বিশ্লেষণ

বিএনপির অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযান কি রাজনৈতিক চাপ সামাল দিতে পারবে?

তানিম আহমেদ
তানিম আহমেদ

মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি এমন সময়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো, যখন চারদিকে হাম ও ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবে মানুষ বিপর্যস্ত। অবশ্য ঘটনার পরদিন থেকেই সেখানে স্বাস্থ্যকর্মীরা খোলা আকাশের নিচে চিকিৎসাসেবা দেওয়া শুরু করেন। পরে অনুসন্ধানে বের হয়ে আসে হামলায় স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা জড়িত।

পুরো বিষয়টি ক্ষমতাসীন বিএনপির জন্য ভীষণ বিব্রতকর ছিল। এ ঘটনায় একজন এমপিকে সরিয়ে দেওয়াটাও একরকম দায় স্বীকারেরই নামান্তর।

এরপর ইসিবি চত্বরের কাছে একটি ভবনে হামলা হয়। সেখানে এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরের স্টুডিও ছিল। জমি নিয়ে বিরোধের জেরে স্টুডিওটি ভাঙচুর করা হয়। হামলাকারীদের সঙ্গে ক্ষমতাসীন বিএনপির সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। ঘটনাটিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যও ভাইরাল হয়। তার মন্তব্যকে দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে তীব্র সমালোচনাও শোনা গেল।

এর কদিনের মধ্যেই বিএনপি ছেড়ে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেওয়া এক সাবেক সংসদ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। পাশাপাশি চলমান ‘কিশোর গ্যাংবিরোধী’ অভিযানে শত শত কিশোরকে আটক করা হয়েছে। এছাড়াও আপাতভাবে মনে হচ্ছে, সারা দেশে বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনাও বেড়ে চলেছে।

স্থানীয় নেতাদের দলীয় সদস্যদের বিষয়ে তথ্য দিতে নির্দেশ দিয়ে বিএনপি অপরাধীদের দল থেকে বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এ থেকে অন্তত এটুকু বোঝা যায় যে, এই মুহূর্তে এমন পদক্ষেপ প্রয়োজনীয় বলে মনে করছে ক্ষমতাসীন দল। তবে এই উদ্যোগ আন্তরিকভাবে নেওয়া হয়েছে, নাকি জনমনে তৈরি হওয়া প্রত্যাশা পূরণের জন্য, তা সময়ের সঙ্গে বোঝা যাবে।

লক্ষণীয় বিষয় হলো—এসব ঘটনা একের পর এক সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে বিরোধী দলগুলোও তাদের সমালোচনা জোরদার করেছে। তারা বুঝতে পারছে, বিএনপি এখন কিছুটা চাপের মুখে এবং পরিস্থিতি সামাল দিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা প্রকাশ্যেই সমালোচনা করছেন। সংসদ সদস্য ও জুলাইয়ের অন্যতম নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ ফেসবুকের এক পোস্টে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সরকারি সংস্থাগুলোকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তদন্ত করার চ্যালেঞ্জ দেন।

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম আরও এক ধাপ এগিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অপসারণ দাবি করেন।

এদিকে, রোববার বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান পরোক্ষভাবে সরকারের পদত্যাগের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সরকার যদি ‘মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়’, তাহলে ক্ষমতায় থাকার কোনো অধিকার আর থাকে না।

বিএনপি একদিকে দলীয় শৃঙ্খলা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। সেই আশঙ্কা অবশ্য বরাবরই ছিল। সংসদ সদস্যকে সরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বিএনপিকে অন্য অপরাধীদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে। এতে দলের এমনিতেই দুর্বল হয়ে পড়া ভাবমূর্তি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা দলটির জন্য নতুন সমস্যা তৈরি করবে।

একই সময়ে সরকার চলমান সংকট—মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির দাম, কর্মসংস্থান, ডেঙ্গু, হাম বা অপরাধ—মোকাবিলায় যে পদ্ধতি নিচ্ছে, তার কোনোটিই কাজ করছে না। এতে বিরোধী দলগুলো আরেকটু সাহস পেয়ে সরকারবিরোধী বক্তব্য আরও তীব্র করেছে। জনসমর্থন বাড়িয়ে নেওয়ার সময় এই সু্যোগটা জামায়াত সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগিয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধা আখতারুজ্জামানের গ্রেপ্তার জামায়াতকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আবার কথা বলার একটি সুযোগ করে দিয়েছে। ইসলামী দলটির জন্য এটা বিশেষভাবে স্বস্তির হবার কথা।

মাত্র কিছুদিন আগেই সাবেক জামায়াত নেতা আবদুর রাজ্জাকের ‘স্মৃতিকথা’ প্রকাশিত হয়েছে। গ্রন্থটি জামায়াতের জন্যে বেশ বিব্রতকর ছিল। যেখানে স্পষ্ট হয়েছে, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতার জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি কীভাবে বহু বছর ধরে এড়িয়ে চলেছে দলটি।

তবে বর্তমানের এই চলমান বক্তব্য-বিতর্ক খুব দ্রুত কোনো চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা খুবই কম। বিশেষ করে সরকারের মেয়াদের যেখানে এক বছরও পার হয়নি। তাছাড়া অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, গ্রেপ্তার ও শুদ্ধি অভিযান বা অন্তত এমন পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা দেখিয়ে, ক্ষমতাসীন দলটি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেও বলে মনে হচ্ছে। তাতে কিছুটা হলেও জনগণের অনাস্থা কমবে।