বড় হয়, বাংলাদেশ ওষুধ রপ্তানি করতেও শুরু করে। 

তালিকায় পরে কী পরিবর্তন হয়েছে? 

এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় পরিবর্তন এসেছে। 

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বড় করে ২৯৫টি করে অন্তর্বর্তী সরকার। এর আগে ১৯৯৪ সালের তালিকায় ছিল ১১৭টি ওষুধ। 

এর আগে বাংলাদেশে ১৯৮২ সালের ওষুধ নীতি সংশোধন করে জাতীয় ওষুধ নীতি-২০০৫ প্রণয়ন করে সরকার। কিন্তু তাতে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের কোনো তালিকা ছিল না।

২০০৮ সালে ২০৯টি ওষুধ নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় তালিকা প্রকাশ করা হয়। যদিও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি।

এরপর ২০১৬ সালে জাতীয় ওষুধ নীতিতে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় ২৮৫টি ওষুধ রাখা হয়। 

তবে এখন পর্যন্ত ১৯৯৪ সালের আদেশের কারণে সরকার মাত্র ১১৭টি ওষুধের দামই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। 

২০২৬ সালে কী পরিবর্তন আনা হয়?

২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকার অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা নতুন করে হালনাগাদ করে। এই তালিকায় আগে প্রায় ১৬০টি ওষুধ ছিল। এখন আরও ১৩৫টি ওষুধ যোগ করে মোট ওষুধের সংখ্যা হলো ২৯৫টি। 

নতুন তালিকায় ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও সংক্রামক রোগের ওষুধও রাখা হয়। পরিকল্পনা ছিল, এসব ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরা দাম সরকার ঠিক করবে।

অত্যাবশ্যকীয় নয়, এমন প্রায় ১ হাজার ১০০টি ওষুধের দাম নিয়েও নির্দেশনা দেওয়ার কথা ছিল। কোম্পানিগুলো নির্ধারিত দামের চেয়ে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ কম বা বেশি দামে এসব ওষুধ বিক্রি করতে পারত।

এ ছাড়া প্রতিটি কোম্পানিকে তাদের উৎপাদনের অন্তত ২৫ শতাংশ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদন করতে বলা হয়েছিল। 

এখন কেন সেই ব্যবস্থা বাতিল হলো?

সম্প্রতি মন্ত্রিসভা ২০২৬ সালের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিলের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে।

এর প্রধান কারণ আইনি। ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩ অনুযায়ী অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা করার আগে জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ নিতে হয়। সেটা নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে হাইকোর্টে রিটও হয়েছে, তা এখনো বিচারাধীন।

২৯ জুন জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়েছে। এখন আইন মেনে নতুন তালিকা বানানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। 

তালিকা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশেষজ্ঞের মত

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক ডা. বে-নজির আহমেদ মনে করেন, নতুন তালিকাটি যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই না করে বাতিল করা ঠিক হয়নি।

তার মতে, নতুন তালিকা করার মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষের প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতা বাড়ানো এবং দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখা। কিন্তু তালিকা বাতিলের পর এর বিকল্প কী হবে, সেটা এখনো স্পষ্ট নয়।

ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, আইনি কারণে আগের তালিকা বাতিলের প্রয়োজন হতে পারে। তবে জনস্বাস্থ্যের দিক বিবেচনায় নিয়ে নতুন ও কার্যকর তালিকা তৈরিতে যেন দীর্ঘসূত্রতা না হয়—সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। 

সরকার ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ করে কেন?

ওষুধ সাধারণ কোনো পণ্য নয়। খাবার বা কাপড় কয়েকদিন না কিনলেও চলে। কিন্তু ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ নিয়মিত খেতেই হয়। জীবনরক্ষাকারী ওষুধের ক্ষেত্রেও একই কথা। 

দাম বাড়লেও রোগীর সামনে ওষুধ কেনা ছাড়া উপায় থাকে না। ফলে বাজার পুরোপুরি চাহিদা ও জোগানের ওপর ছেড়ে দিলে রোগীর স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

ডা. বে-নজির আহমেদের মতে, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সরকারের সরাসরি দাম বেঁধে দেওয়া সব সময় কাঙ্ক্ষিত না হলেও বাংলাদেশের ওষুধের বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কোম্পানিগুলোর প্রভাব, বাজারের অনিয়ম এবং বিভিন্ন ধরনের সিন্ডিকেটের কারণে শুধু বাজারের প্রতিযোগিতার ওপর নির্ভর করলে সাধারণ মানুষের স্বার্থ যথেষ্ট সুরক্ষিত নাও হতে পারে।

তাই তার মতে, ওষুধের দাম নির্ধারণে সরকারের কার্যকর ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। তবে দাম নির্ধারণের সময় শুধু কোম্পানির উৎপাদন খরচ নয়, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও আর্থসামাজিক অবস্থাকেও বিবেচনায় নিতে হবে।

অর্থাৎ এমন দাম নির্ধারণ করতে হবে, যাতে একদিকে রোগী ওষুধ কিনতে পারেন, অন্যদিকে কোম্পানিও টেকসইভাবে উৎপাদন ও ব্যবসা করতে পারে। 

দাম কম হলেই কি সমস্যার সমাধান?

ওষুধের দাম কম রাখার পাশাপাশি বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ ও ওষুধের মান নিশ্চিত করাও জরুরি।

ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ওষুধের ক্ষেত্রে দাম, মান, নকল ও ভেজাল ওষুধ এবং পর্যাপ্ত সরবরাহ—সবকিছু একসঙ্গে দেখতে হবে।

তার মতে, বাজার তদারকিতে ওষুধ প্রশাসনের সক্ষমতা আরও বাড়ানো দরকার। বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা থাকলে ফার্মেসি ও ওষুধ বিক্রয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত পরিদর্শন করা সম্ভব হবে। নকল বা নিম্নমানের ওষুধ বাজারে এলে দ্রুত তা শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়াও সহজ হবে।

এতে রোগীরা যেমন ভালো মানের ওষুধ পাবেন, তেমনি দেশের ওষুধ শিল্পও আন্তর্জাতিক বাজারে আরও ভালো করতে পারবে বলে মনে করেন তিনি।

সরকার দাম ঠিক করলে লাভ কার?

সরকার অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ করলে সরাসরি লাভবান হওয়ার কথা রোগীর। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ওষুধ খেতে হয় এমন রোগী এবং কম আয়ের পরিবারগুলোর।

দাম নিয়ন্ত্রণে থাকলে চিকিৎসার মাসিক খরচ আগে থেকে কিছুটা ধারণা করা যায়। হঠাৎ দাম বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও কমে।

তবে দাম যদি এমনভাবে বেঁধে দেওয়া হয় যে উৎপাদন খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে, তখন কোম্পানির উৎপাদনে আগ্রহ কমতে পারে। এতে বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে কোনো ধরনের মূল্য নিয়ন্ত্রণ না থাকলে কোম্পানির ব্যবসা পরিচালনা সহজ হতে পারে, কিন্তু রোগীর ওপর ওষুধের খরচের চাপ বাড়তে পারে।