এক্সপ্লেইনার

বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক কী, এটি কীভাবে আলাদা?

স্টার বিজনেস রিপোর্ট

১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারার আওতায় বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা সব পণ্যের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এতদিন কার্যকর থাকা অস্থায়ী ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্কের জায়গায় এসেছে নতুন এই শুল্ক।

ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে মোট শুল্ক দাঁড়াবে ২৫ দশমিক ৬২ শতাংশ। এর মধ্যে আগে থেকেই ১৫ দশমিক ৬২ শতাংশ মোস্ট-ফেভার্ড-নেশন (এমএফএন) শুল্ক রয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হবে নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক।

অর্থাৎ, শুল্কের হার বদলায়নি। বদলেছে শুল্ক আরোপের আইনি ভিত্তি। আগের সর্বজনীন ১০ শতাংশ শুল্কের বদলে এখন ৩০১ ধারার আওতায় একই হারে শুল্ক দিতে হবে। জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি ঠেকাতে যথেষ্ট ব্যবস্থা না নেওয়াকে এই শুল্ক আরোপের কারণ হিসেবে দেখিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) চলতি বছরের ২৩ জুলাই এই শুল্কের ঘোষণা দেয়। ২৪ জুলাই থেকে এটি কার্যকর হয়।

জোরপূর্বক শ্রম কেন?

পারস্পরিক শুল্ক চুক্তি (এআরটি) থেকে আসা শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করার পর আমদানির ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের নতুন আইনি পথ খুঁজছিল ট্রাম্প প্রশাসন।

এর অংশ হিসেবে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি ঠেকাতে বিভিন্ন দেশ যথেষ্ট ব্যবস্থা নিয়েছে কি না, তা যাচাই করতে গত মার্চে ৩০১ ধারার আওতায় তদন্ত শুরু করে ইউএসটিআর। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৬০টি অর্থনীতি এই তদন্তের আওতায় ছিল।

তদন্তে বাংলাদেশে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি ঠেকাতে ‘আংশিক প্রয়োগ কাঠামো’ (পার্শিয়াল এনফোর্সমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক) রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এর ভিত্তিতে ১০ শতাংশ ও ১২ দশমিক ৫ শতাংশ—এই দুই শুল্কস্তরের মধ্যে বাংলাদেশকে নিচের স্তরে রাখা হয়েছে।

বদলে যেতে থাকা শুল্কব্যবস্থা

মাত্র দুই বছরে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা তিন ধরনের শুল্কব্যবস্থার মুখোমুখি হয়েছেন।

২০২৫ সালের এপ্রিলে জাতীয় জরুরি অবস্থা-সংক্রান্ত একটি আইনের আওতায় পারস্পরিক শুল্ক আরোপের আগে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের ১৫ দশমিক ৬২ শতাংশ মূল শুল্ক দিতে হতো।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ওই ব্যবস্থা বাতিল করে। এরপর ১২২ ধারার আওতায় অস্থায়ীভাবে ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপ করা হয়।

আইন অনুযায়ী এই শুল্ক সর্বোচ্চ ১৫০ দিন কার্যকর থাকতে পারে। সেই মেয়াদ ২৪ জুলাই শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এর জায়গায় ৩০১ ধারার নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়েছে।

সরকার ও রপ্তানিকারকেরা কী বলছেন?

সরকারি কর্মকর্তা ও বাণিজ্য খাতের নেতারা নতুন ব্যবস্থাকে আগেরটির ধারাবাহিকতা হিসেবেই দেখছেন।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, শুল্কহার অপরিবর্তিত থাকায় নতুন এই পদক্ষেপে আলাদা কোনো প্রভাব পড়বে না।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক ফয়সাল সামাদও একই মত দিয়েছেন। তার মতে, এতে রপ্তানিতে নতুন কোনো প্রভাব পড়বে না।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগীদের ওপর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ বা তার বেশি শুল্ক থাকায় বাংলাদেশ তার প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রেখেছে।

মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, ‘এই সুস্পষ্ট ব্যবধান উচ্চ শুল্কের মুখে থাকা প্রতিযোগীদের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের চলমান তুলনামূলক সুবিধাকে আরও শক্তিশালী করে।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার জন্য তিন বছর মেয়াদি ট্যারিফ-রেট কোটা (টিআরকিউ) চালুর বিষয়টি বিবেচনা করছে ইউএসটিআর। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও বস্ত্র উপকরণ দিয়ে তৈরি পণ্যের ওপর ৩০১ ধারার শুল্ক মওকুফ করা হতে পারে।

দ্বিপক্ষীয় চুক্তির কী হবে?

অন্তর্বর্তী সরকার চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (এআরটি) স্বাক্ষর করে। বাজার উন্মুক্ত করার বিনিময়ে ওই চুক্তিতে ১৯ শতাংশ শুল্কহার নির্ধারণ করা হয়েছিল।

তবে এআরটি যে জরুরি ক্ষমতার আইনি কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছিল, সেটি আদালত বাতিল করে দিয়েছে। ফলে ওই ১৯ শতাংশ শুল্ক এখনো প্রযোজ্য কি না, নাকি ৩০১ ধারার নতুন শুল্ক তার জায়গা নিয়েছে—এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাইছে সরকার।

প্রতিযোগীদের তুলনায় বাংলাদেশ কোথায়?

তৈরি পোশাক রপ্তানিতে প্রতিযোগীদের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান আপাতত সুবিধাজনক।

৮৬টি দেশের মধ্যে যে ১৭টি দেশকে ১০ শতাংশের নিচের শুল্কস্তরে রাখা হয়েছে, বাংলাদেশ তাদের একটি।

অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডকে সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্কের আওতায় রাখা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, শুল্কের এই ব্যবধান যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধা আরও শক্তিশালী করেছে।