কৌতূহল জাগানো বাজেট ব্রিফকেসের আদ্যোপান্ত
বাজেট ঘোষণার দিন এলেই চিরচেনা কিছু দৃশ্য চোখে পড়ে। সাংবাদিকদের ক্যামেরার ফ্ল্যাশের মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন দেশের অর্থমন্ত্রী। তবে সব ছাপিয়ে মানুষের চোখ আটকে যায় অর্থমন্ত্রীর হাতে থাকা একটি জিনিসের ওপর—ব্রিফকেস।
কৌতূহল জাগতে পারে, এই ব্রিফকেসের ভেতর কি লাখ লাখ কোটি টাকা ভরা থাকে? ব্যাপারটা কিন্তু একদমই তা না। যত টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়, সেগুলো যদি নোট আকারে নিতে হতো, তবে অর্থমন্ত্রীকে বড় ট্রাক নিয়ে সংসদে যেতে হতো।
মূলত ওই ব্রিফকেসে থাকে একটি ছাপানো বক্তৃতা আর দেশের কোটি কোটি টাকা আয়-ব্যয়ের বিশাল এক পরিকল্পনা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অর্থমন্ত্রীরা কেন এই ব্রিফকেস বয়ে বেড়ান? এই রীতির শুরুই বা কোত্থেকে?
অর্থমন্ত্রীদের এই ব্রিফকেসের পেছনে আছে মজার ইতিহাস।
মানিব্যাগে যখন আর ধরছিল না
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা আকবর আলি খানের ‘বাংলাদেশে বাজেট: অর্থনীতি ও রাজনীতি’ বইয়ে এই ব্রিফকেসের গল্পের উল্লেখ আছে।
আধুনিক বাজেট ব্যবস্থার সূচনা মূলত স্যার রবার্ট ওয়ালপুলের হাত ধরে হয়েছিল বলে মনে করা হয়। ১৭২৫ থেকে ১৭৪২ সাল পর্যন্ত ব্রিটেনের অর্থমন্ত্রীর (চ্যান্সেলর অব দি এক্সচেকার) দায়িত্বে ছিলেন তিনি। পরে তিনি দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রীও হন।
বাজেট ঘোষণার আগে বিভিন্ন মহল থেকে কর বাড়ানো বা কমানোর অজস্র অনুরোধ আর পরামর্শের চিরকুট আসত ওয়ালপুলের কাছে। তিনি সেসব চিরকুট নিজের ব্যুজেট বা মানিব্যাগে জমিয়ে রাখতেন। পরে বাজেট তৈরির সময় ওই চিরকুটগুলোই হতো তার মূল ভরসা।
অর্থবছর শেষের দিকে যখন সরকারের আর্থিক পরিকল্পনার প্রস্তুতি শুরু হতো, তখন ওয়ালপুল ওই থলি থেকে চিরকুটগুলো বের করে পরিকল্পনা করতেন। এই অভ্যাসটি থেকেই মূলত ‘বাজেট ব্রিফকেস’-এর আদি ধারণার জন্ম।
পরবর্তীতে শিল্পবিপ্লবের পর ইংল্যান্ডের অর্থনীতি যখন বড় হতে শুরু করল, তখন অর্থমন্ত্রীর বাজেট প্রস্তাবের কাগজপত্রের বহরও গেল বেড়ে। অগত্যা মানিব্যাগের জায়গা দখল করল এই ব্রিফকেস।
এরপর ১৮৬০ সালে ব্রিটেনের বাজেটপ্রধান উইলিয়াম ই. গ্ল্যাডস্টোন সোনা দিয়ে রানির মুখের আদল খোদাই করা একটি লাল স্যুটকেসে করে বাজেটের নথি নিয়ে আসেন।
ওই স্যুটকেস বহু বছর ধরে ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রীরা ব্যবহার করেছেন।
‘বাজেট’ মানে চামড়ার থলি
'বাজেট' মূলত একটি ইংরেজি শব্দ, যার কোনো গ্রহণযোগ্য প্রতিশব্দ বাংলায় নেই। ফলে বাংলাদেশের সরকারি দাপ্তরিক কাজে এই ইংরেজি শব্দটিই ব্যবহার করা হয়।
বাংলা একাডেমির 'বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান' অনুযায়ী, ১৯০২ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায় প্রথম 'বাজেট' শব্দটি পাওয়া যায়।
তবে এই ইংরেজি ‘বাজেট’ শব্দটি এসেছে পুরোনো ফরাসি শব্দ ‘ব্যুজেট’ থেকে। এর অর্থ হলো ‘থলি’ বা ‘মানিব্যাগ’।
অষ্টাদশ শতকে যুক্তরাজ্যে থলিতে ভরে দেশের আয়-ব্যয়ের হিসাব আইনসভায় আনা হতো। তখন থেকেই এই হিসাব-নিকাশের নাম হয় ‘বাজেট’।
আবার অক্সফোর্ড ডিকশনারি বলছে ভিন্ন কথা। ষোড়শ শতাব্দীতে নাকি ‘কারও বাজেট খোলা’ মানে বোঝানো হতো—গোপন বা সন্দেহজনক কিছু প্রকাশ করা।
লাল, কালো নাকি মেরুন রঙের ব্রিফকেস?
১৮৬০ সালের ৭ এপ্রিল। কলকাতায় এই উপমহাদেশে প্রথম বাজেট পেশ করেন ব্রিটিশ সরকারের জেমস উইলসন।
সেই থেকে শুরু করে ১৯৭১-৭২ ও ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের হাত হয়ে আজ পর্যন্ত এই ব্রিফকেসের ঐতিহ্য টিকে আছে।
আমাদের দেশের সবচেয়ে বেশি বাজেট পেশ করা দুই সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান এবং আবুল মাল আবদুল মুহিতকেও প্রতিবারই ব্রিফকেস হাতে সংসদে ঢুকতে দেখা গেছে। দুজনই ১২ বার করে বাজেট পেশ করেছেন।
তবে প্রথা অনুযায়ী এই ব্রিফকেস ‘লাল’ রঙের হওয়ার কথা থাকলেও অর্থমন্ত্রীরা মাঝেমধ্যেই ফ্যাশন সচেতন হয়ে ওঠেন। কখনো কালো বা মেরুন—নানা রঙের ব্রিফকেস দেখা গেছে তাদের হাতে। যেমন প্রয়াত আবুল মাল আবদুল মুহিতকে মেরুন ও কালো রঙের ব্রিফকেস ব্যবহার করতে দেখা গেছে।
সবকিছুর পেছনে ‘গোপনীয়তা’
এই ব্রিফকেস ব্যবহারের সবচেয়ে বড় কারণ ‘গোপনীয়তা’। বাজেটে কোন জিনিসের দাম কমবে আর বাড়বে, তা গোপন রাখা দরকার। কারণ ব্যবসায়ীরা আগেভাগে জেনে গেলে রাতারাতি মজুতদারি করতে পারেন।
ফলে এই গোপনীয়তা রক্ষা করা যেকোনো অর্থমন্ত্রীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। যে অর্থমন্ত্রী এই গোপনীয়তা ধরে রাখতে পারেন না, বলা হয় তার পদে থাকারই যোগ্যতা নেই।
গোপনীয়তা ভঙ্গের গল্প
বাজেট তথ্য ফাঁসের সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৪৭ সালে। লন্ডনের স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক ও তৎকালীন ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী হিউ ডাল্টন যখন বাজেটের কাগজপত্র নিয়ে পার্লামেন্টে ঢুকছিলেন, তখন সাংবাদিকরা তাকে আসন্ন কর ব্যবস্থা নিয়ে কিছু প্রশ্ন করেন।
ডাল্টন অসাবধানতাবশত কিছু প্রস্তাবের খুঁটিনাটি ফাঁস করেন। সেই তথ্য সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোনের মাধ্যমে পত্রিকার অফিসে পৌঁছে যায়। কিছু পত্রিকা সেই খবর দিয়ে বিশেষ সংখ্যাও প্রকাশ করে ফেলে।
ডাল্টন যখন পার্লামেন্টে তার বাজেট বক্তৃতা দেওয়া শুরু করলেন, ততক্ষণে সেই পত্রিকার কপিগুলো সংসদ সদস্যদের হাতে পৌঁছে গেছে। অর্থাৎ, আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার আগেই নতুন করের তথ্য পুরোপুরি জনসমক্ষে চলে আসে।
বিরোধী দলের রাজনীতিকরা সরকারের বিরুদ্ধে বাজেট ফাঁসের অভিযোগ তোলেন। ডাল্টন নিজের ভুলের দায় স্বীকার করে নিয়ে এর কিছুদিন পরই পদত্যাগ করেন।
ব্রিফকেস প্রথা ভাঙার গল্প
১৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রীরা সংসদে যাওয়ার আগে ১১ ডাউনিং স্ট্রিটের বাইরে বাজেটের স্যুটকেস হাতে নিয়ে ছবি তোলার পোজ দিতেন। ব্রিটেনের এই সংসদীয় ঐতিহ্য পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে তাদের একসময়কার উপনিবেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে।
তবে ২০১৯ সালে এই ঐতিহ্যে পরিবর্তন আনেন ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন। তিনি ব্রিফকেসের বদলে লাল কাপড়ে মোড়ানো 'বহি-খাতা' নিয়ে আসেন। এটি এক ধরনের ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় হিসাবের খাতা। তার এই পদক্ষেপকে ঔপনিবেশিক প্রতীকী ভাবধারা থেকে বেরিয়ে আসার একটি প্রয়াস হিসেবে দেখা হয়।
পরবর্তীতে ২০২১ সালে নির্মলা সীতারমন লাল মোড়কে মোড়ানো একটি ‘ট্যাবলেট’ বা ট্যাব নিয়ে সংসদে ঢোকেন। সেবার কোনো কাগজপত্র ছাড়াই ট্যাব দেখে ডিজিটাল বাজেট বক্তৃতা পাঠ করেন তিনি।
তবে ট্যাবলেট আসুক বা ল্যাপটপ, আমাদের দেশে অর্থমন্ত্রীদের চিরচেনা সেই ব্রিফকেস হাতে পোজ দেওয়ার দৃশ্যটির আবেদন আজও কমেনি। যদিও সরকারের ভেতরের বাস্তব চিত্রটা এখন বদলে গেছে। আধুনিক বাজেট এখন সম্পূর্ণ ডিজিটালি তৈরি হয়। ব্রিফকেসটি এখন কেবলই একটি প্রতীক।